মেইন ম্যেনু

শাহ আলীতে প্রতিদিন ইফতার করেন ১২শ রোজাদার

রাজধানীর মিরপুর-১ নম্বরে অবস্থিত সুলতানুল আউলিয়া হযরত শাহ্ আলী বাগদাদী (র.) মাজার। স্থানীয়ভাবে শাহ্ আলী মাজার নামেই পরিচিত। এই রমজানে এখানে প্রতিদিন প্রায় ১ হাজার ২০০ রোজাদার ইফতার করে থাকেন। ইফতারের ঠিক ১০ মিনিট পূর্বে থেকে ইফতারসামগ্রী সরবরাহ শুরু হয়। মাজারের তিনটি স্পটে সুশৃংখলভাবে রোজাদাররা এ ইফতারিতে অংশ নেন। মাজারের সামনের খোলা জায়গায় সাত থেকে আট’শ মানুষ অংশ নেয়। তাদের মধ্যে থাকে মাজারভক্ত, ফকির, মিসকিন, ছিন্নমূল, ধনী-গরিব, নারী-পুরুষ, পথচারীসহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ। মাজারের লাগোয়া মসজিদের ভেতরের একপাশে মসজিদের ইমাম, মুয়াজ্জিন, মুসল্লীরা, মাজারের খাদেম, আয়োজক কমিটির সদস্যসহ দুইশতাধিক রোজাদার আর মাজারের বারান্দায়ও মাজারের সহকারী এবং খাদেমদের সঙ্গে সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির লোকেরাসহ ১৭০ জন ইফতার করে থাকেন।

মাজারের ব্যবস্থাপনা কমিটি সূত্রে জানা গেছে, শাহ্ আলী মাজারে ৫০০ লোকের জন্য প্রতিদিন এক থেকে দেড় মণ মুড়ি, আধা-মণ ছোলা, আধামণ ডাবলি সরবারহ করা হয়। তবে বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার এখানে ১ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার মানুষের ইফতার করে থাকেন। ইফতারের সামগ্রীর বেশির ভাগই সমাজের বিত্তশালী ও ভক্তরা সরবারহ করে থাকেন। এর মধ্যে আছে খেজুর, শরবত, জিলাপি, আপেল, কলা, মিষ্টি, ছোলা ও মুড়ি।

রোববার সরেজমিনে মাজারের মূল গেট পেরিয়ে ভিতরে প্রবেশ করে দেখা যায়- শাহ আলীর (র.) ভক্ত, ফকির-মিসকিন, ছিন্নমূল, পথচারীসহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের উপস্থিতি। তারা লাইন ধরে দাঁড়িয়ে মাজার জিয়ারত করছেন। যোহর নামাজের ওয়াক্ত হওয়ায় প্রচুর মুসল্লী ছিল মসজিদে। ইতোমধ্যে কেউ নামাজ আদায় করে বের হয়ে যাচ্ছেন কেউ আবার মসজিদের ভেতর কুরআন শরীফ পাঠ করছেন। অনেকে মসজিদের বাইরে মাজারের খোলা জায়গার এক সঙ্গে জিকির-আসকার করছেন। এ যেন এক অন্যরকম পরিবেশ। এভাবে সময় ধীরে ধীরে পার হয়ে যাচ্ছে যোহর থেকে আসরের ওয়াক্তের দিকে। আসরের নামাজ জামাতে আদায় করে কম সংখ্যক মুসল্লীই আছেন যারা চলে যান। বাকীরা মাজার, মসজিদ এবং এর আশেপাশে অবস্থান নেন ইফতারে অংশ নেয়ার জন্য। সময় যতো বাড়তে থাকে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার ধর্মপ্রাণ মানুষের সংখ্যাও বাড়তে থাকে। এছাড়া মাজার ঘিরে স্থানীয় ফকির-মিসকিন আর ভবঘুরেরা তো আছেই।

মাজারের বারান্দায় বসে ইফতারসামগ্রী তৈরিতে ব্যস্ত খাদেম বিপ্লব হোসেন। তিনি বলেন, ‘আমরা যোহর নামাজের পর থেকেই ইফতারের প্রস্তুতি শুরু করে দেই। ইফতারসামগ্রীর মধ্যে আজ থাকছে- ছোলা-মুড়ি ছাড়াও খেজুর, শরবত, জিলাপি, আপেল, আনার, জাম, কাঁঠাল, কলা, বেল, আনারস, মালটা, নাশপতি ও মিষ্টি। আমি নয় বছর ধরে এখানে রোজার সময় ইফতার প্রস্তুত করে আসছি। এটা করে আমি তৃপ্তি পাই। সবাই মিলেমিশে এক সঙ্গে ইফতার করি। তাতে অনেক ফজিতও আছে।’

