মেইন ম্যেনু

সাবধান! কটনবাড মানে সংক্রমণ কানে

এই নিবন্ধের শুরুতে কটনবাড নিয়ে কয়েকটি বাস্তব চিত্র তুলে ধরা যেতে পারে। শিমুল (প্রকৃত নাম নয়) একজন শিক্ষিত নারী। দায়িত্বশীল পদে কাজ করছেন। বিবাহিত, দুই সন্তানের মা। পারিবারিক জীবনেও অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে হয় তাকে। যুগের সাথে তাল মিলিয়ে চলা স্মার্ট নাগরিক শিমুল। কিন্তু এই শিমুলও স্বাস্থ্যগত কিছু বিষয়ে অসচেতনতার পরিচয় দেন। তিনি মনে করেন দৈনিক গোসলের পর কানে যে পানি ঢোকে তা কটনবাড দিয়ে মুছে ফেলা উচিত। শুধু তা-ই নয়, প্রায়ই তিনি কটনবাড দিয়ে কান পরিষ্কার করেন। আগে তিনি কান পরিষ্কারের জন্য চুলের ক্লিপ ব্যবহার করতেন। তাতে কানে ব্যথা হয়।

এক সময় কান চুলকানোর জন্য তাদের পরিবারে মুরগির পালক ব্যবহারের প্রচলন ছিল। ছোটবেলায় শিমুল তার মাকে দেখেছে, তার প্রবাসী ভাইয়ের জন্য সুন্দর করে কেটে পরিষ্কার করে, গরম পানিতে সিদ্ধ করে (জীবাণুমুক্ত করার প্রক্রিয়া) বিদেশে মুরগির পালক পাঠাতেন। সেই পালকগুলো খুব সুন্দর করে কাটা হত। পালকের প্রান্তটি ছেঁটে ফুলের পাঁপড়ির মত গোলাকার করে ছোট কৌটায় রাখা হত। যেমনটি আজকাল কৌটায় করে কটনবাড দোকানের সেলফে রাখা হয়।

শিমুলের বোন, নাম মাহমুদা (প্রকৃত নাম নয়) একটি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের অধ্যক্ষ। তিনিও কটনবাড ব্যবহার করেন। বিশেষ করে কান পরিষ্কারের জন্য এটি তার খুব পছন্দ। ইতিমধ্যে স্কুলেও কটনবাড দিয়ে স্টুডেন্টদের কান পরিষ্কার করার আদেশ জারি করেছেন অভিভাবক বরাবরে।

শিমুলের আরেক বোন কলেজ শিক্ষিকা। নাম আফরোজা (প্রকৃত নাম নয়)। তিনি কান চুলকাতে পছন্দ করেন। এক ধরনের ভাল লাগার অনুভূতি থেকেই কটনবাড ব্যবহার করেন। শিমুলের সবচেয়ে বড় বোন ফিরোজা (প্রকৃত নাম নয়)। তিনি অযথাই কান চুলকান। ওনার কথা হচ্ছে, আমি কান না চুলকিয়ে থাকতে পারি না। ইতিমধ্যে কান চুলকাতে গিয়ে কানের পর্দা ফুটো করার কৃতিত্ব অর্জন করেছেন। কানের পর্দা ফুটো করার ঘটনাটি তিনি যেভাবে বর্ণনা করেন, তাতে বিষয়টিকে ‘কৃতিত্ব’ হিসেবে স্বীকৃতি না দিয়ে পারা যায় না।

শিমুলের খালাত বোন চৈতি। কটন বাড ব্যবহার করতে গিয়ে বহির্কর্ণে বাড থেকে কটনটুকু খুলে রয়ে যায়। সেই নিয়ে মহা চিন্তা, হুলুস্থূল। অবশেষে ১২ ঘণ্টা পর সেটা বের করা হল এ্যাপোলো হাসপাতালে। এই পরিবারের প্রত্যেকেই নিয়মিত কটনবাড ব্যবহার করেন। এদের সবারই সবসময় কান চুলকায়। কান ব্যথা করে। কান ভারী ভারী লাগে। মাঝে মধ্যে দু-একজনের কানে জীবানুর সংক্রমণ হয়ে প্রচণ্ড ব্যথাও হয়েছে। অনেক কষ্ট সহ্য করার পড় সেরে উঠলেও আবার আগের মতোই বিপুল বিক্রমে কান চুলকানোর কাজে লেগে যান সবাই। এতো গেল একটি পরিবারের কথা।

