মেইন ম্যেনু

সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠে কেন এ রহস্য?

আবু বকর ইয়ামিন: একদিকে ভৌতিক কাহিনী অন্যদিকে বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা! দুই দিক থেকে দুই ধরনের বিশ্লেষণ রয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালযের শহীদুল্লাহ হলের পুকুর নিয়ে।

গত ছয় মাসের মধ্যে এ পুকুরে সাঁতার কাটতে গিয়ে মারা গেছে দু’জন। ২০০০ সালের পর থেকে মারা গেছে ছয়জন। এর মধ্যে তিন বছরেই মারা গেছে চারজন।

শহীদুল্লাহ হলের কর্মচারীদের কাছ থেকে জানা যায়, গত ৩০ বছরে এ পুকুরে ডুবে মারা গেছে প্রায় ১৫জন। এদিকে বিশ্ববিদ্যালয় হল থেকে মৃতদের ব্যাপারে তেমন কোনো নথিপত্র পাওয়া যায়নি। অধিকাংশই মারা গেছেন সাঁতার কাটতে গিয়ে।

হলের প্রবীন এক কর্মচারী জানান, এটা অনেক পুরাতন পুকুর। পুকুর নিয়ে অনেক আগে থেকেই ভৌতিক কাহিনী রয়েছে। এখানে সাঁতার কাটতে গিয়ে পুকুরের মাঝখান থেকে নীচের দিকে তলিয়ে গেছে একাধিক শিক্ষার্থী। পরে তাদের মৃতদেহ ভেসে ওঠে। এসব কারণে ‘পুকুরে গোসল ও সাঁতার কাটা নিষেধ’ লেখা সম্বলিত একটি সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দেওয়া হয়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই কর্মচারী জানান, সাইনবোর্ড ঝুলানোর পর ওই রাতে সেই কর্মচারী স্বপ্ন দেখেন তাকে এক লম্বা চুলওয়ালা ডাইনি বলছে- ‘তুই আমার আহার কেড়ে নিয়েছিস, তোর খবর আছে’। এরপর ওই কর্মচারী চাকরি ছেড়ে চলে যান বলে জানান তিনি।

এদিকে এই পুকুরের বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের মৃত্তিকা, পানি ও পরিবেশ বিভাগের একাধিক শিক্ষকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এই পুকুরের পানিতে পানির যে মান থাকা দরকার তা নেই। এ কারণে পানিতে ‘ঐ২’ রাসায়নিক কম আছে। আর ‘ই২’ নামের রায়সানিক বেশি। ফলে এই পানিতে ডুব দিলে রক্তচাপজনিত সমস্যা সৃষ্টি হয়। তখন যাদের বেশি সমস্যা হয় তারা মারা যায়।

বিভাগের অধ্যাপক ড. এস এম ইমাদুল হক বলেন, পুকুরের গভীরতা অনেক বেশি। যার কারণে শিক্ষার্থীরা সাঁতার কাটতে গিয়ে সহজেই হাঁপিয়ে যায়। পরে ‘হার্ট অ্যাটাক’ করে বলে জানান তিনি।

হলের আবাসিক শিক্ষার্থী আবু রায়হান বলেন, এই পুকুরের নিচে উদ্ভিদের পরিমাণ বেশি হওয়ায় পানিতে অক্সিজেন স্বল্পতা রয়েছে বলে শুনেছি। হয়তো সে কারণেই সাঁতার কাটতে গিয়ে অনেকে মারা যায়।

গতকাল রোববার পুকুর থেকে এক অজ্ঞাত যুবকের মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ।

ছয়মাস আগে গোসল করতে নেমে মারা যান ফজলুল হক হলের আবাসিক শিক্ষার্থী মাহফুজ হায়দার রাহী। দুপুর তিনটার দিকে রাহী ও তার বন্ধু পুকুরে গোসল করতে যান। এ সময় তারা সিঁড়িতে নামেন। এক পর্যায়ে উভয়েই পিছলে পানিতে পড়ে যান। সে সময় অন্যদের সহায়তায় মাহফুজের বন্ধু তীরে উঠতে সক্ষম হলেও তাকে পাওয়া যাচ্ছিল না। প্রায় আধঘণ্টা ধরে খোঁজ করেও তাকে না পেয়ে ফায়ার সার্ভিস এসে তার মরদেহ উদ্ধার করে।

পুকুর সংগলগ্ন ফজলুল হক মুসলিম হলের প্রবীণ অফিস কর্মকর্তা মো. নজিবুল গণি ভূঁইয়া বলেন, এই হলে আমি ৩২ ধরে কর্মরত। এই পুকুরে এর আগেও মানুষ মারা গেছে। তার চাকরি জীবনে আরো পাঁচ জনকে তিনি এই পুকুরের পানিতে ডুবে মরতে দেখেছেন। তার নিজের চোখে দেখা এসব ঘটনার সবই ২০০০ সালের পর থেকে। ২০০৯ সালে এই পুকুরে সাঁতার কাটার সময় দুপুর বেলায় পানির নিচে তলিয়ে যায় এক ভর্তি পরীক্ষার্থী।

এর আগে বন্ধুর সঙ্গে গোসল করতে এসে মারা যান বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী। ২০০৪ সালের দিকে গোসল করতে নেমে শহীদুল্লাহ হলের এক শিক্ষার্থী প্রাণ হারান। তার কিছু দিন আগে এক বহিরাগত সকালে ব্যায়াম করে গোসল করতে নামলে ডুবে মারা যান।

ওই কর্মচারী আরো বলেন, আমি শুনেছি আমার চাকরিতে আসার আগে এভাবে সাঁতার কাটার সময় দিনে-দুপুরে পাঁচ থেকে সাত জন প্রাণ হারিয়েছে। তবে এই পুকুরে মৃত্যুর সঠিক সংখ্যা কেউ বলতে পারেনি।

সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, কর্তৃপক্ষের অযতত্ন-অবহেলায় পুকুরটির বেহালদশা। তিনটি ঘাটের মধ্যে একটি ভেঙে গেছে ও অন্য দুটি বিবর্ণ হয়ে গেছে। এ ছাড়া পুকুরের পানি অনেকটা ময়লা-আবর্জনা মিশে ঘোলাটে রং ধারণ করেছে। ঘাটের পাশে একটি সাইনবোর্ডে বড় বড় অক্ষরে বিজ্ঞপ্তি আকারে লেখা আছে- ‘পুকুরে গোসল ও সাঁতার কাটা নিষেধ’।

শিক্ষার্থীদের দাবি নিরাপত্তার স্বার্থে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের এ ব্যাপারে কার্যকরী ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

শহীদুল্লাহ হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. আজিজুর রহমান বলেন, পাশের হল জহুরুল হক হলের কেউ মারা যায় না কিন্তু গত ত্রিশ পঁয়ত্রিশ বছরে এখানে ১০-১২ জন মারা গেল এটির পেছনে অবশ্যই কোনো উল্লেখযোগ্য কারণ রয়েছে। মূলত অক্সিজেনের সমস্যা রয়েছে বলে তিনি ধারণা করেন।

এছাড়া এ অবস্থা থেকে কীভাবে পরিত্রাণ পাওয়া যায় সে ব্যাপারে প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলে কার্যকরী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তিনি জানান।