মাজারের মূল ভবনে বারান্দার অপর পাশেও প্রস্তুত করা হচ্ছে ইফতারসামগ্রী। এখানে সারিবদ্ধ করে রাখা হয়েছে ১০টি বড় পাতিল। এই পাতিলগুলোতে ছোলা, ডাবলী, পেঁয়াজু, বেগুনি এক সঙ্গে মাখানো হয়। তারপর সেগুলোর সঙ্গে মেশানো হয় মুড়ি।

কথা হয় মিরপুর শাহ্ আলী (র.) মাজারের খাদেম মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেনের সঙ্গে। তিনি বলেন, আল্লাহ রহমতে এখানে ইফতারে কোনো অভাব হয় না। আসরের নামাজের পরই মাজারের বারান্দা, মসজিদের ভেতর এবং সামনের খোলা জায়গায় রোজাদার মানুষে পূর্ণ হয়ে যায়। মাজারের পক্ষ থেকে ৫০০ লোকের জন্য ইফতারের আয়োজন করা হলেও প্রতিদিন সর্বনিম্ন ১ হাজার ২০০ লোকে এখানে ইফতার করে থাকেন।

খাদেম মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন বলেন, মাজারের খাদেমরা ইফতারের ঠিক ১০ মিনিট আগে থেকেই ইফতারি সরবরাহ শুরু করেন। মাজারের বারান্দায় এবং মসজিদের ভেতরে ৩৫০টি গ্লাস আছে, এতে করে শরবত পরিবেশন করা হয়। তবে খোলা জায়গায় যারা ইফতার করেন তাদের তাদের জন্য শরবতের কোনো ব্যবস্থা থাকে না। তাদের জন্য আটটি পাতিলে করে ইফতারসামগ্রী দেয়া হয়।

এদিকে, সরেজমিনে দেখা গেছে, মাজারের খোলা জায়গায় ভক্ত, ভিক্ষুক, ফকির-মিসকিন, ছিন্নমূল এবং ভবঘুরেরা সারিবদ্ধ ভাবে বসে আছেন। নারী-পুরুষ আলাদা সারিতে বসেছেন। কেউ কেউ একটু দূরে ছয়-সাত জন একসঙ্গে বসে ইফতারের জন্য অপেক্ষা করছেন। ইফতারের ঠিক ১০ মিনিট আগে খোলা জায়গায় অবস্থাকারীদের সামনে ইফতারি দেয়া শুরু করেন মাজারে খাদেম এবং স্বেচ্ছাসেবকরা। আর মাজারের বারান্দা এবং মসজিদের ভেতরে পাঁচ মিনিট আগে প্লাস্টিকের পাত্রে ইফতারি সরবারহ করা হয়। ইফতারের ঠিক আগ মুহূর্তে হয় মোনাজাত। মোনাজাত পরপরই সাইরেন বাজানো শুরু হলে সারা দিনের সিয়াম সাধনার শেষে শুরু হয় ইফতার।

মিরপুরের শাহ আলীর (র.) মাজার ওয়াকফ এস্টেটের ম্যানেজার মোশেদ আলম বলেন, ‘শাহ্ আলী মাজার ব্যবস্থাপনা কমিটি পবিত্র রমজানে ইফতার ও সেহেরির জন্য ৪ লাখ ২৫ হাজার টাকা বরাদ্দ করেছে। প্রতিদিন সেখান থেকে গড়ে ১৪ হাজার ১৬৬ টাকা করে ব্যয় করা হচ্ছে। মাজারের পক্ষ থেকে প্রতিদিন ৫০০ লোকের জন্য একমণ মুড়ি, আধা-মণ ছোলা এবং আধা-মণ ডাবলী দেয়া হয়। আর সেহেরিতে সাড়ে ৩০০ লোকের জন্য ভাত এবং গরুর মাংস, ডাল খাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। কোনো কোনো দিন মাংসের পরিবর্তে ডিমও দেয়া হয়।’

তিনি বলেন, ‘মাজার কর্তৃপক্ষ ছাড়াও প্রতিদিন বিশিষ্ট ব্যক্তিরা ইফতার ও সেহেরির ব্যবস্থা করে থাকেন। কেউ ইফতারসামগ্রী নিয়ে আসেন, কেউ সেহেরির খাবার নিয়ে আসেন, কেউ আবার অনুদানও দিয়ে থাকেন।’বাংলামেইল