মেইন ম্যেনু

‘শিক্ষা আমার অধিকার ভোগ্য পণ্য নয়’

রাষ্ট্রের সাথে আমার সম্পর্ক কি ? অধিনতার, না কি দেয়া ও নেয়ার, অভিভাবকের, বন্ধুত্তের । আমরা কি গলা ছেড়ে গাই না , মাগো তোমার ভাবনা কেন , আমরা তোমার শান্তি প্রিয় শান্ত ছেলে, তুবু শত্রু এলে অস্ত্র হাতে ধরতে জানি। আমরা যদি রাষ্ট্রের বিপদে পাসে দাড়াতে পারি তবে কেন রাষ্ট্র আমাদের বিপদে আমাদের পাসে দাঁড়াবে না।

বাংলাদেশি সমাজে, রাষ্ট্র ও সরকার তার নাগরিককে অধিনস্ত প্রজা মনে করে , তাই এর শাসক শ্রেণী প্রজাতান্ত্রিক বাংলাদেশ নামে অধিক আনন্দিত । কিন্তু কেন এটাকে একমাত্র সত্যি ব্যাখ্যা বলে মনে করতে হবে । রাষ্ট্র গড়ে তোলে নাগরিকরাই , রাষ্ট্র নাগরিকের জন্য। সেই অর্থে আমাদের রাষ্ট্র কারো সম্পত্তি নয়, বরং এতে সকলের অধিকার রয়েছে । তা কেউ মানুক আর নাই মানুক এই, সাধারণ সত্য বিশ্বাস করতে রবিদ্রনাথের মতন জ্ঞানী হতে হয় না।

ছোটবেলায় শরৎচন্দ্রের লেখা “মহেশ” গল্পটি পড়েছিলাম, অনেকের মনে আছে নিশ্চয়ই । গফুরের জীবন ও জলের অধিকার গচ্ছিত ছিল জমিদারের হাতে। আমরা সেই রাষ্ট্র চাইনি বলেই ৪৭’ এসেছে , ৭১’ এসেছে । এই রাষ্ট্র কারো দানে পাওয়া নয়, বরং আমাদের অর্জন।

আমাদেরি অর্জিত রাষ্ট্রে শিক্ষা আমাদের অধিকার। মানছি , সরকার বাহাদুর বলবেন শিক্ষা তো আমাদের সংবিধানে মৌলিক অধিকারের স্বীকৃতি পায় নি , তাই রাষ্ট্রে তা দিতে বাধ্য নয় । এর থেকে বড় ভুল যুক্তি আর কিছুই হয় না। আজ বাদে কাল যদি সংবিধান সংশোধন করে বলা হয় মতপ্রকাশের স্বাধীনতা মৌলিক অধিকার নয় , বরং এটা পণ্য , যে কিনবে সেই মত প্রকাশ করতে পারবে, তবে তো আমাদের কথার উপর ভ্যাট বসাবে ।

প্রতিবেশী দেশের দিকেই দেখি না, যে ভারতের উধারন সরকার বাহাদুর উঠতে বসতে দেন বা যে পাকিস্থান কে উঠতে বসতে গালি দেন তারা তো শিক্ষা কে মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে । এমন কি মালদ্বীপ নামের ছোট দেশটি , যারা পানির নিচে ডুবে যাবে বলে মরা কান্না করেন, তারাও কিন্তু ডুবে যাওয়ার অপেক্ষা না করেই শিক্ষাকে মৌলিক অধিকার হিসেবে নিয়েছে ।

এবার না হয় জাতিসংঘের কথাই ধরলাম, জাতিসংঘের সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণাপত্র, ১৯৪৮-এর অনুচ্ছেদ ২৬ অনুসারে শিক্ষা একটি মৌলিক অধিকার। কথায় কথায় যে নীতিনির্ধারকরা বিশ্ব সংগঠনের সনদ দেখিয়ে উন্নয়নের বড়াই করেন, সেই সংগঠনই বলছে শিক্ষা আমার মৌলিক অধিকার । তার পরেও যদি আপনি মানতে না চান, তবে যান, আপনাকে খুশি করার জন্যই বললাম , শিক্ষা আমাদের মৌলিক অধিকার নয়। কিন্তু তাই বলে এইটা ভেবে বসবেন না যে এইটা আমাদের অধিকার নয় । অবশ্যই শিক্ষা আমাদের অধিকার।

রাষ্ট্র আমাদের কাছ থেকে তার বৈধতার সম্মতি নিয়েছে , বিনিময়ে আমাদের অধিকার নিশ্চিত করার ওয়াদা করেছে । এই তত্তের প্রমান করতে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে ডক্টরেট নিতে হয় না । রাষ্ট্র আমাদের কাছে অভিভাবক , দোকানদার নয় । আমরা রাষ্ট্রের কাছে সাবান শ্যাম্পু কিনতে আসি নি , যে আমাকে ভ্যাট দিতে হবে । আমরা রাষ্ট্রের কাছে শিক্ষার অধিকার নিতে এসেছি । মানলাম আমাদের দেশ দরিদ্র , সবার জন্য সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পর্যাপ্ত সুযোগ করতে পারে না। অনেক বিশ্ববিদ্যালয় তো একবারের বেশি পরিক্ষাই দিতে দেয় না । এতো কিছুর পরেও আমরা রাষ্ট্রকে ক্ষমা করলাম , কারন দেশকে ভালবাসি । তার মানে এই নয় যে আপনি সেই রাষ্ট্রের দোহাই দিয়ে এখন শিক্ষাকে পণ্য বানাবেন, বিক্রি করবেন, এবং আমাকে ভোক্তা হয়ে সেই পণ্য কিনে ভোগ করতে হবে। মাঝখান থেকে আপনি ভ্যেট পাবেন । কে দিয়েছে এই অধিকার আপনাকে । আমি তো দেই নি , আমরা তো দেই নি , তবে কাদের কথা বলছেন । না কি এই অধিকার নিজেই নিজের উপর আরোপ করেছেন।

আপনি বলছেন আমরা বড়লোক , এতো টাকা দিয়ে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার যখন সামর্থ্য আছে তখন এই সামান্য ৭.৫০% ভ্যাট ও দিতে পারবো । আমরাও তো তাহলে বলতে পারি , আপনি তো হাজার হাজার ডলার খরচ করে রাশিয়া আর চায়না থেকে অস্ত্র কিনছেন , মিগ কিনে আকাসে ওড়াচ্ছেন তবে কেন নিজেকে গরিব দেশ বলছেন। তবে কেন ৮৩ টি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় এর প্রায় ৪ লক্ষ ছাত্রের কাছ থেকে আপনাকে ভ্যাট নিতেই হবে । আপনি কি এতোই দেউলিয়া হয়ে গেছেন। তবে কেন নিজেকে দেউলিয়া ঘোষণা করছেনা না ? তা করলে আমরা আর অধিকার চাইতে যাবো না , জানবো দেউলিয়া আর আমাকে কি অধিকার দেবে ।

এ কেমন দেশের স্বপ্ন আমাদের দেখান , যে আমাদের অধিকার কে পণ্য বানাবে , আমাদের তাই কিনতে হবে । আপনি আমাদের সবার জন্য সুযোগ তৈরি করতে পারেন নি বলেই আমরা বাধ্য হয়েছি বেসরকারি তে পড়তে । আপনি তো তখন আমাদের কোন শিক্ষা ঋণ দেন নি, কোন ছাত্র প্রণোদনা দেন নি । হলমার্ক ৪০০০ কোটি টাকা নিলে আপনার কিছুই হয় না, আমরা সামান্য পয়সা দিয়ে পড়তে গেলে আপনার লাগে। এ কেমন দেশের কথা আপনি বলেন ।

নাকি এর সব কিছুই আপনার বিলাসিতার জন্য , আপনার পায়ের নিচে রক্ত রঙের গালিচা পাতার জন্য। আপনি জানেন ওই লাল কি করে লাল হয়েছে । আমার মধ্যবিত্ত পিতার ঘামের রং, আপনার গালিচায় শোভা পাচ্ছে, যেখানে আপনি ধাম্ভিকের মতন পা ফেলছেন ।

লেখক: শিক্ষার্থী, সাউথ এশিয়ান উনিভার্সিটি, নিউ দিল্লি