মেইন ম্যেনু

শিশুবিবাহ : বর্তমান প্রেক্ষাপট

হামিদা আক্তার স্মৃতি : আমাদের মোট জনসংখ্যার প্রায় শতকরা ২১% এর বয়স ১০-১৯ বছরের মধ্যে। যাদের শিশুবিবাহের হাত থেকে রক্ষা করে পড়াশুনা করানো হলে দেশের শ্রম বাজারে ৩ কোটির বেশী দক্ষ জনশক্তি হিসেবে সংযুক্ত করা যাবে। শিশুবিবাহরে হার শুন্যে নামিয়ে আনতে পারলে ৭৫.৫% মেয়ের বিয়ের পরে স্কুলে যাওয়া ছেড়ে দিতে হবে না। শিশুবিবাহ রোধ করতে পারলে সহিংসতা রোধে পরিবার প্রতি গড়ে বাৎসরিক ১১,৯৭৬ টাকার খরচ কমানো সম্ভব। ১৮ বছরের পূর্বেই মা হওয়ার কারনে মা ও শিশু মৃর্ত্যুর ঝুকি বেশী থাকে। ফলে জাতীয় ভাবে এ খাদে খরচ করে অপচয় কর হয় বছরে প্রায় ১৪ কোটি টাকা। যা জিডিপি’র প্রায় ২.৫ ভাগ। আর শিশুবিবাহ রোধ করে এ টাকার প্রায় ৫০% কমানো সম্ভব হতো। শিশুবিবাহকে মানবাধিকার লঙ্ঘনের এক নির্মম ব্যবস্থা হিসেবে আখ্যায়িত করা যায়। বর্তমানে বাংলাদেশের অর্থি-সামাজিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় শিশুবিবাহ বিশেষ করে কন্যাশিশুবিবাহ ভয়াবহ একটি সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে।

১৯২৯ সালের শিশুবিবাহ আইনে বলা হয়েছে বাল্যকালে অথবা নাবালক বয়সে ছেলে মেয়েদের বিবাহ হলে সেটাই হবে শিশুবিবাহ। তাছাড়া বিশ্ব শিশু সনদ ও বাংলাদেশের জাতীয় শিশু নীতির ঘোরতর লঙ্ঘন শিশুবিবাহ। অথচ দূর্ভাগ্যজনক ভাবে শিশু বিবাহের ভয়াবহতার বিবেচনায় বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে চতুর্থ। দেশের ২০-২৪ বছর বয়সী বিবাহিত নারীদের মধ্যে ৬৪ ভাগেই বিয়ে হয় ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই (ইউনিসেফ-২০১২)। দেশে আইন থাকা সত্বেও শিশুবিবাহের হার উদ্বেগজনক। এখনও এক-তৃতীয়াংশ মেয়ের ১৫ বছরের পূর্বে এবং দুই-তৃতীয়াংশ মেয়ের ১৮ বছরের পূর্বে বিয়ে হয়। গ্রামাঞ্চলে এ হার ৭১% এবং শহরে ৫৪%। প্রায় এক শতাব্দী পূর্বের আইনটি শিশুবিবাহ প্রতিরোধে ব্যর্থ হয়েছে। অনেক দেরিতে হলেও বর্তমান সরকার আইনটি পরিবর্তনের উদ্যোগ গ্রহন করেছেন। যা বর্তমানে খসড়া আকারে আইনটি মন্ত্রীসভার অনুমোদন সাপেক্ষে প্রণয়নের অপেক্ষায় রয়েছে। যদিও আইনটি বাস্তবায়ন হলে শিশুবিবাহের হার শুন্যের কোঠায় নেমে আসবে না, তথাপি মাঠ পর্যায়ে প্রতিরোধ কার্যক্রমগুলো আরও শক্তিশালী হবার একটি জোরালো ভীত রচিত হবে।

