মেইন ম্যেনু

শেষ মুহূর্তে ব্রিটিশ সরকারের আপত্তিতেই ভেস্তে গেল গোটা পরিকল্পনা!

সব আয়োজনই চূড়ান্ত ছিল। লন্ডন থেকে সপরিবারে ও সপর্ষদ তারেক রহমান সৌদিতে উমরাহ করতে যাবেন, আর ঢাকা থেকে এসে তার সঙ্গে যোগ দেবেন খালেদা জিয়া। ঠিক গত বছরের জুলাইয়ের মতোই আবার সৌদির মাটিতেই দেখা হবে মা ও ছেলের, সব প্রস্তুতি সাঙ্গ হয়ে গেলেও শেষ মুহূর্তে ব্রিটিশ সরকারের আপত্তিতেই ভেস্তে গেল গোটা পরিকল্পনা!

ব্রিটেনের হোম অফিস একেবারে শেষ মুহূর্তে তারেক রহমানকে সৌদি সফরের জন্য প্রয়োজনীয় ‘ট্র্যাভেল ডকুমেন্ট’ দিতে বেঁকে বসেছিল। তারেকের বাংলাদেশি পাসপোর্টের মেয়াদ বহু আগেই ফুরিয়ে গেছে এবং বাংলাদেশের বর্তমান সরকার যেহেতু একজন ‘ফেরারি আসামি’র পাসপোর্ট কিছুতেই নবায়ন করবে না, তাই বর্তমানে লন্ডনপ্রবাসী তারেক রহমানের কোনও তৃতীয় দেশে সফরের জন্য এই ‘ট্র্যাভেল ডকুমেন্ট’ই একমাত্র ভরসা।

তারেক মোটামুটি নিশ্চিত ছিলেন, উমরা করতে যাওয়ার জন্য যেহেতু তিনি এই ট্র্যাভেল ডকুমেন্ট চেয়েছেন তাই সেটা পেতে বিশেষ কোনও সমস্যা হবে না। কিন্তু তাকে অবাক করে হোম অফিস সেই আবেদন নাকচ করে দেয়। সেই সিদ্ধান্ত পাল্টানোর জন্য লন্ডনের বিএনপি নেতৃত্ব ও তারেক নিজে বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী ব্রিটিশ এমপিরও দ্বারস্থ হয়েছিলেন। ম্যাঞ্চেস্টার এলাকার একজন লেবার এমপি এবং লেবার পার্টি থেকে বিতাড়িত আর একজন বিতর্কিত মুসলিম লর্ডেরও সাহায্য চাওয়া হয়েছিল বলে বিশ্বস্ত সূত্রের খবর – কিন্তু শেষপর্যন্ত তারা কেউই কিছু করতে পারেননি।

অগত্যা সৌদি সফরের পরিকল্পনা বাতিল করা ছাড়া তারেক রহমানের আর কিছু করারও ছিল না – আর গত বুধবার (৮ জুলাই) সেটা প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই জানিয়ে দেওয়া হয় ঢাকায় খালেদা জিয়াকে। হতাশ খালেদাও স্থির করে ফেলেন, সৌদিতে গিয়ে তারেক ও তার পরিবারের সঙ্গে যখন দেখাই হবে না, তখন আপাতত সফর বাতিল করাই ভাল। কিন্তু আসল কারণটা প্রকাশ্যে বলা সম্ভব নয়, তাই জনাকয়েক বিএনপি নেতাকে দিয়ে বলানো হয়, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও অন্যান্য কারাবন্দী দলীয় নেতাদের পাশে দাঁড়াতেই ম্যাডাম এখন উমরায় যাচ্ছেন না!

