মেইন ম্যেনু

সাবধান! ঢাকার রাজপথে যেকোনো মুহূর্তে আপনিও হয়ে যেতে পারেন মাদক ব্যবসায়ী

ঢাকার রাজপথে যেকেউই যেকোনো সময় ফেঁসে যেতে পারেন তথাকথিত মাদক মামলায়। মুহূর্তেই হয়ে যেতে পারেন মাদক ব্যবসায়ী বা সেবক। আর এর সবই হচ্ছে পুলিশের কিছু অসাধু সদস্যের বদৌলতে।

এত দিন নগরের রাস্তাঘাটে উৎকণ্ঠার প্রধান বিষয় ছিল ছিনতাইকারী, পকেটমার, টানাপার্টি বা মলমপার্টির মতো ছিঁচকে অপরাধী। কিন্তু এখন সময় পাল্টেছে। জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিতকারী পুলিশের কিছু সদস্যের বিরুদ্ধেই উঠেছে নানা অভিযোগ। টহল টিমের নামে পুলিশের কিছু সদস্য নগরীর বিভিন্ন এলাকায় রাস্তাঘাটে পথচারীদের নানাভাবে হেনস্তা করছে। এমন অভিযোগ পুলিশের ঊর্ধ্বতন মহল পর্যন্ত পৌঁছেছে। সম্প্রতি বিভিন্ন গণমাধ্যমেও এ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। অসাধু সদস্যরা প্রকাশ্যেই তল্লাশির নামে পথচারীদের পকেট হাতড়ে টাকা-পয়সা, মোবাইল ফোন নিয়ে নিচ্ছে। যারা এতে উচ্চবাচ্য করছে তাদেরই পকেটে ইয়াবা, গাঁজা গুঁজে দিয়ে মাদক মামলায় ফাঁসানোর হুমকি দিচ্ছে। যারা টাকা দিতে পারছে না তাদের অনেকের বিরুদ্ধে মামলাও দিয়ে দেয়া হচ্ছে মাদকব্যবসায়ী হিসেবে। উঠতি তরুণ, কলেজছাত্র, ব্যবসায়ীরাই এদের প্রধান টার্গেট। অনেক সময় গাড়ি তল্লাশির নামেও গাড়িতে মাদক রেখে মামলা দেয়া হচ্ছে। পুলিশের এ নৈতিক অবক্ষয়ের বিষয়টি ঊর্ধ্বতন মহল অবহিত হলেও অনেক সময় সঠিক প্রমাণের অভাবে ব্যবস্থা নেয়া যাচ্ছে না। অনেকে ঝামেলা এড়াতে পুলিশি ঝামেলায় জড়াচ্ছেন না। এ সুযোগে পুলিশ নামধারী প্রতারকচক্রও প্রতারণার জাল পেতেছে। সম্প্রতি ঢাকায় সংঘটিত বেশ কয়েকটি ঘটনার আলোকে এ প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে।

কেস স্টাডি : এক
তেরো বছরের কিশোর ইমন। জীবিকার তাগিদে মিরহাজীরবাগে একটি মোটরসাইকেল মেরামতের দোকানে হেলপার হিসেবে কাজ করে সে। দিনে আয় এক থেকে দেড় শ’ টাকা। অন্য দিনের মতো ইমন গত শুক্রবার সকালে কামরাঙ্গীরচরের বাসা থেকে কর্মস্থলে রওনা হয়। আনুমানিক সকাল সাড়ে ৯টার দিকে মিরহাজীরবাগের ঘুন্টিঘরে দোকানের সামনে পৌঁছে সে। একই সময় রাস্তায় দাঁড়িয়ে পুলিশের টহল গাড়ি।
গাড়ির সামনে দিয়ে পা বাড়াতেই একজন এসআই ইমনকে ডেকে কাছে নেন। কোথায় বাড়ি, নাম-পরিচয়, কী করা হয় এমন সব খবর নেয়ার পর পকেটে কী আছে জানতে চান পুলিশ। পুলিশের এমন প্রশ্নের মানে কী কিশোরটির বোঝার কথা নয়। একজন কনস্টেবল তল্লাশির নামে কিশোরটির প্যান্টের পকেটে হাত দেয়। কিছুই পাওয়া গেল না। কিশোরটি দোকানের উদ্দেশে সামনে এগোতেই আবারো ডাকা হলো তাকে। কনস্টেবল এবার তার প্যান্টের পকেট থেকে একটি রুমাল বের করে আনলেন। মুহূর্তের মধ্যে কনস্টেবল বলে উঠলেন স্যার পাওয়া গেছে। বলা হলো রুমালে গোঁজা দু’টি গাঁজার পুরিয়া পাওয়া গেছে। কিশোরটিকে গাড়িতে তুলে হ্যান্ডকাফ পরানো হলো।

কিশোরটি ভয়ে কেঁদে ওঠে। জানায়, আমার ওস্তাদ (মোটরসাইকেল মেকানিক) আছে তার কাছে নিয়ে যান। খবর পেয়ে কিছুক্ষণের মধ্যে কিশোরটির ওস্তাদ ছুটে যান পুলিশের গাড়ির সামনে। কিশোরটিকে আটকের কারণ জানতে চাওয়া হয়। পুলিশের এসআই জানালেন শিষ্যের পকেটে গাঁজা পাওয়া গেছে। এখন তাকে ছাড়া যাবে না। মেকানিক পুলিশের উদ্দেশ্য বুঝতে পেরে নাশতা খাওয়ার জন্য প্রথমে পাঁচ শ’ টাকা দিলেন। কিন্তু তাতে কিছুই হবে না বলে জানান এসআই। এক পর্যায়ে মেকানিকের পকেটে থাকা মোট তেরো শ’ টাকাই পুলিশের হাতে তুলে দিলেন এবং ছাড়িয়ে নিলেন শিষ্যকে।

মেকানিক জানালেন, ছাড়িয়ে নেয়ার জন্য পুলিশকে যে টাকা দেয়া হয়েছে, তা ইমনের প্রায় দশ দিনের বেতন। তার চেয়েও বড় কথা হচ্ছে, ইমন প্রতিদিন যে টাকা পায় তা দিয়ে সে বাসার জন্য বাজার কিনে। সেই বাজারেই চলে তার সংসার।

এভাবে পুলিশ টাকা আদায় করতে মাদককে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে। রয়েছে এমন অসংখ্য অভিযোগ। রাজধানীতে তল্লাশির নামে প্রতিদিনই শত শত মানুষ তাদের হয়রানির শিকার হচ্ছেন। টাকা দিতে অস্বীকার করলেই পকেটে ইয়াবা বা গাঁজার পুরিয়া দিয়ে টাকা দিতে বাধ্য করা হচ্ছে নিরীহ লোকজনদের। ভুক্তভোগীরা টাকা দিতে না পারায় মামলার আসামি হলেও মানসম্মানের ভয়ে মুখ খুলতে রাজি হন না।

পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বিষয়টি জানালে তারা সঠিক তদন্তের আশ্বাস দেন। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। আবার অনেক সময় ভুক্তভোগীরা পুলিশের বাড়তি হয়রানি এবং ভয়ভীতি প্রদর্শনের কারণে প্রতিকার না চেয়ে নীরবে সহ্য করেন।

কেস স্টাডি : দুই
রাজধানীর উত্তরায় তুষার নামে বিশ্ববিদ্যালয় পড়–য়া এক ছাত্রকে পুলিশ আটক করে মাদক মামলায় ফাঁসানোর ভয় দেখিয়ে বিকাশের মাধ্যমে তার চাচার কাছ থেকে আট হাজার টাকা আদায় করে। রোববার সন্ধ্যার পর উত্তরা পশ্চিম থানার রাজলক্ষ্মী কমপ্লেক্স ভবনের কাছে এ ঘটনা ঘটে। চাঁদাবাজি করা পুলিশ সদস্য নিজেকে উত্তরা পশ্চিম থানার এসআই জুয়েল বলে পরিচয় দেন। বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র তুষারের চাচা দৈনিক ডেসটিনির সিনিয়র সাংবাদিক। পুলিশকে তিনিই বিকাশের মাধ্যেমে চাঁদা দেন ভাতিজাকে ছাড়াতে। তুষার উত্তরার এশিয়ান ইউনিভার্সিটির ছাত্র।

ভাতিজাকে ছাড়ানোর পর সাংবাদিক কাঞ্চন পাল বাংলাদেশ ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনে এসে অন্যান্য সাংবাদিকদের কাছে বিষয়টি জানান। তিনি বলেন, রোববার সন্ধ্যা ৭টার দিকে তার ভাতিজা তুষার ৯ নম্বর সেক্টরে বাসার কাছেই হাঁটতে বের হয়। ওই সময় উত্তরা পশ্চিম থানার টহল পুলিশের একটি টিম তার ভাতিজাকে আটক করে। টহল টিমের প্রধান একজন এসআই তার ভাতিজাকে আটক করে বলেন, তোমাকে থানায় যেতে হবে। তোমার বিরুদ্ধে অনেক ধরনের অভিযোগ রয়েছে। কী অভিযোগ রয়েছে জানতে চাইলে ওই পুলিশ কর্মকর্তা তার ভাতিজাকে বলেন ভ্যাটবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাথে তুমি যুক্ত আছো, তোমাকে ছাড়া যাবে না। এ ছাড়া মাদকের অভিযোগ রয়েছে বলেও জানান। খবর পেয়ে তিনি ভাতিজাকে আটককারী পুলিশ কর্মকর্তার নম্বরে (০১৬২৮৫৮৯৩৪৮) যোগাযোগ করলে ওই পুলিশ কর্মকর্তা নিজেকে উত্তরা পশ্চিম থানার এসআই জুয়েল পরিচয় দিয়ে বলেন, ওকে তো ছাড়া যাবে না, অনেক ব্যাপার রয়েছে। কী ব্যাপার রয়েছে জানতে চাইলে ওই পুলিশ কর্মকর্তা তার ভাতিজাকে ছাড়তে ১০ হাজার টাকা দাবি করেন। টাকা পাঠানোর জন্য পুলিশ কর্মকর্তা তাকে একটি বিকাশ নম্বর (০১৮৫৭৮৯৭৩৩১) দেন। ওই নম্বরে ৫ হাজার টাকা পাঠানোর প্রস্তাব দিলে ওই পুলিশ কর্মকর্তা তাকে বলেন, আমার সাথে আরো পুলিশ রয়েছে এত কম টাকায় হবে না। যদি আট হাজার টাকার নিচে পাঠান তাহলে তাকে মাদক মামলায় কাল কোর্টে পাঠিয়ে দেবো, আপনারা কোর্ট থেকে ছাড়িয়ে নেবেন। পরে তিনি পল্টনে মেট্রোপলিটন হোটেলের নিচ থেকে বিকাশ এজেন্ট (০১৭৫৫৬৫১৫৪৪) থেকে ৮ হাজার টাকা পাঠালে তুষারকে ছেড়ে দেয় পুলিশ।

ভুক্তভোগী তুষার জানান, তাকে ৯ নম্বর সেক্টরের ৯ নম্বর রোডের কবরস্থানের সামনে থেকে ধরে গাড়িতে তুলে। এ সময় তিনি প্রথমে তার বাবা ও পরে তার চাচা সাংবাদিক কাঞ্চন পালের সাথে যোগাযোগ করেন। পুলিশ তাকে গাড়িসহ রাজলক্ষ্মী কমপ্লেক্সের কাছে নিয়ে গাড়ি কিছুটা দূরে রাখে। গাড়িতে তাকে রেখে পুলিশের এসআই রাজলক্ষ্মী ভবনের নিচে বিকাশ এজেন্ট থেকে টাকা তুলে। তাকে যখন গাড়িতে উঠানো হয় তখন তার পাশে লিটন ও খোকন নামে দু’জন কনস্টেবলকে চিনতে পারলেও এসআই জুয়েল পরিচয়দানকারী পুলিশ কর্মকর্তার পোশাকের ওপরে কোনো নাম লেখা ছিল না। ফলে ওই পুলিশ কর্মকর্তা আসলে জুয়েল কি না সে বিষয়ে নিশ্চিত হতে পারেননি।

এ ব্যাপারে জানতে উত্তরা পশ্চিম থানায় ফোন করলে সোমবার ডিউটি অফিসার শহিদুল জানান, লিটন নামে তাদের থানায় একজন কনস্টেবল রয়েছে। তবে জুয়েল নামে কোনো এসআই নেই। তিনি বলেন, উত্তরা রাজলক্ষ্মী ভবন ও ৯ নম্বর সেক্টর তাদের থানার মধ্যে। তবে খোকন নামে কোন কনস্টেবল নেই। এ ব্যাপারে জানতে উত্তরা পশ্চিম থানার ওই এসআই জুয়েল পরিচয়দানকারী পুলিশ কর্মকর্তার নম্বরে বারবার যোগাযোগ করেও বন্ধ পাওয়া যায়। যোগাযোগ করা হলে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানান, ভুক্তভোগীর অভিযোগ পেলে অপরাধী পুলিশ সদস্যদের শনাক্ত করে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

