মেইন ম্যেনু

শিশুদের দাসত্ব ঘোচাতে গিয়ে কীভাবে প্রাণ দিয়েছিল কিশোর ইকবাল

নব্বইয়ের দশকে পাকিস্তানের একটি গ্রামের কিশোর এক বালক কীভাবে তার দাসত্বের শৃঙ্খল ভেঙে আন্তর্জাতিক প্রচারক হয়ে উঠেছিলেন এবং এজন কীভাবে তাকে জীবন দিতে হয়েছিল তা নিয়েই এই পর্বের ইতিহাসের সাক্ষী।

মাত্র চার বছর বয়সে ইকবাল মাসিহকে কার্পেট বোনার কাজে দাস হিসাবে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু পরে ওই শৃঙ্খলিত জীবন থেকে পালিয়ে যায় ইকবাল এবং শিশু অধিকার নিয়ে সংগ্রামের একজন প্রবক্তা হয়ে ওঠে অল্প বয়সেই। এহসানউল্লাহ খানের সংস্থা ইকবালের মুক্তিতে সাহায্য করেছিল।

কীভাবে সেকথাই বিবিসিকে বলেছেন এহসানউল্লাহ খান। ১৯৯২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে উত্তর পশ্চিম পাকিস্তানের শেখোপুরায় এক বৈঠক ডেকেছিল বন্ডেড লেবার লিবারেশন ফ্রন্ট সংক্ষেপে বিএলএলএফ- যারা দক্ষিণ এশিয়া থেকে দাসত্ব নির্মূল করার জন্য তখন আন্দোলন ও প্রচারণা চালাচ্ছিল।

সেবছরই আরও আগে পাকিস্তান সরকার দাসত্ব- শ্রম নিষিদ্ধ করেছিল, কিন্তু এই মর্মে কোনো আইন বলবৎ করেনি। বিএলএলএফ-এর প্রতিষ্ঠাতা এহসানউল্লাহ খান বলছিলেন ওই বৈঠকে যোগ দিতে এসেছিল ছোট্ট একটি ছেলে। ”ছেলেটির মুখ দেখে আমার মনে হল সে কিছু বলতে চায়। কিন্তু সাহস পাচ্ছে না।”

ছেলেটির বয়স মাত্র ১০, উচ্চতায় ৪ফুট। ”ছেলেটার চোখেমুখে ছিল ভয়, আর চেহারা ছিল খুব নোংরা। আমি ওর সঙ্গে দশ মিনিটের মত কথা বললামা। ও চুপ করে রইল। কিন্তু আমি ওর কথা শুনতে চাইছি বুঝতে পারার পর ও মুখ খুলল। আমার দিকে তাকিয়ে ভয়ে ভয়ে বলল, ‘আমি ইকবাল’। আমি জিজ্ঞেস করলাম ‘তুমি কী কর?’ ও বলল ‘কার্পেট বুনি’। জানতে চাইলাম- ‘কতদিন এ কাজ করছ’?

ও বলল চার বছর বয়স থেকে।” খান ইকবালকে সাহস দেবার চেষ্টা করেছিলেন – বলেছিলেন অন্য ছেলেরা কেমন তাদের কাজের কথা বলছে- তাকেও বলেছিলেন তুমিও বলো না!

”ও ঘাড় নেড়ে বলল- না-না-না-না। ও থরথর করে কাঁপছিল, ঘামছিল। আমি ওর সঙ্গে আরও কিছুক্ষণ কথা বলার পর ও সাহস পেল। ওর পাশে অন্য যে বাচ্চারা বসেছিল তারাও ওকে সাহস দিল- মাইকের সামনে দাঁড়াতে সাহায্য করল। সেটাই ছিল মুক্তির পথে ওর প্রথম পদক্ষেপ,” বলছিলেন এহসানউল্লাহ খান। শেখোপুরায় এহসানউল্লাহ খানের সঙ্গে ওই বৈঠকে ইকবাল তার মালিকের নিষ্ঠুরতা সম্পর্কে একটা ভাষণ দিয়েছিল।

”আমি কাজ থেকে পালিয়ে গিয়েছিলাম। মালিক সেখানে যেতে আমাকে নিষেধ করেছিল। আমি যখন ভাষণ দিয়ে ফিরলাম আমার মালিক বলল তোমাকে আর ওখানে যেতে দেব না। আমার কিন্তু মালিক সম্পর্কে তখন ভয় কেটে গিয়েছিল। বরং মালিক আমাকে ভয় করতে শুরু করল,” এমনটাই ছিল এহসানউল্লাহর রেকর্ড করা ইকবালের বক্তব্য ।

