মেইন ম্যেনু

সাকার যত অপরাধ

হাই প্রোফাইলের রাজনৈতিক নেতা সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর মৃত্যুদণ্ড শনিবার রাত ১২টা ৪৫ মিনিটে কার্যকর হয়েছে। বিএনপির এই নেতা ২০০১ সাল থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত প্রভাবশালী মন্ত্রী ছিলেন। বেশ দাপট খাটিয়েছেন দলে এবং দলের বাইরে। তবে বরাবরই তার বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধকালীন নানা অপকর্মের অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে। ক্ষমতার দাপটে এসব অভিযোগ তুড়ি মেরে উড়িযে দিলেও শেষ পর্যন্ত তাকে ঝুলতে হলো ফাঁসির দড়িতে।

মুক্তিযুদ্ধকালে হত্যা, গণহত্যা, অপহরণ, অগ্নিসংযোগ, নির্যাতনসহ মানবতাবিরোধী নানা অভিযোগ রয়েছে বিএনপির এই নেতার বিরুদ্ধে। শেষ পর্যন্ত আদালতের রায়েও তা প্রমাণিত হওয়ায় তার বিচারকাজ সম্পন্ন হয় মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের মাধ্যমে।

সাকার বিরুদ্ধে ২৩ অভিযোগ

এক. একাত্তরের ৪ বা ৫ এপ্রিল রাত আনুমানিক ৯টার দিকে সাকা চৌধুরীর অনুসারী আবদুস সোবহান রাউজানের আধারমানিক গ্রামের অরবিন্দ সরকার, মতিলাল চৌধুরী, শান্তি কুসুম চৌধুরী, যোগেশ চন্দ্র দে ও পরিতোষ দাশকে গুডস হিল নির্যাতন কেন্দ্রে নিয়ে যায়। মতিলাল, শান্তি কুসুমসহ বাকী ছয়জনকে নির্যাতন করে হত্যার পর তাদের লাশ গুম করা হয়।

দুই. একই বছরের ১৩ এপ্রিল সকাল আনুমানিক সাতটার দিকে সাকা চৌধুরীর নেতৃত্বে পাকিস্তান সেনারা চট্টগ্রামের রাউজান থানার মধ্য গহিরার হিন্দুপাড়ার লোকজনকে ধরে এনে ডা. মাখন লাল শর্মার বাড়িত জড়ো করে। এরপর তারা পঞ্চবালা শর্মা, সুনীল শর্মা, মতিলাল শর্মা ও দুলাল শর্মাকে ব্রাশ ফায়ার হত্যা করে। আহতদের মধ্যে মাখন লাল শর্মা মাথায় এবং জয়ন্ত কুমার শর্মা পায়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে কয়েকদিন পর মারা যান। সাকা চৌধুরীর উপস্থিতিতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী এ হত্যাকাণ্ড চালায়।

তিন. ১৩ এপ্রিল আনুমানিক সাড়ে ৯টার দিকে সাকা চৌধুরীর নেতৃত্বে একদল পাকিস্তানি সেনা গহিরা এলাকার শ্রী কুণ্ডেশ্বরী ঔষধালয়ের প্রতিষ্ঠাতা নূতন চন্দ্র সিংহের মন্দিরে আসে। সেখানে নূতন চন্দ্র সিংহের সঙ্গে সাকা চৌধুরীর উপস্থিতিতে পাক সেনারা কয়েকমিনিট কথা বলে চলে যায়। আনুমানিক ১০/১৫ মিনিট পর আসামি সাকা চৌধুরীর নেতৃত্বে পাক সেনারা পুনরায় কুণ্ডেরী ভবনে প্রার্থনারত অবস্থায় নূতন চন্দ্র সিংহকে টেনে হিচড়ে মন্দির থেকে বাইরে ধরে নিয়ে আসে। এ সময় সাকা চৌধুরী বলেন, একে হত্যা করার জন্য বাবার নির্দেশ আছে। পরে সাকার নির্দেশে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সদস্যরা তাকে ব্রাশ ফায়ার করে। গুলিবিদ্ধ নূতন চন্দ্র সিংহ মাটিতে পড়ে ছটফট করা অবস্থায় আসামি সাকা চৌধুরী নিজে তাকে গুলি করে মৃত্যু নিশ্চিত করে। এরপর পাক সেনাদের নিয়ে ঘটনাস্থ ত্যাগ করেন সাকা চৌধুরী।

