মেইন ম্যেনু

সরকারের উদাসীনতায় বেড়েছে পেঁয়াজের দাম

পর্যাপ্ত মজুদ ও ব্যবসায়ীদের প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও গত কয়েকদিনে অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে পেঁয়াজের দাম। এমনকি রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বাজারভেদে পেঁয়াজের দাম কম-বেশি প্রতিদিনই বাড়ছে।

এর কারণ অনুসন্ধানে জানা গেছে, মূলত কার্যকর বাজার মনিটরিং ব্যবস্থা না থাকায় অসাধু ব্যবসায়ীরা এ সুযোগ নিচ্ছে। এক্ষেত্রে সরকারের উদাসীনতাকেই দায়ী করছেন ভুক্তভোগীরা। সরকার কঠোর হলে মজুদ থাকার পরও আমদানি ব্যয় বৃদ্ধির খোড়া অজুহাতে পেঁয়াজের দাম বাড়ানো যেতো না বলে অভিমত সংশ্লিষ্টদের।

খুচরা বিক্রেতারা বলছেন, ভারত থেকে আমদানি করা পেঁয়াজের দর বাড়ায় রাজধানীতে এর প্রভাব পড়ছে। দেশের বর্ডার হাটগুলোতে পেঁয়াজের দাম বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই রাজধানীসহ সারা দেশে বেড়ে যায় দাম। তাদের অভিযোগ, সরকারের বাজার মনিটরিং ব্যবস্থা কার্যকর না থাকার সুযোগে আমদানিকারকরা কম দামে মজুদ করে রাখা পণ্যও বেশি দামে কেনার দাবি করে। যা বাজারে বিক্রি করা হয় চড়া দামে। এ কারণে কয়েক দিনের ব্যবধানে কেজি প্রতি ৩০ থেকে ৪০ টাকা বেড়েছে পেঁয়াজের দাম।

তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকার একটু উদ্যোগী হলেই পেঁয়াজের এই কারণহীন মূল্যবৃদ্ধি রোধ করা সম্ভব। এ অবস্থায় বাজার স্থিতিশীল রাখতে পেঁয়াজ আমদানির ক্ষেত্রে বিকল্প দেশের সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি সরকারের জোরালো মনিটরিং ব্যবস্থা চালু করার তাগিদ দিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। কারণ দেশে পেঁয়াজের পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে। নতুন করে পেঁয়াজ আমদানি করা হলেও এর প্রভাব এতো তাড়াতাড়ি বাজারে পড়ার কথা নয়।

এ ছাড়া ভারতের পাইকারি বাজারে এরই মধ্যে একদিনের ব্যবধানে কেজিতে ৩ থেকে ৫ রুপী কমেছে পেঁয়াজের দাম। দেশটিতে পেঁয়াজের মূল্য কমানোর লক্ষ্যে রপ্তানিমূল্য বাড়ানো হয় কিছুদিন আগে। এরপর সোমবার দেশটির খাদ্য ও ভোক্তাবিষয়ক মন্ত্রী মূল্য ও সরবরাহ পরিস্থিতি পর্যালোচনাবিষয়ক বৈঠক শেষে ভারতের সব রাজ্য সরকারকে পেঁয়াজের মজুতদারদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে বলেন। এতে দেশটিতে মাত্র একদিনের ব্যবধানে দাম কমেছে।

কিন্তু বাংলাদেশে এ ধরনের উদ্যোগে ব্যর্থ হয়েছে সরকার। গত বৃহস্পতিবার বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠকে পেঁয়াজের সরবরাহ ও মূল্য পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার প্রতিশ্রুতি দেন আমদানিকারকরা। কিন্তু তারপরও বেড়েছে পেঁয়াজের দাম। এরপর অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করার ঘোষণা দেয় মন্ত্রণালয়ে। এরপরও পেঁয়াজের মূল্যবৃদ্ধি রোধ করা যাচ্ছে না। এই অবস্থায় সরকারের আন্তরিকতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন খুচরা ব্যবসায়ী এবং ভোক্তারা।