বাংলাদেশের অনেক প্রান্তিক অঞ্চলে এখনো শিক্ষার আলো পৌছেনি পুরোপুরিভাবে। কুসংস্কার ও অন্ধ বিশ্বাস এবং মেয়েদের প্রতি আস্থাহীনতার কারনে শিশুকন্যাদের মাঝে বিরাজ করছে অজ্ঞতা ও অশিক্ষা। ফলে প্রান্তিক অঞ্চলের এসব জায়গায় শিশু কন্যাদের যত তারাতারি সম্ভব বিয়ে দেওয়াকে দায়িত্ব মনে করা হয়। পারিবারিক নির্যাতনের শিকার নারীদের প্রায় ৩৩% নিরক্ষর আর ৩৩% রয়েছে শুধু প্রাথমিক শিক্ষা। অথচ শিক্ষিত একজন মেয়ে তার দায়িত্ব ও অধিকার সম্পর্কে অনেক বেশী সচেতন হয় এবং তার সন্তানের শিক্ষিত ও সমৃদ্ধ জীবন লাভের সম্ভাবনা বেশী থাকে। এই শিক্ষাই অনেক ক্ষেত্রে বিয়ে বিলম্বিত করতে পারে। নারী যেহেতু শুধু ঘরের কাজে সম্পৃক্ত থাকবে সে জন্য স্বাক্ষর জ্ঞান শিক্ষার অতিরিক্ত মেয়েদের প্রয়োজনে নেই বলেই অনেক বাবা-মা মনে করেন। দেশে ১৮ বছরের আগে যাদের বিয়ে হয়েছে তাদের ৮৬% শিক্ষাহীন,৭৭% প্রাথমিক শিক্ষায় শিক্ষিত,এবং মাত্র ২৬% মাধ্যমিক কিংবা উচ্চ শিক্ষায় পা রাখে। অল্প বয়সে বিয়ে হলে মেয়েরা তাদের লেখাপড়া শেষ করতে পারে না এবং পরিবারকে দারিদ্র থেকে তুলে আনার অর্থনৈতিক সক্ষমতা অর্জন করে না। অনেক ক্ষেত্রে তাদের সন্তানেরা একই পরিনতির দিকে যায়। যার ফলে কন্যাশিশু ও তার পরিবারকে একটি দারিদ্র চক্রের দিকে ঠেলে দেয়। দারিদ্র চক্র কোন অনিবার্য পরিণতি হতে পারে না। এ ক্ষেত্রে যদি মেয়েদের বিয়ে না দিয়ে স্কৃুলে পাঠানো নিশ্চিত করা যায় তাহলে তাদের জীবন অনেক বেশী সমৃদ্ধ হতে পারে। দেশের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিশুদের বিশেষ করে কন্যাশিশুদের বিদ্যালয়ে উপস্থিতি বাড়ানো ও উন্নত শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টির লক্ষ্যে শিক্ষকদেতর সম্পৃক্ত করতে হবে। শিক্ষকরা তাদের বাড়ী পরিদর্শন করে বিদ্যালয়ে উপস্থিতি নিশ্চিত করতে পারেন। বিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং ব্যবস্থাপনা কমিটির উদ্যোগে স্বামী পরিত্যাক্তা,তালাক প্রাপ্ত এবং বিবাহিত মেয়ে/নারীদের স্কুলে আসতে উৎসাহিত করা হলে ঝড়ে পড়া অনেকাংশে কমে যাবে।