এ দিকে ঘটনাটি জানাজানি হলে গত মঙ্গলবার সাংবাদিক কাঞ্চনের কাছে তার ভাতিজাকে ছাড়িয়ে নেয়ার জন্য পুলিশকে বিকাশের মাধ্যমে দেয়া সেই ৮ হাজার টাকা ফেরত দেয়া হয় এবং এ ঘটনার জন্য ক্ষমা চাওয়া হয়।

কেস স্টাডি : তিন
গত ৫ সেপ্টেম্বর রাজধানীর গাবতলীসংলগ্ন মাজার রোডে সোহেল (২৫) নামে সিরাজগঞ্জ থেকে আসা এক যাত্রীকে আটক করে পুলিশ। পরে পুলিশ সোর্স তার ব্যাগ তল্লাশি করে। সোর্স তাকে বলে তোর ব্যাগে গাঁজা আছে। পাঁচ হাজার টাকা না দিলে তোকে ছাড়া হবে না। দায়িত্ব পালনে নিয়োজিত পুলিশ সদস্যদের নেমপ্লেট খোলা থাকায় তাদের নাম জানতে পারেননি সোহেল। সোহেল টাকা দিতে অস্বীকার করায় তার প্যান্টের পকেটে ২ পুরিয়া গাঁজা ঢুকিয়ে দেয় এবং তাকে থানায় নিয়ে একাধিক মামলায় জড়ানো হবে বলে আটক করে রাখে। পরে সোহেলের সাথে থাকা ৩ হাজার টাকা দিয়ে সে রক্ষা পায়।

কেস স্টাডি : চার
গত ৭ সেপ্টেম্বর মিরপুর ২ নম্বর সেকশনের একটি চায়ের দোকানের সামনে থেকে তুহিন নামে এক চাকরিজীবীকে আটক করেন মিরপুর থানার এসআই রফিক। পরে তার কাছে টাকা দাবি করেন। তিনি টাকা দিতে অস্বীকার করায় তার পকেটে ১০০ পিস ইয়াবা ঢুকিয়ে দিয়ে মাদক মামলায় ৮ সেপ্টেম্বর আদালতে পাঠিয়ে দেন। আদালত তাকে জেলহাজতে প্রেরণ করেন। মামলায় বলা হয় তুহিনকে ৬ নম্বর সেকশন থেকে আটক করা হয়েছে।

কেস স্টাডি : পাঁচ
গত ২ সেপ্টেম্বর শেরাটন হোটেল সংলগ্ন মূল রাস্তার চেকপোস্টের পাশ দিয়ে রিকশায় যাওয়ার সময় আরমান নামে এক যুবককে রিকশা থেকে নামিয়ে দাঁড় করায় দায়িত্ব পালনকারী পুলিশ সদস্যরা। তার শরীর তল্লাশি করেও কিছু পাওয়া যায়নি। পরে তার মানিব্যাগ নিয়ে যায় এক পুলিশ সদস্য। মানিব্যাগে ৪ পিস ইয়াবা পাওয়া গেছে বলে আরমানকে আটক করে রাখে। পরে তাকে ছেড়ে দেয়ার বিনিময়ে ৫ হাজার টাকা দাবি করা হয়। আরমানের কাছে থাকা তার মায়ের ওষুধের জন্য রাখা ২ হাজার টাকা নিয়ে তাকে কোন দিকে না তাকিয়ে সোজা চলে যেতে বললে ভয় পেয়ে আরমান চলে যান।

প্রতিদিন রাজধানীতে তল্লাশির নামে নিরীহ লোকজন এ ধরনের হয়রানির শিকার হলেও পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের দাবি, এ ধরনের অভিযোগ নিয়ে কেউ থানা বা তাদের কাছে আসছে না। ফলে কোনো ব্যবস্থাও নিতে পারছেন না।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম Prothom-Alo Noksha থেকে নেওয়া