মেইন ম্যেনু

সার্ক বয়কট : প্রতিবেশীদের যেভাবে রাজি করালো ভারত

গত মঙ্গলবার, ২৭ সেপ্টেম্বর দিল্লিতে বিকাল চারটা বেজেছে তখন। চাণক্যপুরীতে বাংলাদেশ হাইকমিশনে জরুরি ফোন এলো ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বা সাউথ ব্লক থেকে।

রাষ্ট্রদূতকে করা সেই ফোনের বক্তব্য ছিল খুবই চাঁছাছোলা ও পরিষ্কার। ভারত স্থির করেছে নভেম্বরে ইসলামাবাদে যে সার্ক শীর্ষ সম্মেলন হওয়ার কথা, সেটা তারা বয়কট করবে। দিল্লি চায়, বাংলাদেশও এই সিদ্ধান্তে শরিক হোক।

আর শুধু বাংলাদেশই নয়, বিকাল চারটা থেকে পাঁচটার মধ্যে সেদিন একে একে ফোন করা হলো ভুটান, নেপাল, আফগানিস্তান, শ্রীলঙ্কা আর মালদ্বীপের দূতাবাসেও। অর্থাৎ, পাকিস্তান ছাড়া সার্কের বাকি সব সদস্য দেশকেই।

সব ফোনের বক্তব্য একই- সার্ক সামিট বয়কট করার সিদ্ধান্তে ভারত চায় তাদের সমর্থন। ভারত-শাসিত কাশ্মীরের উরিতে জঙ্গি হামলায় আঠারোজন ভারতীয় সেনা নিহত হওয়ার পর পাকিস্তানকে কূটনৈতিকভাবে কোণঠাসা করার চেষ্টাতেই যে এই পদক্ষেপ, পরিষ্কার করে দেওয়া হয়েছিল সেটাও।

সার্কের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কটা অন্য সব সদস্য দেশের তুলনায় যে একটু বেশিই গভীর, তা সবারই জানা। বস্তুত দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোকে নিয়ে এই আঞ্চলিক জোটের জন্ম বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকাতেই, ১৯৮৫ সালে।

তারও আগে সার্কের মতো একটি আঞ্চলিক প্ল্যাটফর্মের প্রস্তাবনাও প্রথম করেছিলেন বাংলাদেশের জিয়াউর রহমান।১৯৭৭ সালে ভারত সফরে এসে দিল্লিতে তৎকালীন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী মোরারজি দেশাইয়ের কাছে এধরনের জোটের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন তিনিই।

সার্ক গঠনের ব্যাপারে প্রাথমকিভাবে যথেষ্ট দ্বিধা ছিল ভারতের, এমন কি পাকিস্তানেরও, কিন্তু মূলত বাংলাদেশের উদ্যোগেই আশির দশকের মাঝামাঝি সেই স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নেয়। দিল্লি ও ইসলামাবাদকে এ ব্যাপারে রাজি করাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে ঢাকা।

কিন্তু পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্কে সম্প্রতি এতটাই অবনতি হয়েছে যে, বর্তমান বাংলাদেশ সরকার সেই সার্ককেও প্রত্যাখ্যান করতে দ্বিধা করবে না, এটা মোটামুটি ভারতের হিসেবেই ছিল।

দিল্লিতে বাংলাদেশের হাইকমিশনার সৈয়দ মোয়াজ্জেম আলী অবশ্য সেদিন সঙ্গত কারণেই সাউথ ব্লককে সঙ্গে সঙ্গে কোনও কথা দিতে পারেননি, তবে দিল্লির সেই বার্তা তিনি তৎক্ষণাৎ পাঠিয়ে দিয়েছিলেন যথাস্থানে।

এবং সার্ক শীর্ষ সম্মেলন থেকে দূরে থাকার কথা ভারত যখন আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করলো, তার কয়েক ঘন্টার মধ্যেই ঢাকায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকেও বিবৃতি এলো –বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে পাকিস্তানের অবাঞ্চিত হস্তক্ষেপের প্রতিবাদে তারাও ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিতব্য নভেম্বরের সার্ক সম্মেলনে যোগ দেবে না।

