মেইন ম্যেনু

হত্যার বিচার হয়নি ২০ বছরেও

সাতক্ষীরায় বিভিন্ন কর্মসূচীর মধ্যদিয়ে সাংবাদিক স.ম আলাউদ্দীনকে স্মরণ

সাতক্ষীরা: ভোমরা স্থল বন্দরের প্রতিষ্ঠাতা, দৈনিক পত্রদুত পত্রিকার সম্পাদক ও বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ স.ম আলাউদ্দীন এর ২০ তম শাহাদাত বার্ষিক উপলক্ষে সাতক্ষীরা প্রেসক্লাবের আয়োজনে এক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।

রোববার বেলা ১১টায় প্রেসক্লাবের হলরুমে অনুষ্ঠিত আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন, সাতক্ষীরা প্রেসক্লাবের সভাপতি আবুল কালাম আজাদ। অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন, সাতক্ষীরা প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি আবু আহমেদ, সুভাষ চৌধুরী, আনিসুর রহিম, কল্যাণ ব্যনার্জি, এম কামরুজ্জামান,আবুল কাসেম,মোস্তাফিজুর রহমান উজ্জ্বল প্রমূখ।

বক্তারা ২০ বছরেও স ম আলাউদ্দীন হত্যার বিচার না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সাতক্ষীরায় এখন রাজনৈতিক অভিভাবকের শুন্যতা বিরাজ করছে। এসময় স ম আলাউদ্দীনের মত সাহসি নেতৃত্বের খুব প্রয়োজন ছিল।

এর আগে শহীদ স.ম আলাউদ্দীন এর কবরস্থানে সাতক্ষীরা প্রেসক্লাব এর পক্ষ থেকে পুস্পমাল্য অর্পন ও মরহুমের কবর জিয়ারাত করা হয়।

প্রসঙ্গত ১৯৯৬ সালের ১৯ জুন রাত ১০টা ২৩ মিনিটে নিজ পত্রিকা অফিসে কর্মরত অবস্থায় সাতক্ষীরার গডফাদারদের ভাড়া করা কিলারের কাটারাইফেলের গুলিতে নির্মমভাবে নিহত হয়েছিলেন দৈনিক পত্রদূত সম্পাদক বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ স ম আলাউদ্দিন। তাকে হত্যার পর ২০টি বছর পেরিয়েছে, কিন্তু আজও বিচারের বাণী কাদছে নীরবে, নিভৃতে।

সাতক্ষীরা আদালত সূত্রে জানা গেছে, দৈনিক পত্রদূত সম্পাদক স ম আলাউদ্দিনকে হত্যার ঘটনায় তার ভাই স.ম নাসির উদ্দিন একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।

হত্যাকা-ের ৫দিন পর পুলিশ হত্যাকা-ে ব্যবহৃত কাটা রাইফেলসহ সুলতানপুরের আব্দুল ওহাবের ছেলে যুবলীগ কর্মী সাইফুল ইসলামকে গ্রেফতার করে।

সে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়ে হত্যাকা-ের কারণ এবং এরসঙ্গে জড়িত হিসেবে সাতক্ষীরার আলিপুরের আব্দুস সবুর, শহরের সুলতানপুরের খলিলুল্লাহ ঝড়ু, তার ভাই মোমিন উল্লাহ মোহন ও সাইফুল্লাহ কিসলু, কিসলুর সহযোগী এসকেন্দার মির্জা, প্রাণসায়রের সফিউর রহমান, সুলতানপুরের কাজী সাইফুল ইসলাম, তালা উপজেলার নগরঘাটা ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান আব্দুর রউফ, তার শ্যালক সাতক্ষীরা শহরের কামালনগরের আবুল কালাম ও কিসলুর ম্যানেজার আতিয়ারের নাম প্রকাশ করে।

এরপর প্রায় এক বছর তদন্ত শেষে ১৯৯৭ সালের ১০ মে সিআইডির খুলনা জোনের এএসপি খন্দকার মো. ইকবাল উপরোক্ত ব্যক্তিদের আসামি শ্রেণিভূক্ত করে চাঞ্চল্যকর এই হত্যা মামলার চার্জশিট দাখিল করেন। আসামিদের মধ্যে কারাগারে থাকা অবস্থায় সাইফুল্লাহ কিসলু মারা গেছেন। এছাড়া কিসলুর ম্যানেজার আতিয়ারকে আজও খুঁজে পাওয়া যায়নি।

আদালত সূত্র আরও জানায়, সাতক্ষীরা দায়রা জজ আদালতে আসামিদের বিরুদ্ধে মামলাটির অভিযোগ গঠনের পর ঝড়–, সবুরসহ কয়েকজন আসামি উচ্চ আদালতে কোয়াশমেন্টের আবেদন করলে মামলাটির বিচার কার্যক্রম স্থগিত হয়ে যায়। পরবর্তীতে উচ্চ আদালতের আদেশে দীর্ঘদিন মামলাটির কার্যক্রম বন্ধ ছিল।

এক পর্যায়ে সুপ্রীম কোর্টের অ্যাপিলেট ডিভিশন বিষয়টির নিষ্পত্তি করে সকল আসামির বিরুদ্ধে মামলাটি দ্রুত বিচারের নির্দেশ দেন। এ পর্যায়ে মামলাটি সাতক্ষীরা দায়রা জজ আদালতে পুনরায় বিচার কার্যক্রম শুরুর প্রাক্কলে পুনরায় সবুর, ঝড়ুসহ কয়েকজন আসামি সাতক্ষীরা জেলার পরিবর্তে মামলাটি অন্য কোন জেলায় বিচারের জন্য উচ্চ আদালতে আবেদন করলে বিচার কার্যক্রম আবারো স্থগিত হয়ে যায়।

