মেইন ম্যেনু

সারাদিনে আমাকে একাধিকবার বিক্রি করা হত! বাড়ি ফিরতে চাইতাম, কিন্তু…

আমি রোজই নরকযাত্রা করতাম। মরতে মরতেও ফিরে আসতাম জীবনের টানে। বাড়ির কথা ভেবে আমার প্রাণভোমরাটা যেন আটকে থাকত। ক্লান্ত হয়ে পড়ত আমার শরীর। মুচড়ে মুচড়ে বেরিয়ে আসত যন্ত্রণা। কিন্তু, আমি জানতাম একদিন আমি বাড়ি ফিরবই। দেখতে পাব আমার মা-দাদা-বউদিদের।’

(পূর্ব কাহিনি— ‘‘৫ মাস কেটে গিয়েছে। দিল্লিতে অমানুষিক নির্যাতনের শিকার মগরাহাটের সাহসিনী। সাড়ে ষোলো বছরের মেয়েটা বুঝে গিয়েছে নারী শরীরের মানে কী। তবু লড়াই ছাড়েনি সে। আজও বাড়িতে ফিরতে চায়। একদিন সুযোগ পেতেই বাড়িতে ফোন করে বসেছিল। কিন্তু, আসলাম তা জানতে পেরে বেধড়ক মারধর করে সাহসিনীকে। এখানেই শেষ হয়নি অত্যাচার। মারধরে ক্লান্ত হয়ে আসলাম এর পরে রক্তাক্ত সাহসিনীকে সারারাত ধরে ধর্ষণ করে। কিন্তু, ফের বাড়িতে ফোন করে সে। তবে এবার আর আসলাম জানতে পারে না। তার পর…)

হোটেলের ঘরে আমি আর একটা লোক। কেমন অসুরের মতো দেখতে। লুঙ্গি আর স্যান্ডো গেঞ্জি পরে বসে আছে। বিছানার উপর পানীয়ের বোতল। ঘরটা খুব নোংরা না-হলেও, খুব পরিষ্কার নয়। হোটেলের ঘরে আমাকে ঠেলে দিয়েই আসলাম দরজা ভেজিয়ে চলে গিয়েছিল। লোকটা দাঁত বার করে হাসতে হাসতে এগিয়ে আসছিল। আমি ভয়ে পা দু’টো প্রাণপণে জোড়া লাগিয়ে দরজার সামনেই দাঁড়িয়েছিলাম। লোকটা যত এগোচ্ছিল, ততই আমি চোখ মেঝের দিকে নামিয়ে নিচ্ছিলাম। লোকটা আমার পাশ দিয়ে গিয়ে দরজা ছিটকানি এঁটে দিল। গলাটা আতঙ্কে বুজে আসছিল। যদিও এই ধরনের পরিস্থিতি আমার কাছে নতুন ছিল না। গত ৫ মাসে আমি এর থেকেও ভয়ঙ্কর সব পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছিলাম। আমার আতঙ্ককে দাবিয়েই আমার শরীর নিয়ে সারারাত ধরেই চলেছিল লোফালুফি। যন্ত্রণায় কাতরে যাওয়া ছাড়া আমার কাছে তখন আর কোনও মুক্তির রাস্তা খোলা থাকত না। সুতরাং, আমি জানতাম এই ঘরে আর কিছুক্ষণে মধ্যে কী ঘটতে চলেছে।

দিনকয়েক আগে বাড়িতে ফোন করায় আসলাম আমাকে বেধড়ক মারধর করেছিল। সেই মারের সুপ্ত ব্যাথাগুলো ফের যেন চাগাড় দিয়ে উঠল। হাঁটুতে জমে থাকা রক্তে যেন মনে হচ্ছে কেউ আস্ত ইনজেকশন লাগিয়ে দিয়েছে। যন্ত্রণায় আমি পারছি না। আমি ক্রমেই ঘামছিলাম। লোকটা বিছানায় ফিরে গিয়ে হিন্দিতে কী বলছিল, আমার মাথায় আসছিল না। শুধু বুঝলাম, আমাকে বিছানায় ডাকছে। আমি নড়লাম না আমার জায়গা থেকে। কিছুক্ষণের মধ্যে লোকটা নিজেই উঠে চলে এল আমার কাছে। আমার মুখটা টিপে ধরে বলল, ‘‘কী রে! তোঁকে ডাকছি তো।’’ (ওই চন্দ্রবিন্দুটা দিয়েই কথা বলত, একটু নাকি সুরে) আমি তবু মুথ তুললাম না। লোকটা ওখান থেকেই আমাকে কোলে করে বিছানায় তুলে নিয়ে গেল। লোকটার যা বয়স তাতে আমাদের বাড়ির পাশের কাকুর বয়সি মনে হল। বয়সের গণ্ডি আমার উপর নৃশংস অত্যাচারকে থামাতে পারল না। ঘণ্টাখানেক পরে লোকটা নিজেই হাঁফিয়ে বিছানা থেকে উঠে গেল। দরজায় আওয়াজ হতেই ছিটকিনি খুলে দিল সে। আসলাম ঘরে এসে বলল- ‘‘জামাকাপড় পরে নে, বেরোতে হবে।’’ লোকটার কাছ থেকে কড়ায়গণ্ডায় টাকা গুনে নিল আসলাম।

শরীর আমার ক্লান্ত। পারছি না। মোটর বাইকের পিছনে বসে আছি। গ্রীষ্মের চাঁদিফাটা রোদ্দুর আমার ক্লান্তিকে আরও কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিল। এক গ্রাহকের কাছে কাজ শেষ। এবার দ্বিতীয় গন্তব্যস্থল। আমি জানি আজ এভাবেই সারাদিন আমাকে ঘুরতে হবে। অন্তত ২৫ থেকে ৩০ জন খদ্দের খেলা করবে আমার শরীর নিয়ে। পারছি না। কিন্তু, বলব কাকে? খালি খেয়াল পড়ছে বাড়ি-মা-বাবা-দাদা-বউদিদের কথা। মনে পড়ছে আমার ফেলে আসা স্কুল আর ক্লাসের কথা। কে জানে কবে আবার পড়াশোনা করতে পারব। আশা হারাইনি। এখনও মনে হয় বাড়ি ফিরতে আমি পারবই। আমাকে চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। প্রাণ থাকার শেষ নিঃশ্বাসটুকু পর্যন্ত আমি লড়াই ছাড়ব না। ফিরতেই হবে মগরাহাটে আমার বাড়িতে।এবেলা