ইকবাল ছিল পাকিস্তানের শ্রমজীবী কয়েক লক্ষ শিশুর একজন, যাদের অধিকাংশই দাসখৎ লিখে দেওয়া শ্রমিক হিসাবে কাজ করত। অর্থাৎ তাদের বাপমায়েরা হয় কারখানা মালিক বা জমি মালিক বা অপরাধী চক্রের কাছে কোনো না কোনোভাবে ছিলেন দেনাগ্রস্ত। তাদের বাচ্চাদের গতর খেটে সেই দেনা শোধ করতে হতো। ইকবাল ছিল দরিদ্র পরিবারের সন্তান। তার পরিবার থাকত লাহোরের কাছে মোরিদ্‌কে নামে এক এলাকায়।

তার পরিবার স্থানীয় একজন কার্পেট ব্যবসায়ীর কাছ থেকে ৬০০ রুপি ধার নিয়েছিল। কার্পেট কারখানার ঐ মালিকের দেনা পরিবারটি শোধ করতে না পারায় ইকবালের মা তার ছেলেকে দাস হিসাবে খাটার জন্য তার কাছে বিক্রি করে দেন।

এইধরনের দেনাব্যবস্থার জালে পরিবারগুলোকে জড়িয়ে ফেলার যে পদ্ধতি পাকিস্তানে তাকে বলা হয় ‘পেশগি’। সারা পাকিস্তান জুড়ে চলত এই পেশগি ব্যবস্থা- খুবই বড় ছিল এদের জাল- বলছিলেন এহসানউল্লাহ খান।

”যেসব বাচ্চারা স্কুল যায় না, তারা এই ব্যবস্থার মধ্যে জড়িয়ে পড়ে। এই নেটওয়ার্ক একটা মাফিয়া নেটওয়ার্কের মত। কখনও এরা বাপমায়েদের ঘুষ দেয়, কখনও চাপ দিয়ে বাচ্চাদের শ্রমে দাসখৎ লেখাতে বাধ্য করে। তাদের এভাবে জোর করে কাজে নিয়ে যায়। এটাই ওদের ব্যবস্থা, যে ব্যবস্থার শিকার হয়েছিল ইকবাল।”

কখনও কখনও ইকবালকে এই কার্পেট কারখানায় ১৪ঘন্টাও কাজ করতে হতো। ভোর থেকে প্রায় রাত অবধি সে কাজ করতো। খান বলছেন তাদের মারধোর করা হতো, শেকল দিয়ে বেঁধে রাখা হতো। নির্যাতন চালানো হতো। চার বছর বয়স থেকে ইকবাল এবং কারখানার অন্য শিশুরা এই জীবনেই অভ্যস্ত ছিল।

এহসানের সংস্থার প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপের ফলে দাসত্ব শ্রম থেকে মুক্তি পায় ইকবাল। শেখোপুরার বৈঠকে ইকবালকে প্রথম দেখার পর সংস্থার কর্মীরা ইকবালের কর্মস্থলে যায় এবং ইকবাল ও আরও বেশ কিছু শিশুকে সেখান থেকে উদ্ধার করে আনে। উদ্ধারকারীরা একাজে অনেক ঝুঁকি নিয়েছিলেন। কারণ তাদের হামলা ও মৃত্যুর হুমকীর মুখে কাজ করতে হয় বলে বলেছেন খান। ইকবাল মুক্তি পাবার পর প্রথমেই তাকে স্কুলে পাঠানোর উদ্যোগ নেন এহসানুল্লাহ খান।

”আমি তার গ্রামেই স্কুল খুলেছিলাম। কিন্তু কাপের্ট ব্যবসার গুণ্ডারা সেটা পুড়িয়ে দিয়েছিল। স্কুলের শিক্ষককে ওরা মারধোর করত, আসবাবপত্র জ্বালিয়ে দিয়েছিল। ওর মা এসে আমাকে বলেছিল ইকবাল পড়তে চায় এবং আমি যেন তার সবসময়কার অভিভাবক হই। তিনি বলেছিলেন আমার পক্ষে ওকে বাসায় রাখা সম্ভব নয়। তাই আমিই যেন ওকে পড়াই। এরপর ও আমার সঙ্গেই থাকত।”

এহসানের সংস্থা প্রায় ১১ হাজার এধরনের শিশুর জন্য যে দুশ-বিশটি স্কুল খুলেছিল তারই একটিতে যেতে শুরু করে ইকবাল।

অল্পদিনের মধ্যেই ওই শিশুদের মধ্যে ইকবাল আলাদা করে নিজের একটা জায়গা তৈরি করে নেয়। পাকিস্তানের বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে শিশুশ্রমিকদের অধিকার নিয়ে কথা বলতে শুরু করে।