হাইকোর্ট ডিভিশন আসামিদের আবেদন নামঞ্জুর করে আদেশ দিলে আসামিরা ঐ আদেশের বিরুদ্ধে অ্যাপিলেট ডিভিশনে যায়। সেখানে শুনানির পর আসামিদের আবেদন নামঞ্জুর হয়। সে আদেশ নিম্ন আদালতে আসার পর মূলত ২০১২ সালে মামলাটির সাক্ষ্য গ্রহণ শুরু হয়। কিন্তু মামলাটির বিচার কাজ আজও শেষ হয়নি। আসামীরা জামিনে থেকে আজও আস্ফালন করে বেড়াচ্ছে সাতক্ষীরা শহরে।

সূত্র জানায়, মামলাটির ৩৮জন সাক্ষীর মধ্যে ইতোমধ্যে ১৫জনের সাক্ষ্য গ্রহণ শেষ হয়েছে। বেশ কয়েকজন সাক্ষীকে ওয়ারেন্ট দেওয়ার পরও তাদেরকে মামলায় বিবরণে উল্লিখিত ঠিকানায় খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। ইতোমেধ্যে মামলাটির অভিযোগপত্রে উল্লিখিত সাক্ষীদের মধ্যে ৭/৮ জন মারা গেছেন। হুমকি দেওয়া হয়েছে কয়েকজন সাক্ষীকে। আর তাতে দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে বিচারপ্রত্যাশী শহীদ স ম আলাউদ্দিনের স্বজনসহ সাতক্ষীরার ২০ লক্ষ মানুষের অপেক্ষা।

শহীদ স ম আলাউদ্দিনের মেয়ে স্কুল শিক্ষক লায়লা পারভীন সেজুতি বলেন, ঘাতকেরা নানাভাবে বিচার কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত করেছে। বছরের পর বছর ঘুরছি। ২০ বছর হয়ে গেছে। বাবার হত্যার বিচারের জন্য আর কতদিন আমাদের অপেক্ষা করতে হবে জানি না। হত্যাকারীরা আস্ফলন করে বেড়ায়। আর আমরা থাকি নিরাপত্তাহীনতায়। ইতোপূর্বে মামলার সাক্ষীদের হুমকি দেওয়া হয়েছে। আমরা কি বাবা হত্যার বিচার পাব? প্রশ্ন করেন তিনি।

সাতক্ষীরা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট ওসমান গনি জানান, শহীদ স ম আলাউদ্দিন হত্যা মামলার দু’জন সাক্ষীকে সর্বশেষ প্রকাশ্যে দিবালোকে আদালত চত্বরেই হুমকি দেয় আসামিরা। বিষয়টি আদালতকে অবগত করা হয়েছে। এছাড়া অনেক সাক্ষীকে আদালতে হাজির করা সম্ভব হচ্ছে না। ২০ বছর আগের ঘটনা। অনেক সাক্ষী অন্যত্র চলে গেছেন, কেউবা মৃত্যুবরণ করেছেন। এভাবেই দিনের পর দিন পড়ছে। কিন্তু মামলার অগ্রগতি নেই।

আদালত সূত্র আরও জানায়, চাঞ্চল্যকর এই হত্যা মামলার আসামি কাজী সাইফুল ইসলামের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী ভোমরা স্থল বন্দর, সাতক্ষীরা চেম্বার অব কমার্সের বিরোধ, কলেজ ছাত্র ভবরঞ্জন হত্যা মামলায় স ম আলাউদ্দিনের বাদী পক্ষে অবস্থান নেওয়া ইত্যাদি বিষয়ে আসামিরা পরস্পর যোগসাজশে স ম আলাউদ্দিনকে হত্যা করেন। উল্লিখিত বিষয়গুলো ইতোপূর্বে যারা সাক্ষ্য দিয়েছেন তাদের জবানবন্দিতেও উঠে এসেছে।
আধুনিক সাতক্ষীরার স্বপ্নদ্রষ্টা, শহীদ স ম আলাউদ্দিন শুধু পত্রদূতের সম্পাদক ছিলেন না, তিনি একাধারে সাতক্ষীরার ব্যবসা-বাণিজ্যের সম্ভাবনাদ্বার ভোমরা স্থল বন্দর, সাতক্ষীরা চেম্বার অব কমার্স, সাতক্ষীরা ট্রাক টার্মিনাল ও বঙ্গবন্ধু পেশাভিত্তিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রতিষ্ঠাতা।

স ম আলাউদ্দিন ১৯৭০ সালের নির্বাচনে সাতক্ষীরার তালা-কলারোয়া নির্বাচনী এলাকা থেকে প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে তিনিই সর্বকনিষ্ঠ প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য। প্রাদেশিক পরিষদ ও জাতীয় পরিষদের যেসব সদস্য সরাসরি মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গনে অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করেন, তাদের মধ্যে অন্যতম শহীদ স ম আলাউদ্দিন। যিনি একাধারে মুক্তিযুদ্ধের সংগঠকও। মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত তিনি তালা উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন।