মেইন ম্যেনু

সন্ধ্যার পর ফার্মগেট ওভারব্রিজে দাঁড়ানো মেয়ের গল্প

তামান্না সেতু : অফিস থেকে আধ ঘন্টা আগে বের হয়ে এসে দাঁড়িয়ে আছি ফার্মগেট ওভার ব্রিজের ওপর। মেয়েদের দাঁড়াবার জন্য জায়গাটাকে জায়গা না বলে অজায়গা বলা বেশি ভাল। তার ওপর সময়টা এখন সন্ধ্যা পেরিয়েছে।

যে মেয়েটির দিকে আমি এখন তাকিয়ে, সে দাঁড়িয়ে আছে আমার থেকে বড়জোর দেড় হাত দূরে। তিন বছর আগে হলে এখন এখানে দাঁড়িয়ে ঝালমুড়ি খেতাম মন দিয়ে। লেখালেখি শুরু করার পর থেকে জেনেছি, জানা অজানা সমস্ত মানুষ খেয়াল করে দেখতে হয়। না হলে লেখক হওয়া যায় না। মানুষ দেখার জন্য অবশ্য এখানে আমি নই আজ।

তিনটার দিকে কমল ফোন দিয়েছিল। ওর মেজো ভাবির সিজার করে বাচ্চা হবে স্কয়ারে। সময় দিয়েছে রাত আটটা। ভাবির রক্তের গ্রুপ ও নেগেটিভ। অন্তত দুজন ডোনার রেডি রাখতে বলেছে। দুজন ডোনারের একজন হয়ে আমি অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছি কমলের। হাত ঘড়িতে ছ’টা এগারো। শীতের সময় বলেই এ সময়টাকেই রাত মনে হচ্ছে। সরাসরি স্কয়ারেই যেতে চাইলাম আমি। কোমল বললো, ও ফার্মগেটেই আসছে একটা কাজে, তাই এখানে অপেক্ষা।

রোগা পাতলা সাস্থ্য মেয়েটির। পোশাক জড়িদার। গালে কড়া মেকাপ, নানান নামের গয়না গায়ে। সামনে দিয়ে যাওয়া সকল তরুনের দিকে উশখুস করে তাকাচ্ছে। চোখের ভাষা ‘এই তো আমি!’ হাতে সস্তার মোবাইল। যতবার সেটা বেজে উঠছে ততবারই এক কথা বলছে অপেক্ষমানের উদ্দেশে – ‘তারাতারি আসুন না ভাই। বেশি রাত করলে আবার বাড়ি থেকে সন্দেহ করবে। আমি এখনো খুব বেশি অভ্যস্ত না বলে আবার একটু অসুস্থ্য হয়েও পরি। বাড়িতে টের পেলে আমাকে মেরেই ফেলবে’!

আমি একটু সরে দাঁড়ালাম মেয়েটার থেকে। বিরক্ত লাগছে কোমলের ওপর। মানুষের উপকার করতে যাওয়াই ভুল। কি সব মেয়েদের পাশে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে! ছিঃ! নিম্ন মধ্যবিত্ত ঘরের মেয়ে বোঝাই যাচ্ছে। বাড়িতে না জানিয়ে নতুন এ পেশায়। কি অসভ্যের মত আবার বলছে, ‘আমি আবার অসুস্থ হয়ে পরি’। ছিঃ!

কোমল এগিয়ে আসছে। বাঁচলাম বাবা।

আমাকে হাই বলেই আমার হাত ধরে টান মেরে এগিয়ে গেলো ওই মেয়েটির দিকেই। এক মিনিট লাগলো ওর আমাদের দুজনের পরিচয় করিয়ে দিতে -“নীলু, ওর নাম পূজা। ফেবুতে পরিচয়, আজই আমরা সাথে প্রথম দেখা বুঝলি। ভাবির জন্য রক্ত চেয়ে স্টাটাস দিয়েছি দেখে নক করছে আমাকে। ওর যা সাস্থ্য, তাই বাড়ি থেকে রক্ত দেয়ার অনুমতি দেয় না। অথচ মেয়ে তিনমাস পরপর রক্ত দিয়ে বেড়ায়। আজ বাড়িতে বলেছে বান্ধবীর বিয়েতে এসেছে।”

আমি মেয়েটির দিক থেকে বারবার চোখ সরিয়ে নিচ্ছিলাম। মেয়েটি পূর্ণ চোখে আমার দিকে তাকিয়ে নিচু গলায় বল্ল- ‘তবুও দেখবেন আমাকে দেখে মা ঠিক বুঝে ফেলবে রক্ত দিয়ে এসেছি। রাগ করবে খুব। মা মুখ দেখেই সব বুঝে ফেলে।’

একটু থেমে বললাম – ‘মা বুঝলেই চলবে। বাকিদের বোঝায় থুঃ মেরে এগিয়ে যেও ‘!