মেইন ম্যেনু

“শাশুড়ি বলে- ভালো হয়েছে তোমার বাচ্চা মরে গেছে…”

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন জানিয়েছেন নিজের সমস্যার কথা।

“আমি মধ্যবিত্ত ফ্যামিলির মেয়ে আমার বাবা সরকারি চাকুরী করে। ছোটবেলা থেকে অনেক আদরে মানুষ হয়েছি তাই কখনো কষ্ট কি জিনিস বুঝতে পারি নাই। কিন্তু এখন আমার জীবনে কষ্ট ছাড়া আর কিছু নাই। ২০০৭ সালে এস এস সি পরীক্ষা দিতে গিয়ে একটা ছেলের সাথে আমার ১ম পরিচয় হয়। কলেজে ভর্তি হলাম তার সাথে আবার দেখা হল। ক্লাসমেট হিসেবে আমাদের মাঝে বন্ধুত্ব হল। ও নাকি ১ম দেখায় আমাকে ভালবেসে ফেলে তাই নানা ভাবে আমাকে ইমপ্রেস করতে শুরু করল। এক পর্যায় আমিও মনে মনে ওকে ভালবাসতে শুরু করি। এইচ এস সি পরীক্ষা চলছে তার মাঝে আমার বাবার বদলি হয়ে যায় অন্য জায়গায়। তাই পরীক্ষা শেষ হওয়ার পরদিন আমাকে চলে যেতে হয় অন্য শহরে । তারপর থেকে ওর সাথে রোজ ফোনে কথা হত আমাদের সম্পর্ক আরো গভীর হতে লাগল। মনে হয় কেউ কাউকে ছাড়া বাঁচতে পারবনা।

আমি ফ্যামিলির সবার অমতে জোর করে আগের কলেজে এসে দুইজন এক সাথে বি বি এস ভর্তি হই। এখানে আমার চাচার বাসায় থাকি। আমার জন্য বিভিন্ন জায়গা থেকে বিয়ের প্রস্তাব আসে আর এসব শুনে ও অনেক রেগে যেত। বলে আমি যদি ওকে বিয়ে না করি তবে আত্মহত্যা করবে। তারপর একদিন কাউকে কিছু না জানিয়ে আমরা কোর্ট ম্যারেজ করে ফেলি। আমি আমার বাসায় চলে যাই এর পর থেকে ওর ফোন অফ, আমি প্রায় পাগলের মত ২ দিন ২ রাত ওকে ফোনে ট্রাই করি। তারপর ওর এক ফ্রেন্ডের কাছে ফোন দিয়ে জানতে পারি ও বিদেশ চলে গেছে। আগে থেকে সব প্ল্যান করা ছিল তাই আমাকে কিছু জানায়নি। আমার মাথায় আকাশ ভেংগে পড়ল। বাসায় কেউ জানেনা তাই কাউকে দেখিয়ে কাঁদতে পারিনা লুকিয়ে কাঁদতাম। খাওয়া ঘুম সব ছেড়ে দিয়েছি। কয়েক দিন পর ওর ফোন এল, অনেক কাঁদল, ক্ষমা চাইল আর বলল আমাদের ভবিষ্যৎ সেট করার জন্য গেছে। আর যাওয়ার আগে বাসায় সব বলে গেছে ওর মা আমার বাবার সাথে কথা বলবে। তারপর সব জানাজানি হল। আমার বাবা মা সারাক্ষণ কান্নাকাটি করে, আমার সাথে কথা বলেনা। এরপরও আমার মুখের দিকে তাকিয়ে সব মেনে নিল, ওদের বাসা থেকে এসে আমাকে আংটি পরানো হল।

তারপর শুরু হল আমার জীবনে চরম অশান্তি। ওর মা আমাকে ফোনে জিজ্ঞাসা করে আমাদের বাসা থেকে কী কী দিবে। আমি বলি যে আমি নিজের পছন্দে বিয়ে করেছি আর আমার বাবার সামর্থ নাই দেওয়ার মত। কথাগুলো ওকে জানাই ও বলে তুমি চিন্তা করো না, দুষ্টামি করছে। তারপর থেকে ওর বাবা মা আমার কোন খোজ খবর নিত না। আমি ফোন দিলে ভাল ব্যবহার করত না। এই দিকে সমাজের মানুষ আমাকে নিয়ে আলোচনা করত। ও বলত ও আসলে সব ঠিক হয়ে যাবে। প্রেমের বিয়ে তো তাই ওর মা রাগ। এভাবে অনেক কষ্টে ৩বছর কাটালাম। তারপর ও দেশে আসল। অনেক কাহিনীর পর পারিবারিক ভাবে আমাদের বিয়ে হল। হয়ত এটাই ছিল আমার জীবনের সব চেয়ে বড় ভুল।

বিয়ের পর শ্বশুর বাড়ি যাওয়ার পর আমার শাশুড়ি আমাকে বরণ করে না। নানা ভাবে আমাকে মানসিক নির্যাতন শুরু করে। সারাদিন আমার বাবা মা তুলে বকাঝকা করে। আস্তে আস্তে দেখি আমার বর অনেক পাল্টে গেছে। আমার শাশুড়ি ওকে মগজ ধোলাই করে ফেলেছে। এরমাঝে আমি প্রেগন্যান্ট হয়ে যাই। আমি খুব অসুস্থ্, আমার শাশুড়ি আমার বর সবাই আমার সাথে খারাপ ব্যবহার করতে থাকে। আমি কিছু খেতে পারতাম না। ওরা আমাকে দিয়ে ভারি কাজ করাত। আমার বর আমাকে বলে তোমার কোন অসুখ নাই, সব অভিনয় ছেড়ে ভালভাবে কাজ কর, মা কে খুশি কর।একদিন আমি খুব অসুস্থ্ হয়ে পড়ি। ওরা আমাকে ডাক্তারের কাছেও নিয়ে যায়নি। তারপর আমি ওর পায়ে ধরে বলেছি আমাকে আমার বাবার বাসায় রেখে আস। পরে আমাকে বাবার বাসায় ফেলে রেখে চলে যায়। আর কোন খবর নেয়না। নিজে পছন্দমত বিয়ে করেছি তাই বাসায় কিছু জানাই না। রাতের পর রাত কাঁদতাম শুধু টেনশনে।

আমার একটা কন্যা সন্তান জন্ম হয় আর ৩ দিন পর মারা যায়। ডক্টর বলে বাচ্চার ব্রেইনে আঘাত পেয়েছে তাই মারা গেছে। আমি মানসিকভাবে একেবারে ভেংগে পড়ি। তারপর একদিন আমার শ্বশুর আমাকে নিতে আসে। গেলাম। যাওয়ার পর আগের মতই বরং আগের চেয়ে খারপ ব্যবহার। আমার শাশুড়ি বলে, ভাল হয়েছে তোমার মেয়ে মারা গেছে। আমার ছেলেকে বিয়ে করে তুমি পাপ করছ তাই আল্লহ তোমার সন্তান কেড়ে নিয়েছে। আর সহ্য করতে পারছিনা তাই চলে আসি আর বাবা মা কে সব জানাই। এখন তারাও আমাকে বকাঝকা করে কেন এই কাজ করলাম। বরকে জিজ্ঞাসা করছি। ও বলে আমাকে চাইলে আমার বাড়ি এসে সবার মন জুগিয়ে চলতে হবে, আমি ফ্যামিলির বিরুদ্ধ যেতে পারব না। এখন আমি কী করব প্লিজ একটা পরামর্শ দেন।”

পরামর্শ:

আপু, আমি শুধু একটা কথাই বলবো যে পৃথিবীতে কেউ কাউকে বদলাতে পারে না, যদি না তাঁর নিজের বদলে যাওয়ার ইচ্ছা থাকে। স্বামীর সাথে বনিবনা না হলে আমরা মেয়েরা প্রায়ই ধরে নিই যে শাশুড়ি স্বামীর মগজ ধোলাই করেছে ইত্যাদি ইত্যাদি। তবে সত্য ঘটনা এই যে, শাশুড়ির প্রভাব তখনই দাম্পত্যে পড়ে, যখন আসলে স্বামী পড়তে দিতে চায়।

বুঝতেই পারছি যে আপনার শ্বশুরবাড়িতে কেউ আপনাকে বিশেষ একটা পছন্দ করে না। একজন গর্ভবতী মাকে এভাবে নির্যাতন করা ভীষণ অমানবিক একটি কাজ। আর আপনার স্বামীও মায়ের সাথে তাল মিলিয়ে আপনাকে অত্যাচার করেছেন। নিজের সন্তানের প্রতিও তাঁর খুব একটা টান আছে বলে মনে হচ্ছে না। এমন অবস্থায় আপনিই বলুন, সেই সংসারে আপনি কি ভালো থাকবেন কখনো? নাকি আপনার সন্তান হলে তাঁরা কখনো ভালো থাকবে? তাঁর ছেলেকে বিয়ে করে আপনি পাপ করেছেন, এমন কথা শাশুড়ি কেন বলেন আমি জানিনা। তবে কথাটা তিনি ভীষণ অন্যায় বলেন। মুরুব্বি হিসাবে এটা তাঁর বলা উচিত নয়।

মা বাবাকে জানিয়ে খুব ভালো করেছেন। তাঁরা একটু বকা দেবেই, কিন্তু দিন শেষে পাশেই দাঁড়াবে। তাছাড়া আপু, ভুলটা তো অনেকটাই আপনার। যে ছেলে বিয়ে করে লাপাত্তা হয়ে যেতে পারে, সেই ছেলেকে কেন আপনি বিশ্বাস করে বিয়ে করতে গিয়েছেন? যাই হোক, এখন আর এসব ভেবে লাভ নেই। আপনি ভালো করে ভেবে দেখুন, স্বামীকে চান কিনা। স্বামীকে চাইলে তিনি যা বলেছেন সেভাবে চলা ছাড়া কোন গতি নেই। স্বামী আপনাকে খুব ভালোবাসেন, এমনটা আমার মনে হচ্ছে না। তিনি আপনার জন্য দৌড়ে আসবেন, সেই সম্ভাবনা প্রায় শুন্য।

তবে আমি আপনার স্থানে হলে হয়তো অতীতকে শেষ করার কথাই ভাবতাম। যেখানে থাকতে পারছি না, দিনরাত নির্যাতিত হচ্ছে, সেখানে মাটি কামড়ে পড়ে থেকে তো লাভ নেই। পড়ে থাকতে পারতেন, যদি স্বামীর ভালোবাসা পেতেন। সেটাও যখন পাচ্ছেন না, তখন ভিন্ন পথে চিন্তা করাই ভালো।প্রিয়.কম