মেইন ম্যেনু

সাত মাসে হত্যার শিকার ৬৯ শিশু : নেপথ্যে বিচারহীনতা ও সামাজিক অবক্ষয়

সিলেটের শিশু রাজনের আর্তনাদ আমাদের এ সভ্য সমাজের কোন বিবেকবানের কানে পৌঁছেনি। তার আর্তির করুণ কাহিনী শেষ না হতেই আরো ঝরে গেল ৪ টি নিষ্পাপ শিশুর প্রাণ। রাজন তবু তার বাবা-মাকে ডাকতে পেরেছিল। কিন্তু খুলনার রাকিব সে সুযোগও পায়নি। ঘাতকরা তার মুখ স্কচটেপ দিয়ে আটকে দিয়েছিল। বাঁচার আর্তনাদ মনের ভিতরে গুমড়ে তাকে ‘শিশু মৃত্যুর মিছিল’ এ নাম লেখাতে হয়। বরগুনার আমতলীতে শিশু রবিউল আউয়ালকে ‘মাছ চুরি’র অপবাদ দিয়ে হত্যা করেই ঘাতকরা ক্ষান্ত হয়নি, তারা শিশুর চোখ উপরে ফেলে।

শিশুদের ওপর এই যে নৃশংস কায়দায় নির্যাতন, তা সকল নির্যাতনের চিত্রকে হার মানিয়ে দিয়েছে। সামান্য ও তুচ্ছ কারণে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে শিশুদের ওপর ঘটছে নৃশংস হত্যাকাণ্ড। সাম্প্রতিক শিশু হত্যার ঘটনা এমনভাবে বেড়ে গিয়েছে যে কে কীভাবে কত রকমের কায়দায় নির্যাতন চালিয়ে শিশুকে হত্যা করবে-তার যেন প্রতিযোগিতায় নেমেছে সভ্য সমাজ। সামাজিক অবক্ষয় ও শিশু হত্যার বিচার না হওয়ায় এ ধরনের ভয়ঙ্কর হত্যার দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে বলে অপরাধ বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি সামাজিক-পারিবারিক মূল্যবোধ বাড়ানোর তাগিদ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক এ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল বলেন, শিশুদের উপর নৃশংসতার কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনা না। অপরাধীরা দিনের পর দিন পার পেয়ে যাচ্ছে বলে এই ঘটনাগুলো বেড়ে চলেছে। সভ্য সমাজে এমন ঘটনা ঘটতে পারে না। সংবিধানে শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কথা আছে। তাই রাষ্ট্রকে চুপ করে থাকলে চলবে না। রাষ্ট্রকে দোষীদের বিচারের আওতায় এনে শাস্তি দিতে হবে।

মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) পরিসংখ্যান অনুযায়ী ২০১২ সালে এ ধরনের হত্যকাণ্ড ঘটেছে ১২৬, ২০১৩ সালে ১২৮, ২০১৪ সালে ১২৭ আর এ বছরের মার্চ পর্যন্ত ৫৬ শিশু হত্যা শিকার হয়। এদের মধ্যে জুলাই থেকে ৪ আগস্ট পর্যন্ত ১৩ জনকে নৃশংস কায়দায় হত্যা করা হয়েছে। জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সারাদেশে ৬৯ জন শিশু হত্যার শিকার হয়েছে।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের শিশু অধিকার শাখার উপ-পরিচালক গীতা চক্রবর্তী বলেন, যারা নির্যাতন করছে এবং যারা নির্যাতিত হচ্ছে তাদের মধ্যে সামাজিক শ্রেণী বিন্যাসের পার্থক্য তেমন নেই। তাই যে যার ওপর ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারছে, তাকেই নির্যাতন করছে। এক ধরনের হতাশা ও দাম্ভিকতা থেকে এ ধরনের পৈশাচিক নির্যাতনের ঘটনা ঘটছে। যিনি নির্যাতন চালাচ্ছেন, তিনি জানেন যে ঐ শিশু বা তার পরিবারের কোন বিচার পাওয়ার ক্ষমতা নেই। বিচার পাবে না বলেই তারা প্রকাশ্যে এ ধরনের নির্যাতন চালাচ্ছে।

কবুতর চুরির অভিযোগে ১৩ এপ্রিল রাজধানীর খিলক্ষেতের মস্তুল এলাকার ৭-৮ ব্যক্তি কিশোর নাজিমের ওপর বর্বর হামলা চালায়। রশি দিয়ে ১৬ বছরের কিশোর নাজিম উদ্দিনের হাত-পা বেঁধে ফেলে। বেধড়ক পেটানোর পর অচেতন হয়ে পড়ে। এরপর বাঁচার জন্য পানি খেতে চাইলে লাথি মেরে নাজিমের দেহ ফেলে দেয়া হয় বালু নদীতে। অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে হামলাকারীরা। রাজধানীর ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল এলাকায় ৮/১০ বছরের এক শিশুর পিঠের চামড়া তুলে এবং মলদ্বার দিয়ে ধাতব তার ঢুকিয়ে দিয়ে হত্যার পর লাশ ফেলে দেয়া হয়।

মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনলজি এন্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক নুরজাহান খাতুন বলেন, শিশুদের ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানকে অপরাধীদের শিকার হতে সুযোগ তৈরি করে দেয়। অপরাধীরা কৌশলগত কারণে শিশুদের ওপর এ ধরনের অপরাধ সংঘটিত করতে সহজ মনে করে। শিশুদের ওপর নির্যাতনের সময় তারা কোন প্রতিরোধ করতে পারে না। এ কারণে খুব সহজেই তাদের ওপর অমানুষিক নির্যাতন চালায়। গবেষণায় দেখা যায়, অপরাধীদের পূর্বের বিচার না হওয়া এবং অপরাধীদের মধ্যে যদি মানসিক অসংগতিপূর্ণ অবস্থা থাকে, তখন এ ধরনের অপরাধে অপরাধীদের উত্সাহী করে। এ জন্য পারিবারিক ও সামাজিকভাবে শিশুদের জন্য বিশেষ কাউন্সিলিং করা দরকার।

র‌্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক কর্নেল জিয়াউল আহসান বলেন, সামাজিক অবক্ষয় থেকে এ ধরনের ঘটনা ঘটছে। প্রতিটি ঘটনা তদন্ত করে র্যাব দোষী ব্যক্তিদের একটি তালিকাও করেছে। এই হত্যাকারীদের গ্রেফতারের চেষ্টা করা হচ্ছে।