মেইন ম্যেনু

শিশুদের প্রতি মহানবী (সা.) এর ভালোবাসা

আজকের শিশু আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। তাই শৈশবকাল থেকেই ইসলামের আলোকে শিশুকে আদর-যত্ন, স্নেহ-ভালোবাসা দিয়ে মানুষের মতো মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার দায়িত্ব আমাদের সকলের-যাতে সুনাগরিক হিসেবে তারা ভবিষ্যতে দেশ গড়ার কাজে অংশ নিতে পারে।

কিন্তু বর্তমানে আমাদের দেশে শিশু নির্যাতন অস্বাভাবিক হারে বেড়ে গেছে। দারিদ্র্যপীড়িত আমাদের দেশের অনেক শিশুই লেখাপড়ার সুযোগ পায় না। ক্ষুধার জ্বালা মেটাতে অনেক সময় তারা সমাজের বিত্তশালী লোকের বাড়িতে গৃহপরিচারিকার কাজ করে থাকে। গৃহপরিচারিকার কাজ করতে গিয়ে অনেক সময় তারা গৃহকর্ত্রী বা বাড়ির মালিকের হাতে পাশবিক নির্যাতনের শিকার হয়। এদের মধ্যে অনেকে মারাও যায়।

শিশু নির্যাতন বর্তমানে আমাদের দেশে ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধিতে রূপ নিয়েছে। এর প্রতিকার হওয়া আবশ্যক।

আমরা মুসলমান। ইসলাম আমাদের ধর্ম। এ ধর্ম শান্তির বার্তা বহন করে। আমাদের দেশে এমন অনেক মানুষ আছেন যারা অশিক্ষা ও কুশিক্ষার কারণে ইসলামকে বাস্তবিক অর্থে বুঝতে অক্ষম।

অনেকে ইসলামকে মসজিদের চার দেয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ কোনো পালনীয় ধর্ম বলে মনে করে। অথচ ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান ও সার্বজনীন ধর্ম। মানবতার ধর্ম ইসলামে সমাজের ধনী, দরিদ্র, ছোট বড় সকল শ্রেণীর মানুষের অধিকার এবং কর্তব্যের কথা রয়েছে।

বিশেষ করে শিশুর প্রতি আচরণ সম্পর্কে ইসলাম অত্যন্ত সচেতন।

মহানবী (সাঃ) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি শিশুকে স্নেহ করে না এবং বড়দের সম্মান দেখায় না সে আমাদের দলভুক্ত নয়’।

শিশুর প্রতি ভালোবাসাপূর্ণ আচরণের তাগিদ দিয়ে মহানবী (সাঃ) আরো বলেছেন, ‘শিশুদের প্রতি স্নেহ ও আদর দেখায় না এমন ব্যক্তিকে ইসলাম থেকে বহিষ্কার করা উচিত।’

এজন্য ওলামায়ে ক্বেরাম বলেন, ছোটদের প্রতি দুব্যবহার কবিরা গুনাহের সমতুল্য।

আল্লাহপাকের দয়া ও করুণা পেতে হলে আমাদেরকে ছোটদের প্রতি ভালোবাসাপূর্ণ আচরণ করতে হবে। ইমাম বোখারী (রহঃ) সাহাবী হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ)-এর উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, একদা রাসূল (সাঃ) নিজ নাতি হাসান (রাঃ)কে চুমু খেলেন। সে সময় তার কাছে আকরা বিন হারেস উপস্থিত ছিলেন। তিনি বললেন, আমি দশ সন্তানের জনক। কিন্তু আমি কখনও তাদের আদর করে চুমু খাইনি।

তখন মহানবী (সাঃ) তার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘যে দয়া করে না, তার প্রতিও দয়া করা হয় না’। (বোখারী: ৫৬৫১)।

নিজের বাচ্চাদের প্রতি ভালোবাসা সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। ইসলামের দৃষ্টিতে সব শিশুর প্রতি আমাদের স্নেহ ও ভালোবাসা দেখাতে হবে। বিশেষ করে যেসব শিশুর বাবা বেঁচে নেই কিংবা বাবা-মা কেউই বেঁচে নেই, সেসব অনাথ শিশুদের প্রতি আমাদের মমত্ববোধ প্রকাশ করতে হবে। তাদের খোঁজখবর নিতে হবে এবং প্রয়োজনে তাদের প্রতি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে হবে।

মহানবী (সা.) বলেন, ‘আমি এবং এতিমের প্রতিপালনকারী জান্নাতে এভাবে থাকব। একথা বলে তিনি তর্জনী ও মধ্যমা অঙ্গুলির মধ্যে সামান্য ফাঁক রাখলেন। বোখারী : ৪৯৯৮)।

