মেইন ম্যেনু

শূন্য থেকে সাফল্যের শীর্ষে, বাবার চিঠি মেয়েকে

শূন্য থেকে শুরু করে সাফল্যের শীর্ষে তিনি। ছেলে, স্বামী, বাবা, নামি তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থার প্রতিষ্ঠাতার একাধিক সম্পর্কের গুরুদায়িত্ব এখন তার কাঁধে। কিন্তু এর মধ্যে একটিই সম্পর্ক, যা তার অস্তিত্বকে পূর্ণতা দিয়েছে, তা গড়ে উঠেছিল প্রায় ৩৬ বছর আগে।

যখন তার কোল আলো করে এসেছিল ‘‌ছোট্ট পরী’ অক্ষতা।‌ কিন্তু জীবনের নানারকম দায়িত্ব সামলাতে সামলাতে তাকে বলা হয়ে ওঠেনি বহু কথা। অনেক কথা হয়তো মুখে বলা কঠিন।

তাই মেয়ের জন্য একটি দীর্ঘ চিঠি লিখেছেন ভারতের ইনফোসিস কর্তা নারায়ণ মূর্তি। সেই চিঠিই এখন ভাইরাল সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং সাইটে।

এই চিঠি আর পাঁচটা সাধারণ চিঠি থেকে অনেকটাই আলাদা। লেখিকা সুধা মেননের নতুন বই ‘‌লেগ্যাসি:‌ লেটার্স ফ্রম এমিনেন্ট পেরেন্টস’‌-‌এ ‌কন্যার প্রতি একজন পিতার কথাগুলো অনেকের চোখে অনুপ্রেরণার দলিল।

প্রিয় অক্ষতা,

‘‌বাবা’ পরিচয়টি যে আমার জীবনকে এতটা বদলে দেবে, তা কোনওদিন কল্পনা করিনি।‌ তোমার জন্মের পূর্বে আমি যে মানুষ ছিলাম, সেই জায়গায় ফিরে যাওয়া এখন অসম্ভব। আমার এই দীর্ঘ জীবনে তোমার জন্মের থেকে দামী মুহূর্ত আর কিছু নেই। তুমি যেদিন পৃথিবীতে এলে, আমার জন্য অকল্পনীয় খুশির পাশাপাশি নিয়ে এলে প্রচুর গুরুদায়িত্ব। তোমার জন্ম আমাকে নানাভাবে বদলে দিল। জীবনের প্রতি আমার দৃষ্টিভঙ্গি বদলালো। তোমার আগমনে আমি অনেক ভাল মানুষ হয়ে উঠলাম। অনেক বেশি সংবেদনশীল, সহানুভূতিশীল। কারণ আমি জানতাম, একদিন তুমি বড় হবে। সেদিন যেন আমার কোনও ভুলের মাশুল তোমাকে না দিতে হয়, তার জন্য আমি প্রতি মুহূর্তে সচেতন ছিলাম।

মাঝেমাঝেই আমি অতীতের কথা ভাবি। তোমার মা এবং আমার তখন অল্প বয়স। দু’‌জনেই নিজ নিজ পেশার কঠিন লড়াইয়ে একটু জায়গা করে নেওয়ার চেষ্টা করছি। হুবলিতে তোমার জন্মের দু’‌মাস পর তোমাকে ভাল জীবন দিতে আমরা মুম্বাই চলে আসি। কিন্তু ভুল ভাঙল খুব তাড়াতাড়িই। কাজের পাশাপাশি তোমার দেখভাল করা আমাদের পক্ষে সম্ভব হলো না। তোমাকে হুবলিতেই রেখে আসতে হল দাদু-‌দিদার কাছে।

এই সিদ্ধান্ত কিন্তু মোটেই সহজ ছিল না। প্রত্যেক সপ্তাহের শেষে বিমান ধরে বেলগাঁও, তারপর গাড়ি ভাড়া করে হুবলিতে তোমাকে দেখতে যেতাম। এই খরচ তখন আমার কাছে অনেক কষ্টের। কিন্তু তোমাকে না দেখে থাকা সম্ভব ছিল না। ধীরে ধীরে আমি অবাক চোখে দেখলাম, মা-‌বাবাকে ছাড়াই তুমি সেখানে কেমন নিজের ছোট্ট দুনিয়া গড়ে নিলে।
আমাকে অনেক সময় জিজ্ঞাসা করা হয়, আমার কোন বিশেষ গুণ আমার সন্তানদের মধ্যে দেখি। আমি তাঁদের বলি, এই গুরুদায়িত্বের ভার নিয়েছিলেন তোমাদের মা।

তোমাকে এবং রোহনকে যেভাবে উনি গড়ে তুলেছেন, সরল এবং সংযমী জীবনের যে শিক্ষা উনি তোমাদের দিয়েছেন, তার জন্য আমি ওঁর কাছে কৃতজ্ঞ। আমার মনে পড়ে আটের দশকে আমাদের বেঙ্গালুরুর জীবন। স্কুলের নাটকের জন্য তোমার একটি দামী জামার প্রয়োজন ছিল। আমাদের তা কিনে দেওয়ার সামর্থ্য ছিল না।

