মেইন ম্যেনু

সক্রিয় অর্ধশত ‘লাগেজ পার্টি’ : দিনে খোয়া যায় ৩০০ লাগেজ

সাইদুল আলম ইতালি থেকে বাংলাদেশে আসেন গত ৪ মার্চ, সঙ্গে ছিল তিনটি লাগেজ। বিমানবন্দরে নামার পর দুটি লাগেজ পেলেও অন্যটি পাননি। এক সপ্তাহ পর ফের শাহজালাল বিমানবন্দরে এলে কর্তৃপক্ষ এক মাস পর খোঁজ নিতে বলে। নির্দিষ্ট সময় পর গেলে তিনি লাগেজটি বুঝে পান। কিন্তু সেটি হাতে নিয়েই বোকা বনে যান। কারণ, ইতিমধ্যে লাগেজটি কেটে ফেলা হয়েছে। ভেতরের মূল্যবান মালামালও খোয়া গেছে। পরে সেই কাটা লাগেজ নিয়েই গ্রামের বাড়ি কুমিল্লায় চলে যান তিনি।

সিঙ্গাপুরপ্রবাসী আবিদুর রহিম সিঙ্গাপুর এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইটে ঢাকায় আসেন গত বছরের নভেম্বরে। তাঁর সঙ্গে ছিল আটটি লাগেজ। চারটি লাগেজ তৎক্ষণাৎ পেয়ে গেলেও অন্যগুলো পাচ্ছিলেন না। যোগাযোগ করেন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে। কর্তৃপক্ষ জানায়, বিমানবন্দরেই আছে আপনার লাগেজগুলো। সাত দিন পর জানানো হবে। পরে ফোন পেয়ে আবিদুর রহিম আবার আসেন বিমানবন্দরে। কিন্তু লাগেজ আর ফেরত পাননি। লাগেজ কোথায় আছে তাও জানাতে পারেনি কর্তৃপক্ষ। প্রায় বছর গড়ালেও লাগেজ খোয়া যাওয়ার সেই রহস্য আজও উদ্ঘাটিত হয়নি।

সাইদুল ও রহিমের মতোই শত শত যাত্রী প্রতিনিয়ত বিমানবন্দরে এ রকম হয়রানির শিকার হচ্ছেন। সাধারণ যাত্রীদের পাশাপাশি ভিআইপিরা পর্যন্ত হয়রানির শিকার হয়েছেন। অথচ শাহজালাল বিমানবন্দরে বিদেশ ফেরত যাত্রীদের হাজার হাজার লাগেজ আটকা পড়ে আছে। আর যাত্রীরা তাঁদের লাগেজ খুঁজে খুঁজে হয়রান হচ্ছেন। দিনের পর দিন ধরনা দিয়েও হারানো লাগেজের দেখা মিলছে না।

জানা গেছে, শাহজালালে অন্তত অর্ধশত লাগেজ পার্টি গ্রুপ সক্রিয়। বিমানবন্দরে কর্মরত পুলিশ, কাস্টম ও সিভিল এভিয়েশনের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী গ্রুপগুলোকে সহযোগিতা করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। বিমানবন্দরে দায়িত্বপ্রাপ্ত কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীর ছত্রচ্ছায়ায় লস্ট অ্যান্ড ফাউন্ড শাখার মাধ্যমে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট লাগেজ চুরির সঙ্গে জড়িত। প্রতিদিন গড়ে ৩০০ লাগেজ হারানোর অভিযোগ আসছে। হাতে গোনা কিছু লাগেজ পাওয়া গেলেও অধিকাংশই পাওয়া যায় না।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, শাহজালাল বিমানবন্দরের গোডাউন ছাড়িয়ে বহির্গমনের সর্বত্র লাগেজের স্তূপ। ইমিগ্রেশন থেকে শুরু করে লাগেজ প্রাপ্তিতে যাত্রীরা চরম হয়রানির শিকার হচ্ছেন। লাগেজ পেতে তাঁদের অপেক্ষায় থাকতে হচ্ছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা। আর যাঁরা পাচ্ছেন না, তাঁদের লাগেজ কোথায় আছে তার সঠিক তথ্য কেউ দিতে পারছে না। বিমানবন্দরের লস্ট অ্যান্ড ফাউন্ড শাখার কর্মকর্তা-কর্মচারীরা জানান, প্রতিদিন শত শত যাত্রী লাগেজ হারানোর অভিযোগ করছেন। লাগেজ হারানোর তুলনায় পাওয়ার সংখ্যা অনেক কম। অবশ্য প্রতিদিনই লাগেজ প্রাপ্তির পরিমাণ বাড়ছে। কর্তৃপক্ষ দাবি করছে, কম জনবল ও আধুনিক যন্ত্রপাতির অভাবে যাত্রীদের লাগেজ পেতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে।

