মেইন ম্যেনু

শাস্তিতেও ঠেকানো যাচ্ছে না পুলিশের অপরাধপ্রবণতা!

চট্টগ্রাম মহানগর ও জেলা পুলিশ সদস্যদের মধ্যে অপরাধপ্রবণতা দিন দিন বেড়েই চলেছে। সাময়িক বরখাস্ত ও বিভাগীয় শাস্তির পরও থেমে নেই পুলিশের নানা স্তরের সদস্যদের অপরাধ কর্মকাণ্ড। আর এসব দুষ্কর্মের কালিমা লাগছে এই শৃঙ্খলা বাহিনীর গায়ে।

মিথ্যা মামলা দায়ের ও অভিযোগপত্র প্রদান, ব্যবসায়ীদের হয়রানি, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, ধর্ষণের চেষ্টা, নিরীহ লোকজনকে গ্রেপ্তার করে ফাঁসানোসহ নানা অপরাধের অভিযোগ উঠছে পুলিশের বিভিন্ন স্তরের সদস্যদের বিরুদ্ধে।

পুলিশের একটি সূত্র জানায়, ঘুষ-দুর্নীতির অভিযোগে গত দেড় বছরে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) ৭৮ জন সদস্যের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিয়েছে কর্তৃপক্ষ। গুরুতর অপরাধের কারণে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে ১৪ জনকে। নগরের বাইরের জেলাগুলোতে এ সংখ্যা আরও বেশি বলে সূত্র জানায়।

সিএমপি সূত্র জানায়, বিভিন্ন অপরাধের অভিযোগে গত বছর শাস্তি হয়েছে ৩৮ পুলিশ সদস্যের। তাদের মধ্যে আছেন কনস্টেবল থেকে শুরু করে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) পর‌্যন্ত। আর চলতি বছরের ১০ মাসে শাস্তি হয়েছে ৫০ জনের বেশি।

পুলিশের অপরাধ-প্রবণতার বিষয়টি আবার আলোচনায় নিয়ে এসেছে সম্প্রতি সাময়িক বরখাস্ত হওয়া বায়েজিদ থানার ওসি প্রদীপ কুমার দাশসহ ওই থানার আরও দুই পুলিশ সদস্যের অপকর্ম।

জানা গেছে, গত ১৫ নভেম্বর চট্টগ্রামের এক ব্যবসায়ীকে মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানির অভিযোগে বায়েজিদ বোস্তামি থানার ওসি প্রদীপ কুমার দাশ, এসআই একরামুল হক ও সুজন বিশ্বাসকে সাময়িক বরখাস্ত করেন পুলিশের মহাপরিদর্শক এ কে এম শহীদুল হক।

সূত্র জানায়, মিথ্যা মামলার মাধ্যমে হয়রানির অভিযোগে ওই তিন পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে পুলিশ সদর দপ্তরে লিখিত অভিযোগ করেন সুপার রিফাইনারি প্রাইভেট লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম আহমেদ। এই অভিযোগের তদন্ত শেষে তিন পুলিশ কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করা হয়।

এর আগে গত ৭ নভেম্বর একজন নিরীহ ব্যক্তিকে ইয়াবা বড়ি দিয়ে ফাঁসানোর অভিযোগে ডবলমুরিং থানার চার পুলিশ সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত করেন নগর পুলিশ কমিশনার। সাময়িক বরখাস্ত হওয়া ওই পুলিশ সদস্যরা হলেন- ডবলমুরিং থানার এস আই মো. আলমগীর হোসেন, এএসআই মো. হারুন অর রশিদ, কনস্টেবল সালেহ উদ্দিন ও কনস্টেবল সুজিত দে।

সিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার শহীদুর রহমান জানান, অভিযুক্ত চার পুলিশ সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত করে পুলিশ লাইনে সংযুক্ত করে তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশও দেন সিএমপি কমিশনার।

