মেইন ম্যেনু

শাহাদাত আমার গলা টিপে ধরত : গৃহকর্মী হ্যাপির জবানবন্দি

গৃহকর্মী হ্যাপিকে নির্যাতনের মামলায় জাতীয় দলের ক্রিকেটার শাহাদাত হোসেন ও তার স্ত্রী জেসমিন জাহান নিত্যের বিরুদ্ধে সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়েছে।

ঢাকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৫ এর বিচারক তানজিনা ইসমাইলের আদালতে এ সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়।

ঢাকা মহানগর হাকিম স্নিগ্ধা রানী চক্রবর্তী আদালতে হাজির হয়ে প্রথম সাক্ষী হিসাবে সাক্ষ্য দেন। তিনি ভিকটিম মাহফুজা আক্তার হ্যাপীর ২২ ধারায় জবানবন্দি রেকর্ড করেন। সে জবানবন্দি আদালতে আজ প্রদর্শনী হিসাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে এবং বিচারক তা গ্রহণ করেছেন।

সে জবানবন্দির হুবহু লেখা আওয়ার নিউজ বিডি’র পাঠকের কাছে তুলে ধরা হলো:

‘আমি ক্রিকেটার শাহাদাতের বাসায় প্রায় এক বছর যাবত কাজ করি। আমাকে ২০০০ টাকা বেতন দিত। আমি বাসার সব কাজ করতাম। আমার কাজে কোন ভুল হলেই শাহাদাত আর তার বৌ আমাকে মারত। একজন পা দিয়ে আমাকে পাড়া দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকত, অন্যজন মারত। সারা শরীরে মারত। লাঠি দিয়ে মারত। আমার পাছায় বেশি মারত। আবার মারার জায়গায় বরফ দিয়ে ধরে রাখতো সারা রাত। আমি বরফ সরালে তারা আবার পিটাত।আমার বরফ ধরে রাখতে কষ্ট হত। প্রায়ই শাহাদাত হোসেন আমার গলা টিপে ধরত। আমার শ্বাস বন্ধ হওয়ার উপক্রম হলে আমি শ্বাস নিতাম। তখন আমাকে আরও মারতো। তার বৌ মাঝে মাঝে আমার গলা টিপে ধরেছে। আমাকে ডাল ঘুটনী দিয়ে মারতে মারতে চার/পাঁচটি ডাল ঘুটনী ভেঙ্গে ফেলেছে। আমাকে ভাতের চামচ দিয়ে মারতো। ভাতের চামচ অনেক মেরে ভেঙ্গেছে। রুটি বানানোর বেলন দিয়ে মারত। আমি ওটা লুকিয়ে রেখেছিলাম বলে ওরা আরও একটি বেলন কিনে আনছে। শাহাদাত হোসেনের বৌ কাঠের খুন্তিতে গরম তেল নিয়ে আমার হাঠুতে ছ্যাকা দেয়। একদিন রাতে আমি বাচ্চার সুজি রান্না করছিলাম। দেরী হয়েছে বলে শাহাদাত ও তার বৌ আমাকে মারতে শুরু করে। শাহাদাতও বেলন নিয়ে এসে আমাকে মারধোর করে। আমার ডান পায়ের হাঁটুর নিচে বেলন লাঠির একটি অংশ লেগে গর্ত হয়, রক্ত বের হয়। এতে তারা মারা থামায়। ক্ষততে ন্যাকড়া বেঁধে আমি কাজ করি।ঐ রাতে আমি ভয়ে তাদের কথামত ঘরের সব কাজ করি।শাহাদাত তার বৌকেও মারত। আমার চোখে মুখে ঘুষি দিত। দুই চোখের চারপাশে আঘাতের কালো দাগ দেখা যায়।