মহানবী (সাঃ) কেবল শিশুদের ভালোবেসেই ক্ষান্ত হননি, তিনি তাদের খোঁজখবরও নিতেন। মাঝে-মধ্যে তাদের সাথে রসিকতাও করতেন। অনেক সময় ঘোড়া সেজে নাতি হাসান, হোসেনকে পিঠে নিয়ে মজা করতেন।

হযরত আনাস (রাঃ) বলেন, রাসূল (সাঃ) আমাদের বাড়িতে আসতেন। আমার ছোট ভাই, তার উপনাম ছিল আবু উমায়ের। তার একটি বুলবুলি পাখি ছিল। সে তার প্রিয় পাখিটি নিয়ে খেলা করতো। একদিন পাখিটি মারা গেল। অতঃপর কোনো একদিন রাসূল (সাঃ) আমাদের বাড়িতে এসে দেখলেন, আবু উমায়েরের মন খারাপ। মহানবী (সাঃ) জিজ্ঞেস করলেন, আবু উমায়ের মন খারাপ কেন?

সবাই বললো, তার বুলবুলি পাখিটা মারা গেছে। তখন মহানবী (সাঃ) বললেন, ‘হে আবু উমায়ের! তোমার বুলবুলিটির কি হয়েছিল? [সুনানে আবু দাউদ : ৪৯৭১]

একজন নবী হয়েও শত ব্যস্ততার মাঝে তিনি শিশুদের খোঁজখবর নিতেন। এটি তার সুমহান চরিত্রের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। শিশুর প্রতি মহানবী (সাঃ)-এর ভালোবাসার কারণে তারাও মহানবীকে (সাঃ) গভীরভাবে ভালোবাসতেন।

হযরত আবদুল্লাহ বিন জাফর (রাঃ) বলেন, মহানবী (সাঃ) যখন কোনো সফর শেষে বাড়িতে ফিরতেন তখন বাচ্চারা তার আগমনের পথে গিয়ে অভ্যর্থনা জানাত। একদা তিনি তার সফর থেকে এসে আমাকে তার বাহনের সামনে বসালেন। অতঃপর নাতি হাসান, হোসেন (রা.)কে বাহনের পেছনে বসালেন। তারপর আমাদের নিয়ে তিনি মদীনায় প্রবেশ করলেন। [মুসলিম : ৬৪২১]

মক্কা বিজয়ের পর যখন মহানবী (সাঃ) মক্কা শহরে আগমন করেন তখন কিছু ছোট বাচ্চা তার এলে তিনি তাদের আদর করেছিলেন।

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন, বিজয়ীবেশে মহানবী (সাঃ) যখন মক্কায় প্রবেশ করেন তখন আবদুল মুতালিব বংশের ছোট ছোট ছেলেরা তার কাছে আসে। তিনি তাদের একজনকে নিজ বাহনের সামনে বসালেন এবং অপর একজনকে পেছনে বসালেন। [বোখারী: ১৭০৪]

শিশুদের সাথে ছিল মহানবী (সাঃ)-এর সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক এবং তাদের প্রতি গভীর ভালোবাসা। তিনি ছোটদের তার বাহনের সামনে-পেছনে বসিয়ে আনন্দ দিয়েছেন। আর আজ আমরা তার উম্মত হয়ে শিশুদের অপহরণ ও পাশবিক নির্যাতনের মাধ্যমে হত্যা করছি। গাড়ি চাপা দিয়ে হত্যা করতেও দ্বিধা করছি না।

হযরত আবু দারদা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, একদা এক ব্যক্তি মহানবী (সাঃ)-এর কাছে হাজির হয়ে বলল, আমার অন্তর বড়ই কঠিন। তিনি বললেন, তুমি কি তোমার অন্তর কোমল করতে চাও? সে বলল, হ্যাঁ। তিনি বললেন, তাহলে এতিম বাচ্চাদের আদর কর, স্নেহ-ভালোবাস প্রদান কর, তাদের মাথায় হাত বুলিয়ে দাও, তাদের খাবার খাওয়াও। তবেই তোমার অন্তর কোমল হবে।

শিশুর প্রতি নিষ্ঠুরতা বা দয়াহীনতা দেখিয়ে আমাদের সমাজকে কলঙ্কিত করে ফেলা হয়েছে। হৃদয়হীন বা নির্দয় ব্যক্তি সবচেয়ে বড় হতভাগ্য। তার প্রতি আল্লাহর রহমত বর্ষিত হবে না। হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণি, মহানবী (সা.) বলেন, ‘কেবল হতভাগ্য ব্যক্তির হৃদয় থেকেই দয়া তুলে নেয়া হয়’। [তিরমিজি-১৯২৩]

তাই যারা শিশু র্নিাতন করে তাদের ওপর আল্লাহর অভিশাপ বর্ষিত হয়। সুতরাং আসুন, আমরা আদর-যত্ন, স্নেহ-ভালোবাসা দিয়ে শিশুকে মানুষ করি, শিশুর সাথে সৌহার্দ্যপূর্ণ আচরণ করি।