মেইন ম্যেনু

শবে মেরাজের ইতিহাস ও আমল

পরম পবিত্র ও মহিমাময় সত্তা তিনি, যিনি স্বীয় বান্দাকে রাত্রিকালে ভ্রমণ করিয়েছিলেন মসজিদে হারাম থেকে মসজিদে আকসা পর্যন্ত, যার চারদিক আমি বরকতময় করেছি, যাতে আমি তাকে কুদরতের কিছু নিদর্শন দেখিয়ে দিই। নিশ্চয় তিনি পরম শ্রবণকারী ও দর্শনশীল। (সুরা বনি ইসরাইল-১)

এই সেই রাত যাকে বলা হয় লাইলাতুল মিরাজ বা শবে মেরাজ। এই মহা সফরে রাসুল (সা.) আল্লাহ তায়ালার সার্বভৌমত্ব এবং মহাবিশ্বে বিরাজমান তাঁর কুদরত ও আধিপত্যের নিদর্শন স্বচক্ষে দেখেছেন।

কোরআন এর বর্ণনায় বলছে- ঊর্ধ্বদিগন্তে অতঃপর নিকটবর্তী হলো এবং বুঝে গেল। তখন দুই ধনুকের ব্যবধান ছিল অথবা আরো কম। তখন আল্লাহ তাঁর দাসের প্রতি যা প্রত্যাদেশ করার, তা প্রত্যাদেশ করলেন (সুরা আন-নাজম-৭-১০)।

মিরাজের ঘটনাটি রজব মাসের ২৭ তারিখে ঘটেছিল বলে মনে করা হয়, আজ (বুধবার) সূর্যাস্তের পরই সেই দিন শুরু। তবে নির্ভরযোগ্য হাদিস কিংবা কোনো সাহাবির উক্তি দ্বারা এটি নিঃসন্দেহে প্রমাণিত নয়। নির্ভরযোগ্য সূত্রে শুধু পাওয়া যায়, মিরাজের ঘটনা হিজরতের এক বা দেড় বছর আগে সংঘটিত হয়েছিল। কিন্তু মাস, দিন, তারিখ কোথাও উল্লেখ নেই।

অনেক আলেম বলেন, মিরাজের রাত নিঃসন্দেহে একটি বরকতময় রাত ছিল। কিন্তু এই রাতে যেহেতু বিশেষ কোনো আমল বা ইবাদত উম্মতের জন্য বিধিবদ্ধ হয়নি তাই এর দিন-তারিখ সুনির্দিষ্টভাবে সংরক্ষিত থাকেনি। -আলমাওয়াহিবুল লাদুন্নিয়াহ ও শরহুল মাওয়াহিবিল লাদুন্নিয়্যাহ ৮/১৮-১৯; আলবিদায়া ওয়াননিহায়া, ইমাম ইবনে কাছীর ২/৪৭১; লাতাইফুল মাআরিফ, ইমাম ইবনে রজব ১৩৪; ইসলাহি খুতুবাত, আল্লামা মুহাম্মাদ তাকী উসমানী ১/৪৬-৪৮

আল্লামা ইবনে কাছির (রহ.) তার তাফসির গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, নবী করিম (সা.) ইসরা সফর জাগ্রত অবস্থায় করেন, স্বপ্নে নয়। মক্কা মোকাররমা থেকে বায়তুল মোকাদ্দাস পর্যন্ত এ সফর বোরাকযোগে করেন। বায়তুল মোকাদ্দাসের দ্বারে উপনীত হয়ে তিনি বোরাকটি অদূরে বেঁধে দেন এবং বায়তুল মোকাদ্দাসের মসজিদে প্রবেশ করেন এবং কেবলার দিকে মুখ করে দুই রাকাত তাহিয়্যাতুল মসজিদ নামাজ আদায় করেন। অতঃপর সিঁড়ি আনা হয়। যাতে নিচ থেকে উপরে যাওয়ার জন্য ধাপ বানানো ছিল। তিনি সিঁড়ির সাহায্যে প্রথম আকাশ, অতঃপর অবিশষ্ট সব আকাশে গমন করেন। সিঁড়ির প্রকৃত স্বরূপ আল্লাহ তায়ালাই ভালো জানেন। প্রত্যেক আকাশে সেখানকার ফেরেশতারা নবীকে (সা.) অভ্যর্থনা জানান এবং প্রত্যেক আকাশে সেসব পয়গম্বরের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়, যাদের অবস্থান কোনো নির্দিষ্ট আকাশে রয়েছে। যেমন ষষ্ঠ আকাশে হজরত মূসা (আ.) এবং সপ্তম আকাশে হজরত ইব্রাহিমের (আ.)-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ লাভ করেন।

