মেইন ম্যেনু

সাবেক ভিসির অনিয়ম : মামলার তিন বছরেও চার্জশীট দিতে পারেনি দুদক

রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) সাবেক উপাচার্য(ভিসি) ড. প্রফেসর আব্দুল জলিল মিয়ার অনিয়ম, দুর্নীতির বিরুদ্ধে মামলার প্রায় তিন বছরেও অভিযোগপত্র (চার্জশীট) দিতে পারেনি দুনীতি দমন কমিশন(দুদক)। গত জুলাই মাসে চার্জশীট প্রদানের কথা থাকলেও অজ্ঞাত কারণে থমকে রয়েছে।

গত ২০১৩ সালের ১২ ডিসেম্বর রংপুর সমন্বিত জেলা কার্যালয় দুদকের উপ-পরিচালক মো. আব্দুল করিম কোতয়ালী থানায় সাবেক ভিসির বিরুদ্ধে নানা অনিয়ম নিয়ে একটি মামলা দায়ের করেন। ২০১৪ সালে তদন্তকারি কর্মকর্তা নিয়োগ প্রদান করা হলেও আড়াই বছরেও তিনি প্রতিবেদন জমা দেননি বলে জানা গেছে ।

মামলার প্রাথমিক তথ্য বিবরণী ও এজাহার সূত্রে জানা যায়, গত ২০১৩ সালের ১২ ডিসেম্বর সেই সময়ের রংপুর জেলার দুদকের উপ-পরিচালক মো. আব্দুল করিম সাবেক উপাচার্য ড. আব্দুল জলিল মিয়ার ২০০৯ সালের ৬ জুলাই থেকে ২০১৩ সালের ৩০ এপিল সংঘটিত নানা অনিয়ম নিয়ে কোতয়ালি থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। মামলায় সাবেক উপাচার্যসহ সে সময়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার (বর্তমানে উপ-রেজিস্ট্রার) মো: শাহজাহান আলী মন্ডলকে অভিযুক্ত করে দায়েরকৃত মামলার অভিযোগপত্রে বলা হয়, ‘পরস্পর যোগসাজসে ও একে অপরকে লাভবান করার অসৎ উদ্দেশ্যে তাঁদের উপর অর্পিত দায়িত্ব ও ক্ষমতার অপব্যবহার করে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়,রংপুর আইন,২০০৯ এর লংঘন করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের(ইউজিসি) নির্দেশ অমান্যপূর্বক বিভিন্ন অনিয়ম কওে ইউজিসি’র অননুমোদিত ৩৮৯ টি পদে লোক নিয়োগ দিয়ে ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২)ধারা এবং দন্ডবিধির ১০৯ ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ করেছেন,- বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়।

মামলার বিবরণীতে,উপ-রেজিস্ট্রার মো. শাহজাহান আলী,উপ-পরিচালক এ.টি.জি.এম গোলাম ফিরোজ,বর্তমান সহকারি পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক মো: ফিরোজুল ইসলাম, সহকারি রেজিস্ট্রার(বর্তমানে রেজিস্ট্রার,অতিরিক্ত দায়িত্ব) মো: মোর্শেদ উল আলম,অর্থ ও হিসাব দপ্তরের রেজাউল করিম শাহ,সহকারি পরিচালক(বাজেট) খন্দকার আশরাফুল ইসলাম, সেকশন অফিসার(গ্রেড-২) সিরাজুম মুনীরাসহ শিক্ষক ড.গাজী মাজহারুল আনোয়ার এবং অন্যান্যদের নিয়োগ,পদোন্নতি,অতিরিক্ত দায়িত্ব প্রদানে বিভিন্ন অনিয়ম তুলে ধরা হয়।

এছাড়াও সাবেক উপাচার্যের দুর্নীতি,অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতির বিরুদ্ধে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন এর পেশকৃত গত ২০১৩ সালের ২৯ জানুয়ারি এক প্রতিবেদনে, উপর্যুক্ত কয়েকজনসহ হিসাব রক্ষণ কর্মকর্তা মাহবুবার রহমান, হিসাব শাখার সহকারি পরিচালক মো: মোত্তালেব হোসেন,উপাচার্যের শ্যালিকার মেয়ে মনিরা খাতুন,মেয়ের বান্ধবী মোছা: তহমিনা আফরোজ ও বন্ধুর মেয়ে স্যুভেনির এর নিয়োগ ও পদোন্নতির অনিয়মও উল্লেখ করা হয়।

উপ-রেজিস্ট্রার মো. শাহজাহান আলীর অতিরিক্ত দায়িত্বের বিষয়ে বলা হয়, ইউজিসির অনুমোদন থাকা সত্বেও বিশ্ববিদ্যালয়ের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ প্রদান না করে অসৎ উদ্দেশ্যে উপ-রেজিস্ট্রার মো: শাহজাহান আলীকে অতিরিক্ত দায়িত্বে রাখা হয়।

এ.টি.জি.এম গোলাম ফিরোজকে ২০ দিনের ব্যবধানে দুটি পদে এডহক(অস্থায়ী) নিয়োগ দেওয়া হয়। প্রথমে ৯ম গ্রেডে সি টু পিডি আবার ২০ দিন পর কোনো বিজ্ঞপ্তি ও যাচাই বাছাই ছাড়াই ৫ম গ্রেডে উপ-পরিচালক(পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) পদে কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা ছাড়াই নিয়োগ প্রদান করা হয়।