গত ১৮ অক্টোবর জেলার বোয়ালখালী থানার ওসি (তদন্ত) ওমর ফারুকের বিরুদ্ধে ধর্ষণ চেষ্টার অভিযোগ আনেন এক তরুণী। এ ব্যাপারে একটি মামলা হয় চট্টগ্রামের নারী ও শিশু নির্যাতন ট্রাইব্যুনাল-১-এ।

বোয়ালখালীর পশ্চিম গোমদন্ডী এলাকার বাসিন্দা ওই নারীর অভিযোগ, তার করা একটি ধর্ষণ মামলার তদন্ত করতে গিয়ে একপর্যায়ে ওসি ফারুক তাকে ধর্ষণের চেষ্টা করেন।

গত অক্টোবর মাসে নগর পুলিশ কমিশনারের কাছে লিখিত অভিযোগ আসে চান্দগাঁও থানার ওসি সাইরুল ইসলাম, একই থানার দুই এসআই ও চার এএসআইয়ের বিরুদ্ধে। তাদের বিরুদ্ধে ঘুষ গ্রহণ, হয়রানির এসব অভিযোগ করেন চান্দগাঁও এলাকার সাতজন বাসিন্দা।

একই মাসে ঘুষ গ্রহণ ও হয়রানির অভিযোগে কোতোয়ালি থানার ওসি জসিম উদ্দিন ও একই থানার সাবেক ওসি (তদন্ত) নেজাম উদ্দিনের (বর্তমানে ইমিগ্রেশন পুলিশে কর্মরত) বিরুদ্ধে পুলিশ কমিশনারের কাছে লিখিত অভিযোগ করেন এক ভুক্তভোগী।

অভিযোগ প্রসঙ্গে নগর পুলিশ কমিশনার মো. আবদুল জলিল মন্ডল বলেন, তদন্তের মাধ্যমে অভিযোগ প্রমাণিত হলে সঙ্গে সঙ্গে ওই পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

এর আগে গত ৯ জুন নগর গোয়েন্দা পুলিশের এসআই আমিরুল ইসলাম, এএসআই জহিরসহ পাঁচ পুলিশ সদস্য পাঁচলাইশ থানা এলাকার ল্যানসেট ভবনের মালিক ব্যবসায়ী সৈয়দ নাসিম আহমেদের প্রতিষ্ঠানে ‘অভিযান’ চালান। সৈয়দ নাসিমের অভিযাগ, এ সময় তারা তিন লাখ টাকা হাতিয়ে নেন এবং ইয়াবা দিয়ে তাকে ফাঁসানোর ভয় দেখান। পরে ঘটনা ফাঁস হয়ে গেলে ওই পাঁচ পুলিশ সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত করেন সিএমপি কমিশনার।

ক্রসফায়ারের হুমকি দিয়ে ৩০ লাখ টাকা আদায় করার অভিযোগে সিএমপির অতিরিক্ত উপকমিশনার (পশ্চিম) মোহাম্মদ আরেফিন জুয়েল, তার বডিগার্ড মোহাম্মদ সোহেল, হাজিপাড়া জালাল কমিশনার লেইন এলাকার মোহাম্মদ এসকান্দর হায়াত ও হালিশহর চৌধুরীপাড়া এলাকার মোহাম্মদ মহসিনের বিরুদ্ধে সম্প্রতি আদালতে মামলা করেছেন হালিশহরের ব্যবসায়ী মোহাম্মদ শাহজাহান। মামলাটি আমলে নিয়ে আদালত দুর্নীতি দমন কমিশনকে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন।

চলতি বছরের ৩ জানুয়ারি নগর গোয়েন্দা পুলিশের এসআই আবুল হোসেনসহ ছয় পুলিশ সদস্য ও এক সোর্সের বিরুদ্ধে কোতোয়ালি থানার পুলিশ ডাকাতি মামলা করে। তিন কোটি টাকা মূল্যের সোনা লুটের অভিযোগে তাদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়।

