মেইন ম্যেনু

শবে-বরাতে হাজারো ভিক্ষুকের আর্তনাদে ভারী আজিমপুর

পবিত্র শবে-বরাত উপলক্ষ্যে সারা দেশ থেকে আসা প্রায় ১০ হাজার ভিক্ষুকের মিলন মেলা ঘটে ঢাকার আজিমপুর কবরস্থানে। আজিমপুর বাসষ্ট্যান্ড থেকে পুরাতন কবরস্থানের পশ্চিম পাশ পর্যন্ত রুটে সব ধরণের যান চলাচল বন্ধ করে দেয় পুলিশ।

বন্ধ করা এই রুটে আগত ভিক্ষুকরা দুই/তিন লাইন করে বসে পড়ে ভিক্ষা করতে। স্বজনদের কবর জিয়ারত করতে আসা লোকজনই এসব ভিক্ষুকের টার্গেট।

সরেজমিনে দেখা যায়- মাদক সেবী, পতিতা ও কর্মক্ষম ভিক্ষুকদের দাপটে প্রকৃত অসহায় ভিক্ষুকরা ভিক্ষা পাচ্ছে না। দাতাকে দেখা মাত্রই তারা হামলে পড়ছে, করছে হাত-পা ধরে টানাটানি। দানকারীদের আকৃষ্ট করতে নানা কৌশল অবলম্বন করতে দেখা গেছে তাদের। কেউ তার কাটা অঙ্গটি অতিদ্রুত নাড়িয়ে চলেছেন। কেউবা বিকলাঙ্গ নবজাতক শিশুকে শুইয়ে রেখেছেন রাস্তায়। আর মুখে নানা বুলি তুলে ধরেছেন।

জানা গেছে, লাইলাতুল বরাতের রাতে রাজধানীর মসজিদগুলো ঘিরে কোটি টাকার বাণিজ্যে নামে ভিক্ষুকরা। শুধু ঢাকা নয়, ঢাকার বাইরে থেকেও দলবেধে ভিক্ষা করতে আসে তারা। এ রাতকে ঘিরে ভিক্ষুকদের প্রস্তুতি ছিল অনেক দিনের, আর তাই কেউ এসেছে বৃহস্পতিবার সকালে, কেউ এসেছে এক কি দু’দিন আগে। ঢাকার পুরনো ভিক্ষুকদের সঙ্গে আগত ভিক্ষুকদের দ্বন্দ্বও দেখা গেছে প্রকাশ্য। এক রাতে লাখ টাকা ভিক্ষা দেয়ার ঘটনাও দেখা গেছে। ভিক্ষা দিতে এসে বিরক্তও হয়েছেন অনেকে। রাজধানীর আজাদ মসজিদ, হাইকোর্টের মাজার, কাকরাইল মসজিদ, আজিমপুর গোরস্থান মসজিদ, মিরপুর শাহ্‌ আলী মাজারি ছিলো ভিক্ষুকদের দখলে।

আজিমপুর কবরস্থানের চারপাশে অন্তত ৪ কিলোমিটার জায়গাজুড়ে প্রায় ১০ হাজারেরও বেশি ভিক্ষুকের জমায়েত ছিল। কার থেকে কে বেশি আয় করবেন এ প্রতিযোগিতা ছিল ভিক্ষুকদের মধ্যে। বিকলাঙ্গ সন্তানদের নিয়ে ভিক্ষা করছেন পিতা-মাতা। আবার ৪টা হাত দু’টো পেট, ৪টা পা ওয়ালা বিশেষ বিকলাঙ্গ এক ভিক্ষুককে ঘিরে ছিল উৎসুক মানুষের ভিড়। দানকারীর সংখ্যাও ছিল অসংখ্য। স্বজনদের কবর জিয়ারত শেষে মানুষ হাত খুলে পয়সা বিতরণ করেছেন ভিক্ষুকদের মাঝে।

জায়গা দখল:

