মেইন ম্যেনু

শবে বরাতের ইবাদাত-বন্দেগি

শবে বরাত মুসলিম জাতির নিকট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রাত। সন্ধ্যা হতে না হতেই উপমহাদেশের সকল মুসলিম শিশু, কিশোর, যুবক ও বৃদ্ধ মসজিদ পানে ছুটে যায়। এ যেন এক পূর্বনির্ধারিত আনুষ্ঠানিক ইবাদাত-বন্দেগির এক মহাসম্মেলন। যদিও এ ইবাদাত-বন্দেগিতে আনুষ্ঠানিকতার কোনো সুস্পষ্ট অনুমোদন নেই।

এ রাতে সবার একই উদ্দেশ্য আল্লাহ তাআলার ইবাদাত-বন্দেগিতে নিজেকে নিয়োজিত করা, তাঁর নৈকট্য অর্জন করা। বিশ্বনবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ রাতকে গুরুত্ব দেয়ার ফলে মুসলিম উম্মাহও এ রাকতে মর্যাদার রাত মনে করে ইবাদাত-বন্দেগিতে কাটিয়ে দেয়।

বিশেষ করে বাংলাদেশের মানুষ এ রাতকে ভাগ্য রজনী হিসেবে অভিহিত করে থাকে। সে লক্ষ্যে বিগত জীবনের সব ভুল-ভ্রান্তি, অন্যায়-অপরাধ ও গোনাহের জন্য গভীর অনুশোচনায় আল্লাহর দরবারে বিনীত ক্ষমা প্রার্থনা করে থাকে। রাতভর নফল নামাজ, কুরআন তিলাওয়াত, জিকির-আজকার ও তাওবা-ইস্তিগফার করে। হাদিসেও এ রাতের ইবাদাত-বন্দেগির সুস্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া যায়। যা তুলে ধরা হলো-

>> আল্লাহ তাআলা এ রাতে মুসলিম উম্মাহকে সকল অন্যায় থেকে ক্ষমা লাভে এবং রিযিক বন্টনের আহ্বান জানান। হজরত আলি ইবনে আবু তালেব রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “পনের শাবানের রাতে (চৌদ্দ তারিখ দিবাগত রাত) যখন আসে তখন তোমরা এ রাতটি ইবাদত-বন্দেগিতে কাটাও এবং দিনের বেলায় রোজা রাখ। কেননা, এ রাতে সুর্যাস্তের পর আল্লাহ তাআলা প্রথম আসমানে আসেন এবং বলেন, কোনো ক্ষমাপ্রার্থী আছে কি? আমি তাকে ক্ষমা করে দিব। আছে কি কোনো রিযিকপ্রার্থী? আমি তাকে রিযিক দিব। এভাবে সুবহে সাদিক পর্যন্ত আল্লাহ তাআলা ডাকতে থাকেন।” (সুনানে ইবনে মাজাহ)

>> শবে বরাতের রাতে নফল নামাজের গুরুত্ব অত্যাধিক। কারণ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দীর্ঘ নামাজই তার প্রমাণ। হযরত আয়িশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন, একবার রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রাতে নামাজে দাঁড়ান এবং এত দীর্ঘ সিজদা করেন যে, আমার ধারনা হলো তিনি হয়ত মৃত্যুবরণ করেছেন। তাঁর বৃদ্ধাঙ্গুলি নড়ল। যখন তিনি সিজদা থেকে উঠলেন এবং নামাজ শেষ করলেন; তখন আমাকে লক্ষ্য করে বললেন, হে আয়িশা! অথবা বলেছেন, ও হুমাইরা! তোমার কি এই আশংকা হয়েছে যে, আল্লাহর রাসুল তোমার হক নষ্ট করবেন?

আমি উত্তরে বললাম, না, ইয়া রাসুলুল্লাহ। আপনার দীর্ঘ সিজদা থেকে আমার আশংকা হয়েছিল, আপনি মৃত্যুবরণ করেছেন কিনা। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কি জান এটা কোন রাত? আমি বললাম, আল্লাহ ও তাঁর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামই ভালো জানেন। রাসুল সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম তখন ইরশাদ করেন-

এটা হল অর্ধ-শাবানের রাত। (শাবান মাসের চৌদ্দ তারিখের দিবাগত রাত।) আল্লাহ তাআলা অর্ধ-শাবানের রাতে তাঁর বান্দার প্রতি মনোযোগ দেন এবং ক্ষমা প্রার্থণাকারীদের ক্ষমা করেন এবং অনুগ্রহপ্রার্থীদের প্রতি অনুগ্রহ করেন আর বিদ্বেষ পোষণকারীদের ছেড়ে দেন তাদের অবস্থাতেই। (বাইহাকি)

>> মৃতব্যক্তির রুহের মাগফিরাত কামনায় এ রাতে কবরস্থানে গিয়ে জিয়ারাতে অত্যাধিক ছাওয়াব রয়েছে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জান্নাতুল বাকি জিয়ারাতই তাঁর শ্রেষ্ঠ প্রমাণ। হজরত আয়িশা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে আরো বর্ণিত আছে যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর গৃহে এসে জামা খুললেন এবং পরক্ষণেই তা আবার পরিধান করে হজরত আয়িশা রাদিয়াল্লাহু আনহাকে কিছু না বলেই বের হয়ে গেলেন।

হজরত আয়িশা রাদিয়াল্লাহু আনহা তাঁকে জান্নাতুল বাকিতে পেলেন। বিশ্বনবি কারো আগমন অনুমান করে দেখতে পেলেন হজরত আয়িশা তাঁর পিছনে দাঁড়িয়ে। তিনি তাঁকে বললেন, হে আয়িশা! তুমি মনে করছো আল্লাহর রাসুল তোমার নষ্ট করছে?

তুমি কি জানো আজকে কোন রজনী? তখন হজরত আয়িশা বলেন, ‘আল্লাহ এবং তাঁর রাসুলই ভালো জানেন। বিশ্বনবি বললেন আজ ‘নিসফি মিন শাবান’ অর্থাৎ ১৫ শাবান রাত। আল্লাহ তাআলা অর্ধ-শাবানের রাতে তাঁর বান্দার প্রতি মনোযোগ দেন এবং ক্ষমা প্রার্থণাকারীদের ক্ষমা করেন এবং অনুগ্রহপ্রার্থীদের প্রতি অনুগ্রহ করেন আর বিদ্বেষ পোষণকারীদের ছেড়ে দেন তাদের অবস্থাতেই।

পরিশেষে…
শবে বরাতের ফজলিত অর্জনে ছোট্ট একটি হাদিস তুলে ধরতে চাই- হজরত মুয়াজ ইবনে জাবাল রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, ‘আল্লাহ তাআলা অর্ধ-শাবানের রাতে (শাবান মাসের চৌদ্দ তারিখ দিবাগত রাতে) সৃষ্টির দিকে (রহমতের) দৃষ্টি দেন এবং মুশরিক ও বিদ্বেষ পোষণকারী ব্যতিত আর সবাইকে ক্ষমা করে দেন।

আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মাহকে শিরক এবং বিদ্বেষ থেকে হিফাজত করে তাঁর ইবাদাত-বন্দেগির মাধ্যমে কোনো আনুষ্ঠানিকতা ছাড়াই নিজ নিজ গৃহে এ রজনী কাটিয়ে দেয়ার তাওফিক দান করুন। আমিন।