বছরখানেক আগে ৩ বছরের এক ছেলেকে নিয়ে তার মা চেম্বারে আসেন। ছেলের কানের বাইরে জমাটবাধা রক্ত। জিজ্ঞেস করে জানা গেল, ছেলে যখন কটনবাড দিয়ে কান চুলকাচ্ছিল তখন অন্য একটি ছেলে এসে ধাক্কা দেওয়ায় কানের এই অবস্থা। কান পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেল কানের পর্দা ছিঁড়ে গেছে।

কটনবাডের কারণে সৃষ্ট কানের বিভিন্ন ধরনের সমস্যার উদাহরণ দেওয়া যাবে। যারা কটনবাড ব্যবহার করেন তাদের প্রায় সবাই পরম ভক্তি ভরে কাজটি করে থাকেন। প্রথমত তারা মনে করেন কান করা স্বাস্থ্য কর্মেরই একটি অংশ। এটি করার মাধ্যমে তারা নিজেকে স্বাস্থ্যসচেতন হিসেবে উপস্থাপন করে থাকেন। এদের প্রায় সবাই মনে করেন, কান পরিষ্কারের জন্য কটনবাড খুবই যথার্থ, নিরাপদ, জীবাণুমুক্ত ও আধুনিক একটি উপকরণ। একসময় যেখানে কান চুলকানোর জন্য মুরগির পালক (ক্ষেত্রবিশেষে পবিত্রতার বিবেচনায় কবুতরের পালক), চুলের ক্লিপ, পেন্সিলের মাথা, টুথপিক, পানের বোঁটা, কচুর ডগা ইত্যাদি যা কিছু হাতের কাছে পাওয়া যেত তাই দিয়ে কান চুলকানো হতো, এখন সেখানে কটনবাডের ব্যবহার যেন বিজ্ঞানের আশীর্বাদ হয়ে এসেছে। এসব নানা কারণে কটনবাড খুবই সমাদৃত ও প্রয়োজনীয় একটি উপকরণ হিসাবে পরিগণিত হচ্ছে। অথচ এই কটনবাড কানে মলম দেওয়ার কাজ ছাড়া আর কোনো ভাল কাজে লাগে বলে মনে হয় না। বরং কটনবাড ব্যবহারে ক্ষতির পরিমাণই বেশি।

কানের বিভিন্ন ধরনের অস্বস্তি সৃষ্টি ও জীবানুর সংক্রমণ হওয়ার পেছনে কটনবাডের ভূমিকা রয়েছে। যারা নিয়মিত কটনবাড ব্যবহার করেন, তাদের কাছে কান সবসময়েই ভারী ভারী মনে হবে। এ ছাড়া কান চুলকাবে, কানে ব্যথা করবে বা কান কামড়াচ্ছে ইত্যাদি অভিযোগ সারা বছরই থাকবে, যদি না কান চুলকানো বা কানে কটনবাড ব্যবহার বন্ধ করা হয়। যারা কটনবাড ব্যবহারে অভ্যস্ত তাদেরকে সহজে নিরস্ত করা যায় না। কারণ কটনবাড ব্যবহারে বহির্কর্ণের ত্বক সামান্য পরিমাণে হলেও ছুলে যায়। এতে কানে এক ধরনের উত্তেজনার সৃষ্টি হয়, কান সবসময় সুড়সুড় করে ও চুলকায়। এ অবস্থায় কানে চুলকানির উদ্রেক হয়। তখন অনেকের পক্ষেই কান না চুলকিয়ে থাকা যায় না। এ কারণে একবার কটনবাড ব্যবহারকারী সহজে কটনবাড ব্যবহার ছাড়তে পারে না।

এ ছাড়া কটনবাড ব্যবহারে কানে ছত্রাক বা ফাংগাস সংক্রমণ হয়ে থাকে। কানে ফাংগাস হলে কান খুব চুলকায়, কান দিয়ে কষের মত ঝরে, কান ব্যথা করে, কান আংশিক বন্ধ হয়ে থাকে। ফাংগাস সংক্রমণের ব্যাপকতা অনুযায়ী উপসর্গের তীব্রতাও বাড়তে থাকে। কানে ফাংগাস সংক্রমণ তীব্র হয়ে বহির্কর্ণের পথ প্রদাহযুক্ত করে ফেলে। এটি অত্যন্ত কষ্টকর একটি অবস্থা। এমনটি হলে কানে তীব্র ব্যথা হয়। কান স্পর্শ করলেই ব্যথা লাগে। একমাত্র ভুক্তভোগীরাই সেই কষ্ট অনুভব করেছেন। কটনবাড ব্যবহারে কানের পর্দা ছিদ্র হওয়ার ঝুঁকি থাকে। বহির্কর্ণের পথ আঘাতপ্রাপ্ত হতে পারে। শিশুরা কটনবাডের ব্যবহার শেখে বড়দের ব্যবহার দেখে।

