মেইন ম্যেনু

শরীর ও মনের চিকিৎসক-সুর!

শিশুর হাসি, নদীর বয়ে যাওয়ার মিষ্টি ছন্দ, সকাল-বিকালে প্রাণখুলে গল্প করতে থাকা পাখ-পাখালির কিচির-মিচির- পৃথিবীর কোথায় নেই সুর? মানব ইতিহাসের পরতে পরতে আদর মেখে স্রষ্টা সাজিয়ে গুছিয়ে রেখেছেন সুরকে। জন্মলগ্ন থেকেই তাই নিত্য-নতুন সুরের প্রতি এক স্বাভাবিক টান রয়েছে মানুষের। শিশু থেকে বুড়ো- কেউই সুরের এই মায়া ভরা রহস্যময় হাতছানির বাইরে নেই। সেই কোন প্রাচীনকাল থেকে এখনো মানুষের, বিশেষ করে বাংলার মানুষের দেহ- মনের সাথে অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে জুড়ে আছে সুর। চলুন দেখে নেওয়া যাক ঠিক কী কী ভাবে মানবদেহকে প্রভাবিত করে সুর।

১. মস্তিষ্ককে প্রভাবিত করে
মানবদেহের বেশকিছু অঙ্গকে দারুন প্রবলভাবে প্রভাবিত করে সুর। আর তার ভেতরে অন্যতম হল মানব মস্তিষ্ক। সুর মানব মস্তিষ্কের বিভিন্ন স্থানকে বিভিন্নভাবে প্রভাবিত করে। এক মিনিটের একটা ছোট্ট সুর মস্তিষ্কের প্রতিটি কোণকে নাড়িয়ে দিতে সক্ষম। যার প্রভাব পড়ে মানুষের মুখভঙ্গীতে। সুরের সাথে সম্পর্কিত দুই ধরনের অনুভূতি রয়েছে। সেগুলো হল- ১. গৃহীত অনুভূতি ২. অনুভব করা অনুভূতি ( লাইফহ্যাকার )। এর অর্থ, মাঝে মাঝেই কোন সুরের অনুভূতির সাথে পরিচিত না হয়েই আমরা সেটার কষ্ট বা আনন্দকে অনুভব করতে পারি।

শুধু অনুভূতিই নয়, সুর মানব মস্তিষ্ককে করে তুলতে পারে যথেষ্ট সৃষ্টিশীল। গবেষনায় পাওয়া গেছে, মাঝারী উচ্চতার সুর মানুষের স্বাভাবিক ভাবনাকে খানিকটা প্রতিহত করে। ফলে মানুষ তখন নিজের স্বাভাবিকতাকে খানিকটা নতুন উপায়ে ব্যবহার করে। এভাবেই তৈরি হয় নতুন সব সৃষ্টির।

কোন মানুষের ব্যাক্তিত্ব কেমন হবে সেটাও অনেকটাসময় সুরই নির্ধারণ করে। কার কোন সুর পছন্দ সেটাই বলে দেয় সে আসলে ঠিক কেমন, কেমন তার মস্তিষ্কের গঠন।

২. রোগের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে
সুর শরীরের নানারকম ব্যাথা দুর করতে সাহায্য করে। করে রোগ প্রতিরোধও। অনেকটা টিকা হিসেবে কাজ করে তখন এটি। সুরের চিকিৎসা নামে আলাদা এক ধরনের চিকিৎসাও রয়েছে। সুর মানুষের মানসিক চিন্তা ও শারিরীক অনুভূতি দুটোকেই কমিয়ে দেয়। লন্ডনের এক গবেষনা অনুসারে সুর নানারকম ব্যাথা, যেমন- অস্টিওআর্থ্রিটিস এবং রিহিউমেটোয়েড আর্থ্রিটিসের যন্ত্রণা ২১ শতাংশ কমিয়ে দিতে পারে। কিছু হাসপাতালে জ্ঞাননাশক অষুধের পরিবর্তে ব্যাথা কমাতে ব্যবহার করা হয় সুরকে। বিশেষত, শিশু জন্মদানের সময়ে মাকে শোনানো হয় নানা রকমের সুর। মূলত মোট চারভাবে সুর শরীরের ব্যাথা কমাতে সাহায্য করে।

ক. রোগীকে অনুভূতি নিয়ন্ত্রন করতে সাহায্য করে।
খ. হঠাৎ মানসিক গঠনের পরিবর্তন ঘটিয়ে।
গ. সুর শরীরে ব্যাথানাশক হরমোন এন্ডোরফিন উৎপানে সাহায্য করে।
ঘ. নিঃশ্বাস নেওয়ার দ্রূততা কমিয়ে ও হৃদপিন্ডকে সহজ অবস্থায় নিয়ে গিয়ে সুর ব্যাথা কমতে সাহায্য করে।

এছাড়াও প্রতিদিন সকালের খানিকটা সময়ে শোনা সামান্য একটু সুর অনেকটা সাহায্য করে উচ্চরক্তচাপ কমাতে। নিও অরলিন্সে অনুষ্ঠিত আমেরিকান সোসাইটির অব হাইপারটেনশনের এক সম্মেলনে জানানো হয় যে প্রতিদিন সকালে শোনা ৩০ মিনিটের রাগা বা ক্ল্যাসিকাল সুর উচ্চরক্তচাপ কমিয়ে দেয় খুব ভালোভাবেই। এছাড়াও মাইগ্রেন ও স্ট্রোক পরবর্তী আরোগ্যের জন্যেও সুর বেশ উপকারী।

৩. শরীরকে নিয়ন্ত্রণ করে
শরীরচর্চার ক্ষেত্রে সুর অ্যাথলেটদেরকে বেশ সাহায্য করে। কিছু সুর স্বাভাবিকভাবেই মানুষের মনে শরীরচর্চার অনুভূতি এনে দেয়। সেসময় শরীরচর্চা আর কষ্টের নয়, বরং আনন্দের হয়ে দাড়ায়। শরীর ও মনের সংযোগ স্থাপন করে সুর। হরমোনকে আয়ত্ত্বে এনে খুব সহজেই স্বস্তি এনে দেয় ব্যায়ামের সাথে (হাউ স্টাফ ওয়ার্কস)। উচ্চমাত্রার ও মজাদার সুর মানুষকে নাচতে বাধ্য করে। শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ নাড়াতে উৎসাহ দেয়। ফলে দেহের চর্বি খানিকটা হলেও কমে যায়।

৪. বুদ্ধিমত্তা ও স্মৃতিশক্তি বাড়াতে
দেখা গেছে যেসব বাচ্চা নিয়মিত নানা ধরনের সুর শোনে তারা অন্য বাচ্চাদের তুলনায় সব ক্ষেত্রে বেশি ভালো করে। সুর মানুষকে বিভিন্ন জিনিস আরো ভালো মনে রাখতে সাহায্য করে। সুর মানুষের বেশ কিছু দক্ষতাকে বাড়িয়ে তোলে। যেমন- ক. পড়ার ক্ষমতা খ. অনুভূতির ক্ষমতা গ. গনিতের দক্ষতা।

৫. মনযোগ বাড়ায়
শান্তভাবে, সহজ পরিস্থিতিতে শোনা সুর বয়স ভেদে মানুষের ভেতরে মনযোগ বাড়িয়ে তুলতে সাহায্য করে। যদিও কোন সুর এ ক্ষেত্রে বেশি কাজ করে সেটা সম্পর্কে এখনো ঠিক নিশ্চিত নন গবেষকরা।