চার. মুক্তিযুদ্ধের সময় চৌধুরীর সহযোগী আবু মাবুদসহ দুইজন ১৯৭১ সালের ১৩ এপ্রিল রাউজানের মধ্যগহিরার জগৎমল্ল পাড়ায় কিরণ বিকাশ চৌধুরীর বাড়িতে হিন্দু সম্প্রদায়ের ব্যক্তিদের জড়ো করে। কিছুক্ষণ পর সাকা চৌধুরী পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে সঙ্গে নিয়ে সেখানে হাজির হন। এরপর পাকিস্তান বাহিনী চালায় ব্রাশফায়ার। ঘটনাস্থলেই ৩২ জন নিহত হন। এরমধ্যে রয়েছেন -তেজেন্দ্র লাল নন্দী, সমির কান্তি চৌধুরী, অশোক চৌধুরী, সীতাংশু বিমল চৌধুরী, প্রেমাংশু বিমল চৌধুরী, কিরণ বিকাশ চৌধুরী, সুরেন্দ্র বিজয় চৌধুরী, চারুবালা চৌধুরানী, নিরুবালা চৌধুরানী, প্রভাতি চৌধুরী, রাজলক্ষ্মী চৌধুরানী, কুসুমবালা চৌধুরানী, যতীন্দ্র লাল সরকার, হীরেন্দ্র লাল সরকার, প্রভাতি সরকার, দেবেন্দ্র লাল চৌধুরী, রাজেন্দ্র লাল চৌধুরী, অজিত কুমার চৌধুরী, পরিতোষ চৌধুরী, ভবতোষ চৌধুরী, গোপাল চৌধুরী, রানীবালা চৌধুরানী, মঞ্জুর চৌধুরী, ঝিনু চৌধুরী, রুনু চৌধুরী, দেবু চৌধুরী, স্বপন চৌধুরী, ফণীভূষণ চৌধুরী, মধুসূদন চৌধুরী, বিপিন চৌধুরী, কামিনি রুদ্র ও অনন্ত বালা পাল (নিরুবালা)।

পাঁচ. একইদিন বেলা একটার দিকে রাউজানের সুলতানপুরের বনিকপাড়ায় সাকা চৌধুরীর উপস্থিতিতে নেপাল চন্দ্র ধর, মনীন্দ্র লাল ধর, উপেন্দ্র লাল ধর ও অনিল বরণ ধরকে হত্যা করা হয়।

ছয়. রাউজানের উনসত্তরপাড়ায় ক্ষিতিশ চন্দ্র মহাজনের বাড়ির পেছনে পুকুরপাড়ে একাত্তরের ১৩ এপ্রিল ডাকা হয় শান্তি কমিটির সভা। এলাকার লোকজন সেখানে উপস্থিত হওয়ার পর সাকা চৌধুরীর উপস্থিতিতে পাকিস্তান বাহিনী সদস্যরা নিরীহ নিরস্ত্র হিন্দু নর নারীদের ব্রাশফায়ার করে। এতে চরন পাল, সন্তোষ মালী, বাবুল মালীসহ ৭০ জনের বেশি ব্যক্তি নিহত হয়।

সাত. একইবছরের ১৪ এপ্রিল রাউজান পৌরসভা এলাকা সতিশ চন্দ্র পালিতকে সাকা চৌধুরীর নির্দেশে পাক সেনারা তার বাড়িতে ঘরের মধ্যে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়।

আট. ১৭ এপ্রিল চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি শেখ মোজাফফর আহমেদ ও তার ছেলে শেখ আলমগীরকে খাগড়াছড়ি-রাঙ্গামাটি সড়কের হাটহাজারি বাসস্ট্যান্ড থেকে সাকা চৌধুরীর নেতৃত্বে পাক সেনারা ধরে স্থানীয় সেনা ক্যাম্পে নিয়ে আসে। পরে সেখানে নির্যাতন চালিয়ে পিতা-পুত্রকে হত্যা করা হয়।

নয়. সাকা চৌধুরীর নির্দেশে মধ্য এপ্রিলে রাউজান থানার কদুরখিল হিন্দুপাড়ার শান্তি দেবকে ধরে নিয়ে নির্যাতনের পর হত্যা করা হয়।

দশ. একাত্তরের ১৩ এপ্রিল রাউজানের ডাবুয়া গ্রামের মানিক ধরের বাড়িসহ ওই এলাকার হিন্দুদের বাড়িতে সাকা চৌধুরীর উপস্থিতিতে লুটপাট চালানো হয়।

এগারো. ২২ এপ্রিল রাউজানের শাকপুরা গ্রামে ফয়েজ আহমেদ, আলাল আহমেদ, আহাম্মদ ছফা, নিকুঞ্জ শীলসহ অসংখ্য ব্যক্তিকে হত্যা করা হয়। সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও তার পিতা ফজলুল কাদের চৌধুরীর উপস্থিতিতে এ হত্যাকাণ্ড চালানো হয় বলে অভিযোগ আনা হয়।

বারো. একাত্তরের ৫ মে রাউজানের জগতমল্ল পাড়ায় বিজয় চৌধুরী, হরেন্দ্র লাল চৌধুরীসহ চারজনকে সাকা চৌধুরীর উপস্থিতিতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী হত্যা করে।