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্রের মতে, ‘গত মাসে পাকিস্তানে সার্ক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকে যেখানে ভারতের হয়ে রাজনাথ সিং গিয়েছিলেন, সেখানেও কিন্তু বাংলাদেশ তাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে পাঠায়নি। ফলে আমাদের অনুমান ছিল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও সম্ভবত সামিট বর্জন করবেন, তবে তারপরেও তারা যেভাবে প্রায় সঙ্গে সঙ্গে আমাদের অনুরোধে সাড়া দিয়েছে তাতে আমরা সত্যিই তাদের কাছে অত্যন্ত কৃতজ্ঞ।’

ওই কর্মকর্তা আরও জানিয়েছেন, ‘আমরা খবর পাচ্ছিলাম সামিট শেষ পর্যন্ত হলেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সম্ভবত নিজে না গিয়ে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদকে সেখানে পাঠাবেন। কিন্তু উরিতে জঙ্গি হামলার পর এই গোটা সামিট কিছুতেই অর্থবহ হতে পারে না বলে আমরা মনে করেছি, আর বাংলাদেশও এই মূল্যায়নে সম্পূর্ণ একমত হয়েছে।’

তবে ঘটনা হলো, ভারতের সার্ক বয়কটের আহ্বানে বাংলাদেশেরও আগে যে দেশটি সাড়া দিয়েছে সেদেশটি হলো আফগানিস্তান। নেপালে সার্কের সচিবালয়ে শীর্ষ সম্মেলনে যোগদানে অপারগতার প্রথম যে বার্তাটি পৌঁছায়, সেটি কাবুল থেকেই এসেছিল।

কাবুল জানায়, ‘আফগানিস্তানে সন্ত্রাসবাদ আরোপ করার’ প্রতিবাদেই তাদের এই সিদ্ধান্ত। তারপর একে একে এসে পৌঁছায় দিল্লি, ঢাকা ও থিম্পু থেকে সার্ক সামিট বয়কট করার বার্তা।

নেপাল সার্কের বর্তমান চেয়ারম্যান। ফলে তাদের পক্ষে আগ বাড়িয়ে সামিট বয়কটের ঘোষণা দেওয়া সহজ ছিল না। তবে সম্প্রতি কাঠমাণ্ডুতে কে পি ওলি-র সরকার বিদায় নিয়ে সাবেক মাওবাদী নেতা প্রচণ্ড-র নেতৃত্বে যে সরকার ক্ষমতায় এসেছে, তারা ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক তৈরিতে যে অনেক বেশি যত্নবান তাতে কোনও সন্দেহ নেই।

সেই নেপালও অবশেষে রবিবার আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেছে, ‘সার্কের কোনও সদস্য দেশই যেন তাদের ভূখণ্ডকে সন্ত্রাসবাদের জন্য বা অন্তঃসীমান্ত সন্ত্রাসে ব্যবহার না-করে।’ কোনও দেশের নাম না-করা হলেও এই বক্তব্যের উদ্দেশ্য কারা, তা বোঝা কঠিন নয়।

ইতোমধ্যে প্রথম দু-তিনদিন নীরব থাকলেও শ্রীলঙ্কা ও মালদ্বীপও সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে, বর্তমান পরিস্থিতিতে সার্ক শীর্ষ সম্মেলনে যোগদানের কোনও অর্থই হয় না। ফলে পাকিস্তানও বাধ্য হয়ে সম্মেলন স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আর নেপাল সেটা সব সদস্য দেশকে এর মধ্যে জানিয়েও দিয়েছে।

এই গোটা প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে ভারতের কিছুটা কূটনৈতিক বিজয় হয়তো অর্জিত হলো। কিন্তু পাশাপাশি এটাও সত্যি যে সার্ক ভাবনার জন্মদাতা যে বাংলাদেশ, তাদেরকেও কিন্তু সেই মঞ্চকে প্রত্যাখ্যানের উদ্যোগে শরিক হতে হলো।

‘হ্যাঁ, সার্ক বয়কট করতে আমাদের খারাপ লেগেছে ঠিকই। কিন্তু পাকিস্তানকেও বুঝতে হবে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বাংলাদেশের কাছে একটি তীব্র আবেগের বিষয়। কোটি কোটি মানুষের প্রাণের দাবি। সেব্যাপারে অন্যায়ভাবে নাক-গলিয়ে, ফাঁসির আসামিদের সমর্থনে বিবৃতি দিয়ে তারাই কিন্তু আমাদের আজ এই অবস্থার দিকে ঠেলে দিয়েছে।’ নাম প্রকাশ না-করার শর্তে এসব কথা বলেছেন বাংলাদেশের এক শীর্ষস্থানীয় কূটনীতিক।খবর বাংলা ট্রিবিউনের।