ওদিকে তারেক-পরিবারের স্যুটকেস গোছানো তো সারা হয়ে গিয়েছিল। ৮ জুলাই বুধবার রাতে লন্ডনের হিথরো বিমানবন্দর থেকেই স্ত্রী আর মেয়েকে নিয়ে তিনি সৌদির উদ্দেশে রওনা হবেন, এমনটাই ঠিক ছিল। সঙ্গে যাওয়ার কথা ছিল লন্ডনে তারেকের বিশ্বস্ত অনুচর আর এখন যুক্তরাজ্য বিএনপির সভাপতি এম এ মালেকেরও।

নিজের যাত্রা বাতিল হওয়ার পর তারেক অবশ্য মালেককে পরামর্শ দেন, তিনি যেন সৌদি সফর বাতিল না করেন। নইলে সৌদিতে বিএনপির যে নেতাকর্মীরা অধীর আগ্রহে তারেক রহমানের জন্য অপেক্ষা করছেন, তারা ভীষণই হতাশ হবেন। মালেক সেখানে গিয়ে তারেকের বার্তা অন্তত পৌঁছে দিতে পারবেন, এই ভাবনা থেকেই এম এ মালেক বুধবার সন্ধ্যাতেই সৌদিয়ার ফ্লাইটে জেদ্দার উদ্দেশে রওনা দিয়ে দেন। পরদিন সকালে জেদ্দা বিমানবন্দরে স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীরা তাকে স্বাগতও জানান, কিন্তু যার জন্য তারা গত কয়েকদিন ধরে অপেক্ষা করছিলেন, দেখা মেলেনি সেই তারেকেরই!

কিন্তু তারেককে ট্র্যাভেল ডকুমেন্ট দিতে ব্রিটিশ সরকার কেন আপত্তি করল?

ব্রিটিশ হোম অফিস সূত্রে জানা যাচ্ছে, লন্ডনে ক্যামেরন সরকার তারেক রহমানের ব্যাপারে তাদের অবস্থান পুনর্বিবেচনা করছে। মে মাসে কনজার্ভেটিভ সরকার নিজেরাই একক গরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় ফিরে আসার পরই তারেককে নিয়ে নতুন করে চিন্তাভাবনা শুরু হয়েছে, যদিও এখনও কোনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়নি। আর এর প্রধান কারণ হল তারেককে প্রত্যর্পণ করার জন্য ব্রিটিশ সরকারের ওপর বাংলাদেশ চাপ বাড়াচ্ছে, তার বিরুদ্ধে জারি হয়েছে ইন্টারপোল নোটিশও। ফলে তারেককে অবাধে তার কর্মকাণ্ড চালাতে দিয়ে বা আশকারা দিয়ে ব্রিটিশ সরকার শুধু শুধু কতদিন ঢাকার বিরাগভাজন হবে, এটাও কিন্তু তাদের ভাবাচ্ছে।

ইতোমধ্যে ব্রিটিশ সরকারের পক্ষ থেকে তারেককে মোটামুটি স্পষ্টই জানিয়ে দেওয়া হয়েছে তিনি যেন ‘লো-প্রোফাইল’ বজায় রেখে চলেন এবং প্রকাশ্য রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে নিজেকে দূরে রাখেন, নইলে তার ব্রিটেনে বসবাস নিয়েই সমস্যা হতে পারে। এর পর থেকেই লন্ডনে বিএনপির সভা-সমাবেশে তারেকের আবির্ভাব এবং চমকপ্রদ সব বক্তৃতা কিংবা ইতিহাসের পাঠ, সবই লক্ষণীয়ভাবে কমে গেছে।

এখন সৌদিতে তারেক শুধু উমরাহ করতেই যাচ্ছেন না তার পেছনে রাজনীতির হিসেবনিকেশও আছে, ব্রিটেনের হোম অফিস তা নিয়ে কিন্তু নিশ্চিত হতে পারেনি। গত বছরের সৌদি সফরে তার যে কর্মকাণ্ড, সেটা দেখলে বোঝা যায় এই সংশয়ের পেছনে সঙ্গত কারণও আছে। আর সে কারণেই শেষপর্যন্ত বাতিল করে দেওয়া হয়েছে তার ‘ট্র্যাভেল ডকুমেন্টে’র আবেদন, সৌদি আরবে যাওয়ার সব প্রস্তুতি নিয়েও যে কারণে পিছিয়ে আসতে বাধ্য হয়েছেন তারেক রহমান।

পরোক্ষে ব্রিটিশ সরকারের সেই সিদ্ধান্তে কোপ পড়েছে খালেদা জিয়ার ওপরেও, মক্কায় উমরাহ করার বদলে আপাতত তাকে ব্যস্ত থাকতে হচ্ছে ঢাকায় আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে তোপ দাগাতেই! বাংলা ট্রিবিউন