সারা দুনিয়ায় নাক কান ও গলা বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, কান পরিষ্কারের দরকার নেই। কাজেই কান পরিষ্কারের জন্য কটনবাড কেন, কোনো উপকরণই অনুমোদন করেন না নাক, কান, গলা বিশেষজ্ঞরা। তাহলে কান কীভাবে পরিষ্কার থাকবে বা কান কীভাবে পরিষ্কার করব? এমন প্রশ্নের উত্তর হচ্ছে, কান নিজে থেকেই পরিষ্কার হয়ে যায়। খাবার গ্রহণ এবং কথা বলার সময় চোয়ালের নড়াচড়ায় বহির্কর্ণের কানের মধ্যকার ওয়াক্স বা খোল বাইরের দিকে আসতে থাকে এবং বেরিয়ে যায়। কান পরিষ্কারের জন্য কটনবাড ব্যবহার করলে অধিকাংশ ময়লাই কানের ভেতরে চলে যায়। যেটুকু বেরিয়ে আসে তা খুবই সামান্য। যে ময়লাটুকু কটনবাডের ধাক্কায় ভেতরে চলে যায় তা আর নিজ থেকে বেরিয়ে আসতে পারে না। এই বিভিন্ন প্রক্রিয়ার আশ্রয় নিয়ে সেই ময়লা বের করতে হয়।

কটনবাড কান পরিষ্কারের জন্য বাণিজ্যিকভাবে বাজারে এলেও এর প্রকৃত ব্যবহার লক্ষ করা যায় ল্যাবরেটরিতে ও কসমেটিকস ব্যবহারের জন্য। কটনবাডের অন্য নাম ‘কটন সোয়াব’। কটন সোয়াবের কাঠিটি লম্বায় প্রায় ৬ ইঞ্চির মতো। এর কাঠিটি তৈরি করা হয় প্রাকৃতিক উপাদানের কোনো শলাকা থেকে। ল্যাবরেটরিতে কোনো কিছু কালচার করার কাজে, ডিএনএ টেস্ট করার জন্য লালার নমুনা সংগ্রহের কাজসহ বিভিন্ন ড্রেসিংয়েও এর ব্যবহার রয়েছে। এইসব কাজে ব্যবহার করার জন্যই তাতে প্রাকৃতিক উপাদানের তৈরি শলাকা নেওয়া হয়। যাতে করে জীবাণুমুক্ত করার জন্য অটোক্লেভ মেশিনে দিলে সেটি গলে কিংবা নষ্ট হয়ে না যায়। এ কারণে ল্যাবের কাজে ব্যবহৃত ‘কটনবাড’ প্রকৃতপক্ষে কটন সোয়াব হিসাবেই পরিচিত। আর এদিকে অন্যান্য কাজে ব্যবহৃত কটন বাডের ‘বাড’টি প্লাস্টিকের তৈরি। যা দিয়ে গোঁফে কলপ দেওয়া কিংবা মেকআপে বিভিন্ন প্রসাধনী লাগানোর কাজে ব্যবহার করা হয়। সময়ের পরীক্ষায় কটনবাডের এইসব ব্যবহারগুলোই প্রকৃতপক্ষে গ্রহণযোগ্য হিসাবে স্বীকৃতি পেয়েছে। কিন্তু যে উদ্দেশ্য এটি উদ্ভাবিত হয়েছিল তার বিপরীতে যথেষ্ট বৈজ্ঞানিক যুক্তি রয়েছে। এখন বলা হচ্ছে, কানে কটনবাড ব্যবহার মানেই কানে রোগকে আমন্ত্রণ জানানো।

লেখক : ডা. সজল আশফাক. সহযোগী অধ্যাপক, নাক কান গলা বিভাগ, হলি ফ্যামিলি রেড ক্রিসেন্ট মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল।