মেইন ম্যেনু

শিঙাড়া ভালবাসেন? তাহলে দু’মিনিট নীরবতা পালন করুন…

‘শিঙাড়া কারোকে বিট্রে করে না, বুঝলি’। ১৯৮০-র দশকে নন্টেকাকুর মুখ থেকে শোনা এই উক্তির অর্থ ও মহিমা কি বহুমাত্রিক? ইদানীং মনে হয়, শিঙাড়া-ভোজনের উত্তরপর্বের অ্যাসিডিটিকেই কেবল ব্যক্ত করেননি নন্টেকাকু, তারও অতিরিক্ত কিছু বোধ হয় তাঁর উচ্চারিত এই আপ্তবাক্যে ছিল। আর তা ছিল বলেই তিনদশক আগেকার সেই উচ্চারণ আজও কানে লেগে আছে। সেই রণনকে অতিক্রম করে আজ কেন জানি না মনে হয়, শিঙাড়া কারোকে বিট্রে না করলেও বাঙালি শিঙাড়াকে বিট্রে করেছে। করে চলেছে।
বঙ্গজীবনে শিঙাড়ার অবদান অসীম। বাঙালির সংস্কৃতির শেকড়-বাকড়ে লেপ্টালেপ্টি করে রয়েছে শিঙাড়া। শিঙাড়া না থাকলে কৃত্তিবাস ‘রামায়ণ’ লিখতেন না, মাইকেল ‘মেঘনাদ বধ’ লিখতেন না, রবীন্দ্রনাথ নোবেল পেতেন না। শিঙাড়া না থাকলে বাঙালি জাতিরই সৃষ্টি হত না— এমন চরম বার্তাও মাঝে মাঝে শোনা গিয়েছিল আবহমানে। যাঁরা আউড়েছিলেন, তাঁদের বক্তব্যে যুক্তি যথেষ্ট ছিল। তাঁদের মতে, বাঙালির বিয়ের সম্বন্ধের অমোঘ উপকরণ হল শিঙাড়া আর রসগোল্লা। বিশেষ করে, কনে দেখার সময়ে শিঙাড়া না থাকলে বাঙালির বিয়েই বন্ধ হয়ে যেত। জাতি হিসেবে অস্তিত্ব হারাত বাঙালি। শিঙাড়ার সেই অবদানকে ভুলে থাকা আত্মবিস্মৃতিরই নামান্তর। আর সেই আত্মবিস্মরণের কাজটি বাঙালি সুচারুভাবে সম্পন্ন করেছে গত তিরিশ বছরে। এবং এই মুহূর্তেও করে চলেছে।
স্বর্গত নীরদচন্দ্র চৌধুরী মশাই তাঁর ‘আত্মঘাতী বাঙালি‌’ বইতে শিঙাড়ার চ্যাপ্টারটা লিখে যাননি। তাঁর মতো বিবুধ পুরুষের লিখে রাখা উচিত ছিল, ঠিক কোন প্রক্রিয়ায় বাঙালি তার একান্ত সাধনার ধন শিঙাড়াকে ক্রমে মাহাত্ম্যচ্যুত করে আত্মঘাতের পথ প্রশস্ত করেছে। একথা সচেতন বাঙালি মাত্রেই মানবেন যে, বাঙালির আত্মপরিচয়ের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত এই আলু-ময়দার সমীকরণ। বাঙালির একান্ত স্ন্যাকস বলতে শিঙাড়াকেই বোঝায়, একথা আজ থেকে তিন দশক আগেও বাঙালি জানত। কিন্তু, গত বিশ বছরে বাঙালির শিঙাড়া যে বাতাসে মিলিয়ে ঘিয়েছে, সে বিষয়ে কি খেয়াল রেখেছেন সমাজ-নৃতত্ত্বের মাথালো মাথালো পণ্ডিতরা? খেয়াল রেখেছেন কি কালচারাল স্টাডির কালপুরুষবৃন্দ?

না। খেয়েল রাখেননি তাঁরা। কারণ সম্ভবত তাঁদের খাদ্যতালিকায় আরা যাই থাকুক, গত তিরিশ বছরে শিঙাড়া থাকেনি। দীনেশ সেন, নীহার রায়, সুকুমার সেন, সুনীতি চাটুজ্জে বেঁচে থাকতে শিঙাড়াও বেঁচে ছিল। তাঁদের প্রজন্মের উদ্বায়ীভবন আর বাঙালি-শিঙাড়ার অবলুপ্তি সমাপতনিক এবং অবশ্যই পরস্পর সম্পর্কযুক্ত। সেই বেদনার কথা থাক। এ পর্যন্ত পড়ে ফেলেছেন যাঁরা এই প্রতিবেদন, তাঁরা রইরই করে উঠবেন— কে বলেছে শিঙাড়া লুপ্ত, এই তো হাতের কাছেই…। তাঁদের অবগতির জন্য জানাই, হাতের কাছে লভ্য বস্তুটির নাম ‘সামোসা’ হলেও হতে পারে, ‘শিঙাড়া’ কখনওই নয়।
বাঙালির সংস্কৃতিতে অ-বাঙালি সংস্কৃতির আগ্রাসনের কাহিনি টের পাচ্ছেন কি মহামতি পাঠক? পান গিয়ে। তাতে কিস্যু এসে যায় না এই প্রতিবেদনের। কারণ, এ কথা দিনের আলোর চাইতেও স্পষ্ট যে, গত তিরিশ বছরে ধীরে ধীরে ধাপে ধাপে অবলুপ্তি ঘটেছে বাঙালির শিঙাড়ার। পাতলা খোলের ভিতরে যত্নে কাটা কুচো আলুর পুর, সোনালি করে ভাজা পিরামিডাকৃতি শিঙাড়া আজ থেকে তিন দশক আগে প্রায় সমস্ত মিষ্টির দোকানেই তৈরি হত। চাটনি অথবা কোনও অনুপান ছাড়াই বিক্রি হত সেই বস্তু। সেই শিঙাড়ার স্বাদ ছিল মধুর। উত্তর ভারতের তিখা ঝাল তাকে স্পর্শ করেনি। তাকে গলাধঃকরণ করতে লালরঙা সিরাপের চাটনিরও প্রয়োজন পড়েনি। শীতকালে তাতে যুক্ত হতো ফুলকপির টুকরো। দেকানের রাইরে নোটিশ পড়ত— ‘এখানে ফুলকপির শিঙাড়া ও নতুন গুড়ের সন্দেশ পাওয়া যায়’। সেই নোটিশ দেখেই বাঙালি টের পেত, শীত এসে গিয়েছে। অনেকে ফুলকপির শিঙাড়া মুখে গিয়েই বের করে ফেলতেন লেপ-কাঁথা। ক্রিসমাসের কেকের আগে, দার্জিলিংয়ের কমলালেবুর আগে সে-ই ছিল বাঙালির শীত-সিম্ফনির প্রিল্যুড।
মুড়ি দিয়ে খাওয়ার জন্য তেলেভাজাওয়ালারা ভাজতেন তাঁদের ফর্মুলার শিঙাড়া। মিষ্টির দোকানের শিঙাড়ার চাইতে তার শেপ ও স্বাদ ছিল একেবারেই আলাদা। আকারে ছোট সেই শিঙাড়ার একটু বেশি ঝালভাব থাকত। কিন্তু সেই ঝাল ছিল কাঁচালঙ্কার। সামোসার শুকনো লঙ্কা-জাত তিখাপনের সঙ্গে তার কোনও আত্মীয়তা ছিল না। গরাস গরাস মুড়ি চালান হয়ে যেত শ্রমজীবী বাঙালির পেটের খোঁদলে সেই শিঙাড়ার অনুপানে। একটু কল্পনা করলেই দেখা যেতে পারে, তেলেভাজাওয়ালার শিঙাড়া-সহ মুড়ি চিবুতে চিবুতে আন্দোলনের স্ট্র্যাটেজি ভাঁজছেন কমরেড কাকাবাবু, জ্যোতি বসুও তাঁর ধুতির কোঁচাটি সামলে কামড় দিচ্ছেন তাতে, সামনে গামলায় রাখা রয়েছে তেলচুপচুপ মুড়ি-বাদাম। কমন গামলায় হাত চালাচ্ছেন কমরেডরা। শ্রেণিচেতনার অবলোপের প্রথমিক পাঠ ঘটে চলেছে নিঃশব্দে।