এরপর তিনি পয়গম্বরদের অবস্থানস্থল অতিক্রম করে এক ময়দানে পৌঁছেন, যেখানে ভাগ্যলিপি লেখার শব্দ শোনা যাচ্ছিল। তিনি সিদরাতুল মুনতাহা দেখেন, যেখানে আল্লাহ তায়ালার নির্দেশে স্বর্ণের প্রজাপতি এবং বিভিন্ন রঙের প্রজাপতি ছোটাছুটি করছিল। ফেরেশতারা স্থানটি ঘিরে রেখেছিল। এখানে রাসুলুল্লাহ (সা.) হজরত জিব্রাইলকে (আ.) তার স্বরূপে দেখতে পান। তার ৬০০ পাখা ছিল, সেখানেই তিনি একটি দিগন্ত বেষ্টিত সবুজ রঙের রফরফ দেখতে পান।

বায়তুল মা’মুরও দেখেন, বায়তুল মা’মুরের কাছেই কাবার প্রতিষ্ঠাতা হজরত ইব্রাহিম (আ.) প্রাচীরের সঙ্গে হেলান দিয়ে বসা ছিলেন। এই বায়তুল মা’মুর দৈনিক ৭০ হাজার ফেরেশতা প্রবেশ করে কেয়ামত পর্যন্ত তাদের আর প্রবেশ করার পালা আসবে না। এরপর জান্নাত, জাহান্নাম স্বচক্ষে পরিদর্শন করেন। সে সময় তাঁর উম্মতের জন্য রাব্বুল আলামীনের পক্ষ থেকে প্রথমে ৫০ ওয়াক্ত সালাত ফরজ করা হয়। পরে তা হ্রাস করে পাঁচ ওয়াক্তে আনা হয়। এর দ্বরা ইবাদাতগুলোর মধ্যে সালাতের বিশেষ গুরুত্ব ও শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণিত হয় (তাফসির মা’আরেফুল কোরআন)।

রজব মাসের আমল
হজরত উমর ফারুক (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, অতি মহান চারটি রাত যথা- রজবের প্রথম রাত, শাবানের অর্ধরাত, ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার দুই রাত। হজরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) রজব মাস এলে বলতেন ‘আল্লাহুম্মা বারিক লানা ফি রজাবা ওয়া শা’বান ওয়া বাল্লিগনা রামাদান’, অর্থাৎ হে আল্লাহ, রজব ও শা’বান আমাদের জন্য বরকতময় করুন এবং আমাদের রমজান পর্যন্ত পৌঁছে দিন। অর্থাৎ রমজান পর্যন্ত হায়াত দান করুন।

শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া বলেন: রজব ও শাবানকে মিলিয়ে একসাথে পুরো দুমাস বিশেষভাবে রোযা রাখা অথবা ইতিকাফ করার সমর্থনে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, সাহাবীগণ, কিংবা মুসলমানের ইমামগণের পক্ষ থেকে কোন প্রমাণ নেই। তবে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শাবান মাসে রোযা রাখতেন। তিনি রামাযান মাসের আগমনের প্রস্তুতি হিসেবে শাবান মাসে যে পরিমাণ রোযা রাখতেন রামাযান ছাড়া বছরের অন্য কোন মাসে এত রোযা রাখতেন না। (বুখারী, কিতাবুস সাওম, মুসলিম, কিতাবুস সিয়াম)

রজব মাস যেহেতু কুরআনে বর্ণিত চার সম্মানিত মাসের একটি সুতরাং এর পুরোটাই বরকতময়। তাই এ মাসের সবক’টি দিন ও সবক’টি রাতেই ইবাদাত বন্দেগির ব্যাপারে যত্নবান হওয়া উচিৎ। মুসলিম বিশ্বে ২৭ তারিখকে শবে মেরাজ হিসেবে উদযাপন করা হলেও শুধু এ রাত নয় বরং পুরো মাসই বেশি বেশি ইবাদত বন্দেগি করলে অশেষ সওয়াব হাসিল হবে।