গত বছরের ১৯ জুন পুলিশ হেফাজতে বীমা কর্মকর্তা মো. রোকনুজ্জামানের (৪০) মৃত্যুর ঘটনায় নগরজুড়ে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। টাকার জন্য নির্যাতন করে এই বীমা কর্মকর্তাকে মেরে ফেলা হয়েছে বলে অভিযোগ করে ছয় পুলিশ সদস্য, আনসার ও পুলিশের সোর্সসহ ১০ জনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করা হয়। ২৫ জুন নিহতের স্ত্রী শিমু আক্তার চট্টগ্রাম মহানগর হাকিম আহমদ সাঈদের আদালতে মামলাটি করেন।

সূত্র আরও জানায়, জেলার বিভিন্ন থানা ও ফাঁড়ির পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে প্রায় প্রতিদিন অভিযোগ জমা পড়ছে ডিআইজি রেঞ্জ কার্যালয়ে। সীতাকুণ্ড থানার পুলিশ কনস্টেবল কৃষ্ণ দে গত বছরের ৯ সেপ্টেম্বর তার স্ত্রী শিল্পী দে-কে যৌতুকের দাবিতে হত্যা করে লাশ পুকুরে ফেলে দেন বলে অভিযোগ ওঠে। এ হত্যা মামলায় এখন তিনি কারাগারে।

চলতি বছর জানুয়ারিতে কক্সবাজারের চকরিয়া থানায় কর্মরত এসআই আক্তার হোসেন, কনস্টেবল বেলাল উদ্দিনসহ চারজনকে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা যাওয়ার সময় সীতাকুণ্ডের মাদামবিবিরহাট এলাকায় একটি প্রাইভেটকারসহ আটক করে জেলা পুলিশ। এ সময় তাদের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ ইয়াবা উদ্ধার করা হয়।

এ ঘটনায় কক্সবাজার জেলা পুলিশ অভিযুক্ত দুই পুলিশ সদস্যকে বরখাস্ত করে। একই মাসে ২০ হাজার পিস ইয়াবা হাতবদল করতে গিয়ে কর্ণফুলী শাহ আমানত সেতু এলাকা থেকে সিএমপির গোয়েন্দা পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হন চকরিয়া থানার মাতামুহুরি ফাঁড়ির কনস্টেবল নাজমুল হোসেন।

পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ আর শাস্তির ঘটনা অপরাধপ্রবণতার কেবল খণ্ডচিত্র বলে জানান ভুক্তভোগীরা। তাদের দাবি, বাস্তব চিত্র আরও ব্যাপক ও ভয়াবহ। পুলিশের রোষানল থেকে বাঁচতে বেশির ভাগ ভুক্তভোগী পুলিশের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ করেন না।

অনেক ভুক্তভোগীর অভিযোগ, মামলার আসামি পুলিশ হওয়ায় বিচারপ্রার্থীদের দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হয় বিচার চেয়ে। কাউকে কাউকে আবার প্রাণনাশের হুমকিও দেয়া হয়।

অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ পুলিশকে দিয়ে তদন্ত করালে অপরাধ প্রমাণিত হওয়া কঠিন। তাই অনেক ভুক্তভোগী অভিযোগ না করে নীরব থাকেন।

সিএমপির একটি সূত্র জানায়, পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে নানা অপরাধের এন্তার অভিযোগে বিব্রত সিএমপির উচ্চপর‌্যায়ের কর্মকর্তারা। ফলে অভিযোগের প্রমাণ পেলে ব্যবস্থা নিতেও দ্বিধা করছেন না তারা।

কিন্তু এর পরও এই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন স্তরের সদস্যদের মধ্যে অপরাধপ্রবণতা বাড়তে থাকার ঘটনা চিন্তিত করছে সাধারণ মানুষকে।ঢাকাটাইমস