মো: ফিরোজুল ইসলামকে ক্ষমতার অপব্যবহার কওে চুক্তিভিত্তিক ৩য় শ্রেণির কর্মকর্তা/কর্মচারি হিসেবে নিয়োগ প্রদান করার পর পুনরায় সরাসরি ৭ম গ্রেডে সহকারি পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক পদে নিয়োগ প্রদান করা হয়।

মো: মোর্শেদ উল আলমকে ০৩/০৪/২০০৯ তারিখে প্রকাশিত নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির ৫(পাঁচ) বছরের অভিজ্ঞতার শর্ত উপেক্ষা করে সহকারি রেজিস্ট্রার (শারীরিক শিক্ষা,স্থায়ী) পদে নিয়োগ প্রদান করা হয়। উল্লেখ্য যে, বিজ্ঞপ্তিতে দ্বিতীয় শ্রেণির ¯œাতক সম্মানসহ দ্বিতীয় শ্রেণির মাস্টার্স ডিগ্রী ও সরকারি/বেসরকারি/স্বায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠানে অন্যূন ৫ বছরের অভিজ্ঞতা এবং কম্পিউটার পরিচালনায় বাস্তব অভিজ্ঞতার শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়।

গত ১২তম সিন্ডিকেটের ৮(খ) সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে সহকারি পরিচালক (অর্থ ও হিসাব) পদে আবেদনের ক্ষেত্রে বয়সসীমা ৩৫ বছর এবং হিসাব রক্ষণ কর্মকর্তা পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে ¯œাতকোত্তর পাশ উল্লেখ থাকলেও অনিয়মের উদ্দেশ্যে ৯/১২/১১ তারিখে প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তিতে সহকারি পরিচালক (অর্থ ও হিসাব) পদে নিয়োগের বয়সসীমা ৪০ বছর করে মো: রেজাউল করিম শাহকে নিয়োগ প্রদান করা হয়।
রেজাউল করিমকে হিসাব রক্ষক পদে এডহক দেখিয়ে উক্ত পদে নিয়মিত না করেই অভ্যন্তরীণ প্রার্থী দেখিয়ে বয়স(৪২ বছরের উর্দ্ধে থাকলেও) ও অভিজ্ঞতার শর্ত ভঙ্গ করে সহকারি পরিচালক পদে নিয়োগ প্রদান করা হয়। এডহক নিযুক্তির পূর্বের সময়কে নিয়মিত চাকুরীকাল গণ্য করে উচ্চতর স্কেল প্রদান করা হয়।

খন্দকার আশরাফুল ইসলামকে হিসাব রক্ষণ কর্মকর্তা পদে এডহক নিয়োগ দিয়ে পওে অভিজ্ঞতা ও বয়সসীমা সংক্রান্ত নিয়োগ শর্ত শিথিল করে সহকারি পরিচালক(বাজেট) পদে নিয়মিত করা হয় এবং একইভাবে উচ্চতর স্কেল প্রদান করা হয়।

২৬তম সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্ত লংঘন করে ২০ জন প্রার্থীকে অস্থায়ীভাবে নিয়োগ প্রদানের জন্য তাদেরকে তালিকাভুক্ত করার সিদ্ধান্তের ব্যত্যয় ঘটিয়ে ২১ জনকে তালিকাভুক্ত করে সিরাজুম মুনীরাকে সেকশন অফিসার (গ্রেড-২) এর স্থায়ী পদে নিয়োগ প্রদান করা হয়।
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়,রংপুর আইন,২০০৯ [২৭-(১)] North Bengal Institute of Development Studies (NIDS) -কে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভূক্ত করা হয় বলেও মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়।

মামলার এজাহারে উল্লিখিত অভিযুক্তের তদন্ত প্রতিবেদন প্রদানের বিষয়ে জানতে চাইলে তদন্তকারি কর্মকর্তা আকবর হোসেন বর্তমানে উপ-পরিচালক (মো: মোজাহার হোসেন) কে জিজ্ঞেস করতে বলেন। তিনি বলেন, ‘আমার তথ্য দেওয়ার অধিকার নাই।’ উপ-পরিচালক হজ্জে যাওয়ায় তাঁর দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আমিরুল ইসলামকে চার্জশীট প্রদানের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘উনি (তদন্তকারি কর্মকর্তা আলী আকবর ) এখনও তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেন নি। জমা দিলেই বোঝা যাবে কাকে আসামী করা হয়েছে।’ যতদূর সম্ভব মোজাহার হোসেন হজ্জ থেকে ফিরে আসলে অভিযোগপত্র (চার্জশীট) প্রদান করা হবে বলে জানান এই কর্মকর্তা।

উল্লেখ্য যে, উক্ত মামলার অভিযোগ তদন্তের জন্য তদন্তকারি কর্মকর্তা হিসেবে আলী আকবর নামের একজনকে ২০১৪ সালের এপ্রিলে নিয়োগ দেওয়া হয়। কিন্তু আজ পর্যন্ত তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেন নি তিনি। এমনকি বর্তমান উপাচার্যের বিরুদ্ধেও উপর্যুক্ত কয়েকজনসহ অন্যান্যদের ব্যাপারে নিয়ম বহির্ভূতভাবে পদোন্নতি প্রদান ও আটকে দেওয়া এবং বিভিন্ন স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগ উঠেছে। সাবেক উপাচার্যের হাত ধরে বর্তমান উপাচার্য ড. এ কে এম নূর-উন-নবীও অধিক অনিয়মের বেড়াজালে লিপ্ত রয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।



« (পূর্বের সংবাদ)