মেয়েদের জন্য ¯œাতক পর্যন্ত শিক্ষা অবৈতনিক করা হলেও তাদের উচ্চ শিক্ষা অর্জন অনেক ব্যয বহুল ও ঝুঁকিপূর্ন্য। মেয়েদের ঘরের কাজ শেষ করে সময় থাকলে মাধ্যমিক শিক্ষা অর্জন একটি রীতি হয়ে দাঁড়িয়েছে, এটি দেশে শিশুবিবাহের অন্যতম কারন হলেও অন্যান্য কারনগুলি হচ্ছে সামাজিক চাপ, শিক্ষা ও সচেতনতার অভাব, দারিদ্রতা, পরিবারের সম্মান ও নিরাপত্তাহীনতা, ব্যয়বহুল উচ্চ শিক্ষা এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের স্বল্পতা। অনিরাপদ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের ভিতরেই সহপাঠি, সিনিয়র কিংবা শিক্ষক কেহই নারী বান্ধব না হওয়ায় ঘটছে যৌন হয়রানীর মত ঘটনা। যৌন হয়রানী প্রতিরোধে হাইকোর্টের যুগান্তকারী রায় (১৪মে’২০১৪) অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কর্তৃপক্ষ জানেন না। এমনকি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানী নির্মুল কমিটিও নেই। কন্যাশিশুদের নেতৃত্ব বিকাশে স্কুলের ভূমিকা অপরিহার্য এবং নেতৃত্বের চর্চাই তাদের আত্মবিশ্বাসী করে গড়ে তুলতে সাহায্য করে। স্কুলে নিয়মিত সাংস্কৃতি অনুষ্ঠান ও খেলা ধুলার চর্চা করাতে হবে। কন্যাশিশুদের জন্য আলাদা বিশ্রামাগার,টয়লেট,বিশেষ প্রয়োজনে পোশাক পরিবর্তনের কমনরুম ইত্যাদির ব্যবস্থা রাখতে হবে।
সামাজিক নিরাপত্তাহীনতার কারনে অনেক মা-বাবা তাদের অল্প বয়সী মেয়েদের বিয়ে দেন তারাতারি। কারন এসব অভিভাবকদের চোখে ভাঁসে তাদের মেয়ে শিশুরা নিজের পরিবারে, স্কুলে, চলার পথে, বাজারে সর্বত্রই শারীরিক ও যৌন হয়রানীর শিকার হতে পারে হরহামেশাই। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো যখন এসব শিশু কন্যাদের বিয়ে দেওয়া হয় তখন শিশু মেয়েটির নির্যাতন না কমে বরং অনেক ক্ষেত্রেই বাড়ে। এসব শিশু কন্যাদের বিয়ের পরে প্রজনন শিক্ষার অভাব, সিন্ধান্ত গ্রহনের অক্ষমতা, অধিকার ও কর্তব্য সম্পর্কে জ্ঞানের অভাব তাকে আরও ভয়ংকর পরিণতির দিকে ঠেলে দেয়। ফলে পারিবারিক নির্যাতন, যৌন নির্যাতন, প্রতিনিয়ত ক্রমবর্ধমান হারে বৃদ্ধি, যৌতুক দাবি, স্বামীর নিখোঁজ হয়ে যাওয়া, এমন কি তালাকের মত ঘটনা প্রতিনিয়ত বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ কারনে গ্রামাঞ্চলে ও শহরের বস্তিগুলোতে স্বামী পরিত্যাক্ত মায়ের সংখ্যাও বৃদ্ধি পাচ্ছে একই হারে। অথচ বয়ঃসন্ধিক্ষনের সময় পার হতেই প্রতিবেশী ও গ্রামের দেওয়ানী মাতব্বর ঐ শিশুকন্যাকে বিয়ের দেওয়ার জন্য বিভিন্ন কৌশলে চাপ দিতে থাকেন অভিভাবকদের। অনেক সময় তাদের কথা মত বিয়ে না দিলে তারা শিশুকন্যার বাবা-মাকে এক ঘরে করে রাখার ভয়ভীতিও প্রদর্শন করেন। কোন উপয়ন্তর খুজে না পেয়ে অভিভাবকেরা শিশুকন্যার বিয়ে দিয়ে দেয় এসব চাপ থেকে নিজেদের বাঁচাতে। শিশুবিয়ে কৈশোরের সমাপ্তি ঘটায়, জোরপূর্বক যৌন সম্পর্কে বাধ্য করে, ব্যক্তি স্বাধিনতা খর্ব করে ও ব্যক্তি সত্তার বিকশিত হতে ব্যহত করে, যা কিশোরীদের আবেগের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। একটি মেয়ের পরিপূর্ন্য মানবিক সত্তা বিকশিত হতে পারে না। পাশাপাশি তারা সামাজিক ও আবেগিক সুস্থতা প্রজনন স্বাস্থ্য ও শিক্ষার সুযোগ থেকেও বঞ্চিত হয়।

শিশুবিবাহের কারনে কিশোরী বধুঁর শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য হুঁমকীর মধ্যে পড়ে। কিশোরী মা মৃত্যু ঝুঁকিতে থাকে। সেই অপুষ্ট মা যে শিশুর জন্ম দেয়, সেও থাকে মৃত্যুর ঝুঁকিতে। সুতরাং শিশুবিবাহের শিকার মেয়েটি পুরো জীবনই ঝুঁকির মধ্যে চলে যায়। বলা যায়, আমাদের দেশের কন্যাশিশুদের প্রায় ৩৫-৫০% অপুষ্টির শিকার। বিয়ের পরেই স্বামী ও পরিবারের অন্যরা সন্তানের মুখ দেখতে চায়। এক বা দুই বছরের মধ্যে সন্তান পেটে না এলে স্বামী যদি বংশরক্ষার জন্য আবার বিয়ে করে ফেলে। যার ফলে অনিচ্ছা সত্তেও কিশোরী মেয়েটি অপুষ্ট অবস্থায় কম ওজনের সন্তান জন্ম দেয়। অনেক সময় নবজাতক ও মায়ের অসুখ লেগেই থাকে। এসময় মা-নবজাতকের মৃত্যুর ঝুঁকি থাকে অনেকটাই। পরবর্তীতে এই অপুষ্ট মা ও শিশু পরিবার ও জাতির বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। অনেক ক্ষেত্রে মেয়েরাও ভবিষৎ জীবনের পরিণতি না ভেবে বিয়েতে সম্মতি দেয়, নিজেদের উপড় আস্থা এবং বিবাহত্তোর পরিণতি সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারানার অভাবে শিশু মেয়েরা অনিশ্চিত জীবনে পা রাখে বিয়ের মাধ্যমে।