বাম চোখ কিছুটা ফোলা, বাম চোখে রক্ত জমাট বাধা দেখা হয়।আমার বাঁ চোখ ফুলে প্রায় বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। একদিন শাহাদাৎ-এর বৌ আমাকে মুখ চেপে ধরে মারে। সে একদিন আমার মুখ চেপে ধরতে গিয়ে তার নখ আমার বা গালে লেগে দাগ হয়ে যায়। পরের দিন শাহাদাৎ হোসেন আমার বাম গালে চড় মারলে দাগ পড়ে যায়।তার নখ লেগেও বাম গালে দাগ হয়। তারা আামাকে ঠিক মতন খেতে দিত না। তাদের উচ্ছিষ্টগুলো আমাকে খেতে দিত। আমি শেষ ঘটনার কয়েকদিন আগে আসামিদের দেশের বাড়িতে যাই। সেখানে আমি শাহাদাৎ হোসেনের মায়ের কাছে নালিশ করি। তিনি আমাকে মারতে নিষেধ করেন। সেই রাতে আসামিরা ঢাকায় আসার পথে গাড়িতে শাহাদাৎ হোসেনের বৌ আমাকে পানির বোতল দিয়ে মারে। গাড়িতে আমাকে মারার জন্য তিন চারটা লাঠি ছিলো।গাড়িতে আমাকে সে চড়ও মারে, ঘুষি মারে। এর পরেই সুজি রান্নার ঘটনা নিয়ে বৌ আমাকে পারা দিয়ে ধরে। আমি চিৎকার করি সে জন্য আমার মুখে পাতা দিয়েছিল, মেরেছিলো। পরের মারের কারণে আমার বাম হাতের আঙ্গুল ভেঙ্গে গেছে। প্রায় দুই সপ্তাহ আগে একদিন দুপুরের দিকে বাচ্চার সুজির রং হলুদ হওয়ার কারণ জিজ্ঞাসা করে শাহাদাৎ-এর বৌ। আমি ভয়ে মিথ্যা বলি যে সুজিতে আমি হলুদ মিসাইছি।শাহাদাৎ হোসেন তখন প্র্যাকটিসে ছিল।তার বৌ এটা নিয়ে আমার পেটে ঘুষি মারে।আমাকে মারার জন্য একটি লাঠি কিনে আনতে বলে। আমি ভয়ে গেট খুলে বাসা থেকে বের হয়ে ৬নং বাজারের সামনে যাই। সেখানে একজন মেয়ে আমকে কি হয়েছে জিজ্ঞাসা করে। আমি তাকে সব ঘটনা খুলে বলি। সে আমাকে সাংবাদিকের কাছে নিয়ে যায়।এরপর আমাকে ডাক্তার দেখানো হয়। এক্সরেতে দেখা যায় আমার বাম পা ভেঙ্গে গেছে।তারা আমাকে সবসময় তালা দিয়ে আটকে রাখতো। রাতে বাথরুমে ঘুমাতে দিত।’

এ জবানবন্দি গ্রহণের পর বিচারক আগামী ২৪ আগস্ট এ মামলার সাক্ষ্যগ্রহণের পরবর্তী কার্যক্রমের জন্য দিন ধার্য করেছেন।

গত বছরের ৮ ডিসেম্বর শাহাদাতকে ৩১ মার্চ পর্যন্ত জামিন দিয়েছেন হাইকোর্ট।পরে নিম্ন আদালত থেকে তার জামিনের মেয়াদ বাড়ানো হয়।

অন্যদিকে ঢাকা মহানগর দায়রা জজ কামরুল হোসেন মোল্লার আদালত গত ১ ডিসেম্বর একমাসের জন্য নিত্যকে জামিন দেন। পরে অবশ্য এ জামিন স্থায়ী করা হয়।

শাহাদাত গত বছরের ৫ অক্টোবর ঢাকার সিএমএম আদালতে আত্মসমর্পণ করলে তার জামিনের আবেদন নাকচ করে জেলে পাঠানোর আদেশ দেওয়া হয়।