শবেবরাতের রাতে আজিমপুর কবরস্থানের আশপাশের রাস্তায় একটু জায়গা পাওয়ার প্রতিযোগিতায় নামতে হয় ভিক্ষুকদের। তাই ভিক্ষুকদের কেউ কেউ এক দিন আগেই এখানে এসেছেন। কবরস্থানের সামনের রাস্তায় ভিক্ষার থালি, বাটি বা পলিথিন বিছিয়ে তাদেরকে জায়গা দখল করতে দেখা গেছে। জায়গা দখল নিয়ে কয়েকজন ভিক্ষুকের মধ্যে হাতাহাতিও হয়েছে। দানকারীর হাত থেকে কে কার আগে টাকা বা খাবার নিবে তা নিয়েও তাদের মাঝে ছিল কাড়াকাড়ি। বেশির ভাগ ভিক্ষুক এসেছেন ঢাকার বাইরে থেকে। বিনা পয়সায় এসেছেন ট্রেনে চড়ে। আবারও চলে যাবেন ট্রেনে। বিনা টিকিটে।

আয়ের প্রতিযোগিতা:

কে কত বেশি আয় করতে পারে তার প্রতিযোগিতা ছিল ভিক্ষুকদের মধ্যে। কবরস্থানের পাশেই যে জায়গা করতে পেরেছে তার আয় ছিল বেশি। দানকারীদের আকৃষ্ট করতে ভিক্ষুকদের কৌশলী হতে দেখা গেছে। কেউ কেউ বীভৎসতা প্রদর্শন করে মানুষকে আকৃষ্ট করেছে। কেউ কেউ শিশুদেরকেও ব্যবহার করেছে। যারা যত বেশি চিৎকার করতে পেরেছেন তাদের থলিতে অন্যদের চেয়ে বেশি টাকা পড়েছে।

গলা ঠিক রাখতে চা পান:

দানকারীদের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য রাতভর চিৎকার করতে হয়েছে ভিক্ষুকদের। গলা যাতে বসে না যায় এজন্য মাঝে-মধ্যেই আদা দিয়ে তৈরি চা পান করতে দেখা গেছে অনেক ভিক্ষুককে। বিশেষ এ আদা চা বিক্রির ব্যবসায়ীদের ফ্লাস্ক হাতে ব্যস্ত ভঙ্গিতে চলাফেরা করতে দেখা গেছে। এছাড়া অসুস্থ বিক্ষুকরা বিরিয়ানি, পোলাও, হালুয়া খেয়েছেন প্রাণভরে। অনেকে বাড়ি থেকে খাবার, গরম দুধ, আপেল ইত্যাদি নিয়ে এসেছিলেন রাত জাগার শক্তি যোগাতে।

নরসিংদীর মনোহরদী উপজেলা থেকে আসা এক ভিক্ষুক জানান, দেশের বাড়িতে গৃহস্থালী করেন, একটু বাড়তি আয়ের আশায় ঢাকায় আসা।

ফরিদপুরেরে আলীম জানান, রমজান মাসে ঢাকায় ভিক্ষা বেশি পাওয়া যায়, তাছাড়া মসজিদে মসজিদে ভাল ইফতারিও পাওয়া যায় বলে তিনি ঈদ পর্যন্ত ঢাকায় থাকবেন, তাছাড়া এখন বর্ষা মওসুমে ক্ষেতখামারে তেমন কাজও নেই। বাড়িতে দু’টি গরু আছে ছেলেরা ঘাস যোগাড় করে খাওয়াতে পারবে। তিনি জানান, বাড়িতে খাওয়া-পরার চিন্তা নাই ঘরে ধান চাল আছে। ছেলেরা খালবিল থেকে দু’-একটা মাছটাছ ধরে তাতে হয়ে যায়। এবার কিছু বেশি টাকা নিতে পারলে গ্রামে ফিরে একটু জমি লিজ নেয়ার ইচ্ছা তার। মধ্যরাত পর্যন্ত নাজিমের আয় হয়েছে ১ হাজার ৫শ’ টাকার মতো।