বিশেষজ্ঞদের মতে কন্যাশিশুদের অল্প বযসে বিয়ে জরায়ুর মুখের ক্যানসারের অন্যতম কারন। কেননা এই অল্প বয়সী মেয়েদের জরায়ুর মুখের কোষ পরিপক্ক হওয়ার আগেই স্বামীর সঙ্গে যৌন মিলনের ফলে কোষগুলিতে বিভিন্ন ইনফেকশন হয়ে থাকে। এ কারনে ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। শুধু তাই নয়, এ সমস্যা শুধু গর্ভবতী মা ও ভ্রুনকেই ক্ষতিগ্রস্ত করে না, শিশুর জন্মের পরও তা অব্যাহত থাকে। এর ফলে কিশোরী নিজেই, পরিবার এবং সর্বোপরি সমাজ ও রাষ্ট্রের ক্ষতি করে।

বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন-২০১৩ এই খসড়া আকারে প্রস্তুত করা হয়েছে। আইনটির দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে। আইনের আওতায় গুরুত্বপূর্ন প্রস্তাবনাগুলো বিবেচনায় এনে অতি দ্রুত বাস্তবায়ন প্রয়োজন। ক্যাবিনেটে উপস্থাপন করে আইনটি খসড়া থেকে চুরান্ত করা খুবই জরুরী। পাশাপাশি মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে সংশ্লিষ্ট সকলকে বিশেষ করে স্থানীয় প্রশাসন, আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী , ইউনিয়ন পরিষদের জন প্রতিনিধি, বিবাহ রেজিষ্ট্রারদের অবহিত করণ ও প্রশিক্ষনের ব্যবস্থা করতে হবে। যাতে করে মাঠ পর্যায়ে কোন অসচ্ছতা না থাকে এবং একে আপরকে দোষারোপের সং¯কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে পারে এবং বাল্যবিবাহ নিরোধে অবদান রাখতে পারে। উল্লেখ্য, বহুবিবাহ রোধে ১৯৬১ সালে মুসলিম পারিবারিক আইন প্রবর্তিত হযেছে। এর সঠিক প্রয়োগেও শিশুবিবাহ রোধ করা সম্ভব। বিবাহ বিচ্ছেদ আইনের কড়াকড়ি ভাবে প্রয়োগ করা গেলে কিছুটা হলেও শিশু বিবাহ রোধ হবে।

শিশুবিবাহ বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান সামাজিক সমস্যা। এর ফলে ঘটে সুন্দর শৈশবের সমাপ্তি, হরণ হয় নিজস্ব পছন্দ-অপছন্দ ও স্বাধীনতা। শিশুবিবাহের পরিণতি শুধু শিশু বা তার পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয় না, এতে দেশ হয় অপুষ্ট, দূর্বল ও মেধাহীন ভবিষৎ প্রজন্মের উত্তারাধিকারী। সুতরাং শিশুবিবাহ বন্ধে যুগোপযোগী কঠোর আইন প্রণয়ন এবং আইনের সুষ্ঠু প্রয়োগ নিশ্চিত করা অত্যান্ত জরুরী, তবে সবচেয়ে বেশী জরুরী এই ব্যাপারে সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টি করা। এক্ষেত্রে নারীদের বিশেষ করে শিক্ষিত নারী পুরুষ কিশোরীদের এগিয়ে আসেতে হবে। এগিয়ে আসতে হবে সমাজের সচেতন মানুষদেরও। শিশুবিয়ের ভয়াবহতা থেকে নারী বেরিয়ে আসবে, তাদের জীবনের পূনাঙ্গ সমম্ভাবনা কে কাজে লাগাতে সক্ষম হবে ফলে সমাজ থেকে শিশুবিবাহ নামক এই ব্যাধিটি চিরতরে নির্মূল হবে।

লেখক : সাংবাদিক