মিষ্টির দেকানের শিঙাড়া কিন্তু অনেকটাই এলিটিস্ট। তার প্রত্নতত্ত্ব ঘাঁটলে খোঁজ মিলতে পারে কনে দেখা আলোর, খোঁজ মিলতে পারে ধনঞ্জয় ভট্টাচার্যের শ্যামাসংগীতের, মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের ‘আমি এত যে তোমায় ভালোবেসেছি’-র। তার অনুষঙ্গ কখনওই মুড়ি-বাদাম ছিল না। তার অনুষঙ্গ ছিল ভাল বোনচায়নায় দু’টি পাতা একটি কুঁড়ির, তার অনুষঙ্গ ছিল মুখে দিলে মিলিয়ে যাওয়া স্পঞ্জ রসগোল্লার। না, কখনওই পান্তুয়ার নয়, গুলাব জামুনের তো নয়ই। সেই পরিবেশে হেমন্ত সম্ভব, উত্তমকুমার সম্ভব, সৌমিত্রও সম্ভব, এমনকী সত্যজিৎ রায়ও সম্ভব (ফেলুদা কতবার মক্কেলের বাড়িতে শিঙাড়া-রসগোল্লা সাঁটিয়েছে মনে করুন)। কিন্তু কখনওই সলিল চৌধুরী সম্ভব নন, হেমাঙ্গ বিশ্বাস সম্ভব নন, ঋত্বিক ঘটক-বিজন ভট্টাচার্য সম্ভব নন। সেখানে সেই তেলেভাজাওয়ালার কামালই জন্ম দিচ্ছে ‘আমার প্রতিবাদের ভাষা’-র, জর্জ বিশ্বাস তাতে একটা কামড় বসিয়েই গেয়ে উঠছেন— ‘তুমি তো দিতেছ মা, যা আছে তোমারি/ স্বর্ণশস্য তব, জাহ্নবী বারি’। ক্যামেরা ঘুরছে, বাঙালির স্মৃতি-সত্তায় পাক দিয়ে উঠছে যুক্তি, তক্কো আর গপ্পো।
এলিটই হোক আর প্রলেতারিয়েতই হোক, শিঙাড়াই যে বাঙালির অন্তঃকরণের নির্ণায়ক, তা প্রমাণ করতে খুব বেশি আয়াস পেতে হয় না। একথাও টের পেতে দেরি হয় না যে, বাঙালির সার্বিক অধোগতির জন্য দায়ী তার নিজস্ব শিঙাড়ার অবলোপ। মোটা খোলা, ঘোঁটা আলুর তীব্র ঝাল উত্তর ভারতীয় শিঙাড়া এখন পাড়ার দোকানেও ভাইরাল। তীক্ষ্ণ ঝাল এই পদার্থের খোল ভেঙে মরমে পৌঁছলে দেখা যায় কোনও যত্নের ছাপ সেখানে নেই। কড়াইতে শুকনো লঙ্কা-ফোড়ন দিয়ে তৈমুর লঙের তলোয়ার চালানোর কেতায় খুন্তি ঘুঁটে নির্মিত হয় তার পুর। তাকে উদরস্থ করতে গেলে দরকার পড়ে লাল চাটনি নামক আর এক জালি মালের। খাওয়ার পনের মিনিটের মধ্যে অম্বলে পেট ফুলে ঢোল। জিভ অসাড়। চিত্ত পার্মানেন্টলি বিকল।

