মেইন ম্যেনু

‘সময়টা ছিল অন্ধকার, চিৎকার করছিল সবাই’

তুরস্কের বোদরাম উপকূলে ভেসে আসা আইলানের মৃতদেহের ছবিটি এখন আর কেবল অভিবাসী মৃত্যুর সাধারণ খবরের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এই একটি ছবিই যেন কাঁপিয়ে দিয়েছে গোটা বিশ্ব মানবতার ভিতকে। বৃহস্পতিবার ছবিটি প্রকাশের পর টুইটার ও ফেইসবুকে #KiyiyaVuranInsanlik হ্যাশট্যাগ ব্যবহার করে প্রতিবাদে মুখর ছিলেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারকারীরা। #KiyiyaVuranInsanlik কথাটির বাংলা হচ্ছে- ‘মানবতা ভেসে গেল সাগরতীরে’।

মঙ্গলবার রাতে দুটি নৌকায় করে ২৩ জন অভিবাসন প্রত্যাশী তুরস্ক থেকে গ্রিসের কোস দ্বীপের উদ্দেশে রওনা হয়েছিলেন। নৌকা দুটি ডুবে গেলে পাঁচ শিশুসহ ১২ জনের মৃত্যু হয়। এই দুই নৌকার একটিতে ছিল শিশু আইলান, তার বড় ভাই গালিপ, মা ও বাবা। চারজনের মধ্যে কেবল বাঁচতে পেরেছে আইলানের বাবা আব্দুল্লাহ কুর্দি। আব্দুল্লাহ পুরো পরিবারকে নিয়ে গ্রিস হয়ে কানাডা পাড়ি জমাতে চেয়েছিলেন। সব হারানো বিধ্বস্ত এই পিতা এখন আর কানাডা নয়; জন্মভূমি সিরিয়ার কোবানিতে চলে যেতে চাইছেন। সেখানেই থাকতে চান তিনি।

বৃহস্পতিবার সাংবাদিকদের কাছে পুরো পরিবার হারানোর মর্মান্তিক ঘটনা তুলে ধরেন আব্দুল্লাহ। তিনি জানান, নৌকাটি যখন ডুবে যাচ্ছিল সেই মুহূর্তে স্ত্রী-সন্তানদের হাত ধরে রাখার চেষ্টা করছিলেন তিনি। কিন্তু বেশিক্ষণ ধরে রাখতে পারেননি তাদের। অন্ধকারে তীব্র স্রোতে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় সবাই।

চরমপন্থী সংগঠন ইসলামিক স্টেট গত বছর সিরিয়ার কোবানি শহরের দখল নেয়। এরপরই সহিংসতা থেকে বাঁচতে পরিবারসহ তুরস্কে পালিয়ে আসেন আব্দুল্লাহ। তার উদ্দেশ্য ছিল পুরো পরিবারকে নিয়ে গ্রিস হয়ে কানাডায় গিয়ে সেখানে আশ্রয় প্রার্থণা করা। গ্রিসের কোস দ্বীপে যাওয়ার জন্য দুই দফায় মানবপাচারকারীদের অর্থ দিয়েছিলেন তিনি। প্রথমবার কোস্টগার্ড তাদের ধরে ফেলে। পরে তাদের ছেড়ে দেয়া হয়। দ্বিতীয় দফায় টাকা নেয়ার পরও কথা রাখেনি মানবপাচারকারীরা। শেষ পর্যন্ত কয়েকজন সিরিয় নিজেরাই নৌকা জোগাড় করে এজিয়ান সাগর পাড়ি দিয়ে গ্রিস যাওয়ার পরিকল্পনা করেন। মঙ্গলবার রাতে একটি রাবারের নৌকায় করে ১২ জন রওনা দেন। মাত্র পাঁচশ মিটার যাওয়ার পরই নৌকাটি ডুবতে শুরু করে।

ওই মুহূর্তটির বর্ণনা দিতে গিয়ে আব্দুল্লাহ বলেন, ‘আমি আমার স্ত্রীর হাত ধরে রেখেছিলাম। কিন্তু আমার সন্তানরা আমার হাত থেকে ছুটে গিয়েছিল। আমরা ছোট্ট নৌকাটিকে আঁকড়ে ধরার চেষ্টা করছিলাম। কিন্তু এটা চুপসে যাচ্ছিল। সময়টা ছিল অন্ধকার এবং সবাই চিৎকার করছিল।’

এরই মধ্যে পানির তোড়ে ভেসে পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছেন আব্দুল্লাহ। নিজে কোনরকম সাতরে তীরে যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন তিনি।

আব্দুল্লাহ বলেন, ‘আমি আলোর সাহায্যে তীরের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করছিলাম। কিন্তু যখন আমি সেখানে পৌঁছলাম আমি আমার স্ত্রী ও সন্তানদের পাইনি। ভাবলাম ওরা হয়তো ভয় পেয়ে পালিয়ে গেছে। যে শহরে (বোদরাম) আমরা সাধারণত দেখা-সাক্ষাৎ করি সেখানে ওদের না পেয়ে হাসপাতালে গেলাম। আর সেখানেই আমি দুঃসংবাদটি পেলাম।’

পরিবারহারা আব্দুল্লাহকে বৃহস্পতিবার কানাডার কর্মকর্তারা নাগরিকত্ব দেয়ার প্রস্তাব দিয়েছেন। তবে সেই প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছেন তিনি। আব্দুল্লাহ জানিয়েছেন, জীবনের বাকী সময়টুকু তিনি জন্মভূমি কোবানিতেই কাটাতে চান। আর মৃত্যুর পর তার কবরটি যেন স্ত্রী-সন্তানদের পাশেই হয়।