জানা যায়, বছর দুয়েক আগে স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের লাগেজও একবার পড়েছিল চক্রের কবলে। অনেক দিন পর সেই লাগেজ উদ্ধার হলেও তাতে কিছুই ছিল না। তৎকালীন স্থানীয় সরকারমন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলামও হয়রানির শিকার হয়েছেন। তাঁর লাগেজ হারানোর পর থানায় জিডি পর্যন্ত হয়েছিল। ওই ঘটনায় তখন ব্যাপক তোলপাড় হয়। সাবেক বিমানমন্ত্রী জি এম কাদেরের লাগেজও হারিয়ে গিয়েছিল। এ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী কড়া হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন। কিন্তু এর পরও হয়রানির অবসান হয়নি। যদিও বিমান পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান এয়ার মার্শাল (অব.) জামাল উদ্দিন বিমানবন্দরের লাগেজ জট নির্মূল, মালামাল চুরি বন্ধ ও লস্ট অ্যান্ড ফাউন্ড সেকশনকে আধুনিকায়নের উদ্যোগ নেন, কিন্তু তাতেও কাজ হয়নি।

শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মুহাম্মদ ইউছুফ বলেন, লাগেজ হয়রানি শাহজালালে চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। লাগেজ পার্টি চক্রের সদস্যদের ধরার চেষ্টা চলছে। এপিবিএনের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘লাগেজ পার্টির সদস্যরা বেপরোয়া। তাদের তালিকা আছে আমাদের কাছে। ধরারও চেষ্টা চলছে। চক্রের সঙ্গে বিমানবন্দরে কর্মরত সদস্যদের আঁতাত আছে।’

সূত্র জানায়, দীর্ঘদিন ধরেই শাহজালাল বিমানবন্দরে নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চলছে। কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নেওয়ার পরও পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হচ্ছে না। বিশেষ করে লাগেজ পার্টির দৌরাত্ম্য বেড়েই চলেছে। প্রায় এক দশক ধরে লাগেজ পার্টির মূল হোতা জয়নাল আবেদীন ও তার গ্রুপের সদস্যরা অপরাধ কর্মকাণ্ড চালিয়ে আসছে। তার গ্রুপে নারীসহ ১৫ সদস্য রয়েছে। এ ছাড়া অপু, চট্টগ্রামের জসিম, নাসিমা, স্বপ্না, ঝিনুক, রাজিব, হানিফ, ইদ্রিস, সাদ্দাম, নুরুল ইসলাম, আলী, হাকিম, নাসির, আরিফ, কামাল, নুরুল, ইউসুফ, সোহেল, নাহিদা, চোরা নাছির, ল্যাংড়া মাসুদ, আজিজ, হাবিব, মোস্তফা, আরজু, সেলিম, ইদ্রিস, বাকির, সজল, সিলেটের মুজিব, মুন্না, হুমায়ুন, দুলালের নেতৃত্বে বিভিন্ন গ্রুপ সক্রিয় বলে গোয়েন্দারা নিশ্চিত হয়েছে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোই এসব গ্রুপের সদস্যদের নিয়ন্ত্রণ করছে। কাস্টম ও সিভিল এভিয়েশনের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীও তাদের সহযোগিতা করছেন। বিনিময়ে তাঁরা পাচ্ছেন মোটা অঙ্কের টাকা।

গত ১৬ ডিসেম্বর পাঁচ হাজার টাকার বিনিময়ে আবু বক্কর পাটোয়ারী নামের এক ব্যবসায়ীর কাছে গোডাউনে থাকা তিন বোতল বিদেশি মদ ও পাঁচ কার্টন সিগারেট বিক্রি করে দেয় কাস্টমের সিপাহি রাজিব। পরে এপিবিএন আবু বক্করকে ধরলে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বেরিয়ে আসে। ইতিমধ্যে রাজিবকে বরখাস্ত করা হয়েছে।

লাগেজ পেতে নানা হয়রানি : ৭ জানুয়ারি দুবাই থেকে দেশে আসেন জুলহাস মিয়া। একটি লাগেজ না পেয়ে তিনি ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে অভিযোগ করেন। দুই দিন পর সেই লাগেজ ফেরত পান। ৫ ফেব্রুয়ারি সৌদি আরব থেকে দেশে আসেন খোকন মিয়া। দুটি লাগেজ পেলেও সঙ্গের একটি ট্রাভেল ব্যাগ আজও খুঁজে পাননি। এ প্রসঙ্গে শাহজালাল বিমানবন্দরের সহকারী পরিচালক নুরুল ইসলাম বলেন, যাত্রীদের নিরাপত্তার জন্য যা যা করা দরকার তা-ই করা হচ্ছে। বিশেষ করে বিদেশ থেকে আসা যাত্রীদের লাগেজ পেতে যাতে কোনো ধরনের সমস্যা না হয় সেদিকে বিশেষ নজর দেওয়া হচ্ছে। লাগেজ না পাওয়ার পর কোনো যাত্রী অভিযোগ করলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়। বিমানবন্দরে লাগেজ কাটা গ্রুপের দৌরাত্ম্যও অনেক কমে গেছে। এর পরও তাদের ধরতে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া আছে। ভ্রাম্যমাণ আদালত নজরদারি করছেন। প্রতিটি পয়েন্টে সিসি ক্যামেরা আছে। এপিবিএনের সিনিয়র অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আলমগীর হোসেন বলেন, ‘লাগেজ কাটা চক্রগুলোকে ধরতে নানা কৌশল নেওয়া হয়েছে। অভিযোগ পেলে কঠোর অ্যাকশনে চলে যাই আমরা। ইতিমধ্যে চক্রগুলোকে শনাক্ত করা হয়েছে।’ কালের কণ্ঠ