এখানেই শেষ নয়। শিঙাড়াকে আরও বিপন্ন করে তুলতে আবিস্কৃত হয়েছে ‘চাইনিজ শিঙাড়া’। মোটা খোলের বর্মের অন্তরে সেখানে চাউমিন ঠাসা। কনফেকশনারি-র দোকানে ‘চিকেন শিঙাড়া’ নামে যে মালটি বিক্রি হয়, সেটিতে একবার দাঁত বসালেই টের পাওয়া যায় টুটেনখামেনের মমি ঠিক কেমন খেতে হতে পারে। বাঙালির বিরল বিলাসের উপকরণ মাংসের শিঙাড়ার কোন স্তরের অপভ্রংশ সেটা, গবেষণা না করে বলা যাবে না। এখানেই শেষ নয়, সামোসার লেজ ধরে একটা খুদে সাইজের নুড়কুত মাল ‘মিনি সামোসা’ নামে বাজারে বিকোয়। ছাতুর পুর পোরা সেই বস্তু খেলেই টের পাওয়া যায় রাজপুতানার নিভৃত ইতিহাস। সেটা ভাল খেতে হতেই পারে। কিন্তু তার সাংস্কৃতিক মহিমায় বাঙালি নেই, বাঙালি থাকতে পারে না। অথচ তাকেও ধারণ করছে শ্রীহরি বা মহাপ্রভু মিষ্টান্ন ভাণ্ডার। তাকেও দেখছে কনে দেখা আলোয় ঠিকরে ওঠা প্লেট। সঙ্গ দিচ্ছে কাজুবাদাম, সঙ্গ দিচ্ছে কাপুচিনো।
সে রিয়্যালিটি বাঙালির নয়। মানে, ‘বাঙালি’ বলে একদা যে জাতিসত্তা তার এথনিসিটিকে কাঁধে তুলে হোয়াট বেঙ্গল থিংকস টুডে— বলে গোঁফ চুমড়োতো, তার সঙ্গে এই শিঙাড়া-বাস্ততার কোনও লেনা-দেনা নেই। তেলেভাজাওয়ালাও আর সেই প্রলেতারিয়েত শিঙাড়া ভাজেন না। তাঁর কাচের শোকেসে বিরাজ করে খোল মোটা সামোসার দল। শালপাতায় মুড়ে সেটা এগিয়ে দিতে দিতে তিনিও জিগ্যেস করে— ‘চাটনি নেবেন না?’
নবারুণ ভট্টাচার্য বেঁচে থাকলে কি লিখতেন— ‘এই শিঙাড়াশূন্য উপত্যকা আমার দেশ না’? সামোসার আস্তরণ থেকে বন্দিমুক্তির ডাক আসত কি সলিল চৌধুরীর সুরে? তাতে কণ্ঠ দিতে এগিয়ে আসতেন কি হেমন্ত মুখোপাধ্যায়? হাতিবাগানের সুর ও বাণী আর রাসবিহারীর দ্য মেলডির গর্ভ থেকে বেরিয়ে আসত কি সেই গান? পাতলা খোলের আস্তরণ ছাড়িয়ে, নোনতা-মধুর পুরে মন হারাতে হারাতে বাঙালি নামক এক জাতিসত্তা পুরোপুরি আত্মবিস্মৃত হওয়ার ঠিক আগটায় শেষবারের মতো শুনে নিচ্ছে সেই ‘সোয়ান সং’। চার পাশে হয়ত নামছে বিজয়া দশমীর রাত দশটার শূন্যতা। নিঃশব্দে। নিঃসাড়ে।

• ‘শিঙাড়া’ বানানটি ইচ্ছে করেই রাখা হয়েছে। এর অন্তর্নিহিত শিঙ যদি বাঙালির সেন্টুতে হালকা করেও ঢুঁসোয়…! আর এই মুসাবিদায় উল্লিখিত বাংলা ও বাঙালি একান্তভাবেই পশ্চিমবঙ্গবাসী ও তার বাসিন্দারা। পূর্ববঙ্গ আর সেখানকার কথা এ লেখায় বিচার্য নন। কারণ, তাঁরা সেই আদি ও অকৃত্রিম বাঙালি শিঙারাকে তার পূর্ণ মহিমা ও মর্যাদায় স্থিত রেখেছেন। তাঁদের প্রণাম।