এদিকে শুধুমাত্র আমদানি মূল্যবৃদ্ধির কারণে পেঁয়াজের দাম বেড়েছে কী না, এই বিষয়ের খোঁজ নিতে অনুসন্ধানে দেখা যায়, দেশে প্রতি বছর পেঁয়াজের চাহিদা, উৎপাদন ও আমদানি নিয়ে সরকারের বিভিন্ন সংস্থা থেকে যে তথ্য পাওয়া যায় সেগুলোর একটির সঙ্গে অন্যটির মিল নেই।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দ্রব্যমূল্য পূর্বাভাস সেলের তথ্য মতে, দেশে প্রতি বছর পেঁয়াজের চাহিদা ২২ লাখ মেট্রিক টন। এ বছর দেশে উৎপাদন হয়েছে ১৯ লাখ ৩০ হাজার টন। সেই হিসাবে পেঁয়াজের ঘাটতি থাকার কথা দুই লাখ ৭০ হাজার টন। অথচ জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) হিসাবে চলতি বছরের প্রথম সাত মাসেই আমদানি হয়েছে ৪ লাখ ৯২ হাজার টন পেঁয়াজ। খালাসের অপেক্ষায় আছে আরো এক লাখ টনের মতো।

এই হিসেবে দেশে পেঁয়াজের মজুদ প্রয়োজনের বেশি আছে। এই অবস্থায় পেঁয়াজ আমদানির কোনো প্রয়োজনই থাকার কথা নয়।

এ ছাড়া বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দাবি, আগামী বছরের এপ্রিল পর্যন্ত দেশে যে পরিমাণ পেঁয়াজের চাহিদা আছে তার সবটুকুই মজুদ আছে।

অথচ বাস্তবতা হলো, আমদানি মূল্যবৃদ্ধির অজুহাতে বাজারে পেঁয়াজের দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। এই অবস্থায় মন্ত্রণালয় আমদানিকারকদের সঙ্গে সভা করেছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কারণহীণ মূল্যবৃদ্ধির বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান পরিচালনা করলে অবশ্যই অসাধু ব্যবসায়ীদের এই অপকৌশল রোধ করা সম্ভব।

সরেজমিনে দেখা গেছে, ঢাকার খুচরা বাজারে প্রতি কেজি দেশি পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৯০ থেকে ১০০ টাকায়। আমদানি করা পেঁয়াজ ৮৫ থেকে ৯৫ টাকায় বিক্রি হতে দেখা যায়।

অথচ একই মানের দেশি পেঁয়াজ এক মাস আগে বিক্রি হয়েছিল ৫০ থেকে ৫৫ টাকায় এবং আমদানি করা পেঁয়াজ ৪৫ থেকে ৫০ টাকা। পাইকারি বাজারে এ দাম কেজিপ্রতি ১০ থেকে ২০ টাকা কম।

বুধবার রাজধানীর কারওয়ান বাজারে পেঁয়াজের আড়তে এক পাল্লা (৫ কেজি) পেঁয়াজ ৪২৫ টাকায় বিক্রি হয়েছে। বাজারের আড়তদার ও আমদানিকারক মনির হোসেন বলেন, কারওয়ান বাজারে দেশি পেঁয়াজ ৮৪ থেকে ৮৮ টাকায়, ইন্ডিয়ান পেঁয়াজ ৯০ থেকে ৯৬ টাকা এবং পাকিস্তানি পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৮০ থেকে ৮৬ টাকায়।

বাজারে আসা রিজওয়ান আহমেদ নামে একজন ক্রেতা বলেন, এক সপ্তাহ আগে একপাল্লা পেঁয়াজ কিনেছিলেন মাত্র ২৫৫ টাকায়। এরকম লাফিয়ে লাফিয়ে দাম বাড়তে থাকলে পেঁয়াজ কেনাই অসম্ভব হবে বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি।

যদিও বর্তমানে বাজারে যেসব বিদেশি পেঁয়াজ পাওয়া যাচ্ছে সেগুলো আরো অন্তত এক মাস আগে আমদানি করা। তখন আমদানিমূল্য ছিল ৩৫ থেকে ৩৮ টাকা। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দ্রব্যমূল্য পূর্বাভাস সেলের অনুমান, ব্যবসায়ীদের শক্তিশালী সিন্ডিকেট পেঁয়াজের অস্বাভাবিক মূল্য বাড়িয়ে শত শত কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে।

এ ব্যাপারে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব হেদায়েতুল্লা আল মামুন বলেন, ভারতের বিকল্প দেশ থেকে পেঁয়াজ আমাদানির সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এবার চীন ও মিসর থেকে পেঁয়াজ আমদানি করা হচ্ছে। যা আগামী কয়েকদিনের মধ্যে দেশে আসবে। এতে করে আগামী ১৫ দিনের মধ্যে বাজার স্বাভাবিক হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।রাইজিংবিডি