তেরো. ১৫ মে বাদ মাগরিব ঘাসি মাঝিরপাড় এলাকায় সাকা চৌধুরী ও তার পিতা ফজলুল কাদের চৌধুরীর উপস্থিতিতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী উত্তর হালি শহরের নুরুল আলম, আয়েশা খাতুন, জানে আলম ও আবুল কালামকে হত্যা করে। সেখান থেকে সাকা চৌধুরীর নেতৃত্বে তার সহযোগিরা ৫ মহিলাকে ধরে নিয়ে পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে তুলে দেওয়া হয়। সেখানে ওই মহিলাদের ধর্ষণ করা হয়।

চৌদ্দ. সাকা চৌধুরীর নেতৃত্বে ২০ এপ্রিল রাউজানের পাথের হাটের কর্তার দিঘীরপাড় এলাকার মো. হানিফকে অপহরণ করে নির্যাতন চালিয়ে হত্যা করা হয়। পনেরো. রাজাকার মাকসুদুর রহমান আসামির পিতা ফজলুল কাদের চৌধুরীর নির্দেশে ৭ জুন শহরের জামাল খান রোড থেকে ওমর ফারুক নামের এক ব্যক্তিকে অপহরণ করে গুডস হিলে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে তাকে নির্যাতন করে হত্যা করা হয়।

ষোল. ১৫ জুলাই চট্টগ্রামের কোতোয়ালী থানার হাজারী লেনের জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীর বাড়ি থেকে নিজামউদ্দিনসহ ৭জনকে ধরে নিয়ে গুডহিলে নিয়ে নির্যাতন করা হয়।

সতেরো. ১৩ জুলাই শিকারপুর ইউপি চেয়ারম্যান শামসুদ্দিনেক ধরে নিয়ে নির্যাতন করা হয়।

আঠারো. সাকা চৌধুরীর নির্দেশে তার সহযোগীরা ২৭ জুলাই বোয়াল খালীর এখলাস মিয়াকে ধরে নিয়ে গুডসহিলে নির্যাতনের পর হত্যা করা হয়।

ঊনিশ. ফজলুল হক চৌধুরী নামের এক ইউপি চেয়ারম্যানকে ধরে নিয়ে নির্যাতনের পর ছেড়ে দেওয়া হয়। এসব হত্যাকাণ্ড, নির্যাতনের ঘটনা ছাড়াও তার বিরুদ্ধে আরো চারটি নির্যাতনের ঘটনায় অভিযোগ গঠন করা হয়। সাকা চৌধুরীর চট্টগ্রামের বাসভবন গুডসহিলে নিয়ে এ সব নির্যাতন করা হয়।

বিশ. ২৭ জুলাই দুপুরে বোয়ালখালীর কদুর খালী গ্রামের খোকার দোকানের সামনে থেকে আক্কাস মিয়াকে রাজাকাররা আটক করে নিয়ে যায় সাকা চৌধুরী ও তার দোসররা। পরে তাকে সিও অফিসের রাজাকার ক্যাম্পে নিয়ে নির্যাতন করে হত্যা করা হয়।

একুশ. সাকা চৌধুরী ও তাদের দোসররা আগস্টের প্রথম দিকে ইউপি চেয়ারম্যান ফজলুল হককে রাউজান এলাকায় গ্রেফতার করে নিয়ে যায়। তাকে সার্কিট হাউজের টর্চার সেন্টারে নিয়ে নির্যাতন করা হয়। অসুস্থা অবস্থায় পরে তিনি মারা যান।

বাইশ. আগস্টে দ্বিতীয় সপ্তাহে সাকা চৌধুরী ও আল শামস বাহিনীর সদস্যরা নুরু চৌধুরীকে অপহরণ করে নিয়ে যায়। পরে তাকে ডাবলমুরিং এলাকায় নিয়ে নির্যাতন করা হয়। পরদিন তাকে কমার্স কলেজে পরীক্ষা দিতে নিয়ে যায়। এরপর সে অসুস্থ হয়ে পড়লে ৬ হাজার ৫শ টাকায় তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়।

তেইশ. ২ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় সাকা ও তার সহযোগী বাহিনী এম সলিমুল্লাহ নামে একজনের ব্যক্তির হিন্দু কর্মচারীকে ধরে নিয়ে নির্যাতন করে। এর প্রতিবাদ করতে গেলে সলিমউল্লাহকে গুডস হিলে নিয়ে রাতভর নির্যাতন করা হয়। পরদিন তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়।

ট্রাইব্যুনালে সাকার বিরুদ্ধে আনা ২৩টি অভিযোগের মধ্যে ৩, ৫, ৬ ও ৮ নম্বর অভিযোগ প্রমাণিত হয় এবং সর্বোচ্চ সাজা দেন ট্রাইব্যুনাল। আপিলের রায়ে সেগুলোর সর্বোচ্চ সাজাই বহাল রাখেন সর্বোচ্চ আদালত।