ফলে নাটকটিতে তুমি অংশ নিতে পারোনি। তোমার মা ভালভাবে বুঝিয়েছিলেন আমাদের অক্ষমতার কথা। তুমিও বুঝেছিলে। আমরা জানতাম তুমি ভীষণ কষ্ট পেয়েছিলে। কিন্তু এও জানতাম, এর সঙ্গে জীবনের একটি দামী শিক্ষাও তুমি পেয়েছিলে। এই সংযমই তোমাকে জীবনের নানা বাঁকে সাহায্য করেছে, এবং ভবিষ্যতেও করবে।

তারপর একদিন আমাদের জীবন বদলে গেল। ইনফোসিসের সাফল্য আমাদের অনেক ধনী করল। কিন্তু আমাদের সাধারণ জীবনযাপনের অভ্যেস বদলাল না। আমি তোমাদের গাড়ি করে স্কুলে পাঠাতে চাইতাম। তোমাদের মা এর বিপক্ষে ছিলেন। তিনি অন্যান্য বাচ্চাদের মতো রিকশাতেই তোমাদের যাতায়াতের ব্যবস্থা রাখলেন।

প্রথমে বুঝিনি কেন। পরে দেখলাম, এর ফলে তোমাদের বন্ধু তালিকা কত লম্বা হয়ে গেল। গাড়ি দিলে হয়তো তোমাদের ‘‌রিকশা আঙ্কল’‌ আর অন্যান্যদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করাই হত না। জীবনের সবথেকে সহজ জিনিসগুলিই আমাদের সবথেকে বেশি আনন্দ দেয়। আমাদের স্বাধীনতার স্বাদ চেনায়।
তোমার সব বন্ধুদের মতো আমাদের ঘরে টি ভি ছিল না। তাই নিয়েও তোমাদের অভিযোগ ছিল।

টি ভি যদিও আমি কিনতে পারতাম। কিন্তু তোমাদের মা বারণ করেন। ওই সময়টা টি ভি-‌তে নষ্ট না করে আমরা একসঙ্গে পড়াশোনা করতাম। প্রতিদিন রাত ৮টা থেকে ১০টা পর্যন্ত আমরা সত্যিই একসঙ্গে বসে পড়াশোনা করতাম। তোমরা হোমওয়ার্ক করতে। আমি আর তোমার মা ডুবে থাকতাম ইতিহাস, পদার্থবিদ্যা, অঙ্ক, ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের বইয়ে, কিংবা অফিসের কাজে। ঘরের এই গঠনমূলক পরিবেশ আমাদের প্রত্যেকেরই জীবনকে অন্য মাত্রা দিয়েছে।

মেয়ের যখন বিয়ে হয়, তখন সব বাবার মনেই ঝড়ঝাপটা চলে। মেয়ের জীবনে অন্য কোনও স্মার্ট, সুদর্শন পুরুষের উপস্থিতি বোধহয় কোনও বাবাই প্রথমে পছন্দ করে না। আমারও একটু হিংসা হয়েছিল, যেদিন তুমি প্রথম তোমরা জীবনসঙ্গী বেছে নেওয়ার কথা জানালে। কিন্তু ঋষির সঙ্গে দেখা করার পর বুঝলাম, ওঁর মতো অসাধারণ, সুন্দর এবং সৎ মানুষ যে তোমার হৃদয় চুরি করে নেবে, তা স্বাভাবিক। আনন্দ আর আশঙ্কায় ভরা সেই মিশ্র অনুভূতি আমি কখনও ভুলব না।

কয়েক মাস আগে তুমি আমার জীবনকে আরও পরিপূর্ণ করেছ। দাদু হওয়ার আলাদাই মজা। সান্টা মনিকায় তোমাদের মেয়ে কৃষ্ণাকে হাতে ধরে আমি এক মুহূর্তে অতীতে ফিরে গেলাম। মনে হল যেন সেই ছোট্ট তোমাকেই হাতে নিলাম। ভাবছি, আমার কি এখন থেকেই বৃদ্ধ জ্ঞানীর মতো আচরণ শুরু করে দেওয়া উচিৎ?‌ অবশ্য বুড়ো হওয়ার বোনাস পয়েন্টও আছে।

আমি আবার বাচ্চামি করার সুযোগ পাব। তাছাড়া তুমি তো জানোই, দাদু-‌নাতনিদের সবথেকে বড় শত্রু বাবা-‌মা। সুতরাং, তৈরি থেকো। তোমাকে দু’‌জন মিলে খুব জ্বালাতন করব।

তুমি তোমার জীবনে সুন্দরভাবে এগিয়ে যাচ্ছ। মনে রেখো, আমাদের বাঁচার জন্য এই একটিই পৃথিবী রয়েছে। আর এই পৃথিবী ক্রমশ বিপদের দূষণে ভরে যাচ্ছে। কৃষ্ণা এবং তার প্রজন্মকে এক সুন্দর পৃথিবী দেওয়া তোমার গুরুত্বপূর্ণ কর্তব্য।

ভাল থেকো
ভালোবাসাসহ, আপ্পা

সূত্র : আজকাল