তার প্রচার-কাজের জন্য ১৯৯৪ সালে ইকবাল আমেরিকায় একটি সম্মানজনক মানবাধিকার পুরস্কার পায়। পুরস্কার নেওয়ার জন্য এহসানের সঙ্গে ইকবাল আমেরিকার বস্টন শহরে যায় । ওই অনুষ্ঠানে ইকবাল বলেছিল তার নিজের কথায়: ”স্কুলে আমাদের একটা স্লোগান আছে- আমরা শিশুদের স্বাধীনতা চাই – আমরা সবাই সমস্বরে বলি- উই আর ফ্রি- আমরা স্বাধীন।”

ওই ইকবালের বক্তৃতা খুবই সমাদৃত হয়েছিল। সেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রিন্সিপাল ইকবালকে ভবিষ্যতে পড়ার সুযোগ দিতে চেয়েছিলেন । তিনি বলেছিলেন পাকিস্তানে স্কুলের পড়া শেষ করে ইকবাল ওখানে ভর্তি হতে পারবে। এবং চাইলে আইন পড়ে আইনজ্ঞ হতে পারবে। কিন্তু তার আকাশছোঁয়া স্বপ্ন শেষ পর্যন্ত সফল হতে পারেনি।

কিশোর ইকবাল তখন আমেরিকা ও ইউরোপের বিভিন্ন শহরের স্কুলে বক্তৃতা দিয়ে বেড়াচ্ছে। দাসত্বের শেকলে বাধা শিশুদের কথা বলছে – তাদের মুক্তির পক্ষে প্রচারণা চালাচ্ছে। কিন্তু এর ফলে তখন নিজের দেশে এই স্পষ্টবক্তা কিশোরের অনেক শত্রু তৈরি হয়ে গেছে। এহসানউল্লাহ খান বলছিলেন দেশে ফেরার পর ইকবাল তার সঙ্গে ইসলামাবাদ যেতে চেয়েছিল। তিনি একটা সংবাদ সম্মেলন করতে চেয়েছিলেন।

”কিন্তু ওর মা এসে বলল কাল ইস্টারের উৎসব। আমি চাই ও দিনটা আমার কাছেই থাকুক। পরের দিন সকালে যখন আমি অফিসে গেলাম, আমাদের ড্রাইভারকে দেখলাম খুব চুপচাপ। ও আমাকে যখন নামিয়ে দিল , দেখলাম ও কাঁদছে। ও বলল মাত্র এক ঘন্টা আগে ও ফোন পেয়েছে যে ইকবালকে মেরে ফেলা হয়েছে। কেউ একজন তাকে শুধু জানিয়েছে ইকবালকে হত্যা করা হয়েছে।”

ইকবালকে অজ্ঞাতপরিচয় একজন বন্দুকধারী গুলি করে মারে। দিনটা ছিল ১৯৯৫ সালের ১৬ই এপ্রিল। ইকবাল যখন দুজন আত্মীয়ের সঙ্গে সাইকেলে ঘুরছিল, তখন কেউ তাকে গুলি করে। ইকবালের বয়স তখন মাত্র ১২।

তার হত্যার দায়ে কারো বিরুদ্ধেই অভিযোগ আনা হয়নি। খান মনে করেন, পাকিস্তানে শিশুদের দাসত্বে বেধে কাজ করানোর প্রথার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সোচ্চার হতে গিয়ে ইকবালকে প্রাণ দিতে হয়েছিল। এহসানউল্লাহ খানকেও পাকিস্তান সরকারের রোষানলে পড়ে দেশ ছাড়তে হয়েছিল।

খান বলছিলেন মালালা ইউসুফজাই ও কৈলাশ সত্যিয়ার্থী নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন কারণ তারা শিশুদের অধিকার নিয়ে সোচ্চার হয়েছেন। ”ইকবাল এবং আমরা এই লড়াই শুরু করেছিলাম। আমরা বলতে চেয়েছিলাম দাসত্ব ও শিশুশ্রম মানুষের তৈরি সমস্যা – এর সমাধান সম্ভব।”

পাকিস্তান এবং বিশ্বের অন্যত্র এখনও এধরনের দাস হিসাবে কাজ করছে লক্ষ লক্ষ শিশু। এহসানউল্লাহ বর্তমানে নির্বাসিত জীবন কাটাচ্ছেন সুইডেনে এবং এই মুহূর্তে তিনি ইকবাল মাসিহর জীবন নিয়ে একটি বই লিখছেন। -বিবিসি






মন্তব্য চালু নেই