মেইন ম্যেনু

সালমানের সাজা, আম্বানির ছেলের দুই খুন মাফ!

বহুল আলোচিত আঘাত করে পালিয়ে যাওয়া (হিট অ্যান্ড রান) মামলায় সাজা পেয়েছেন বলিউডের সুপারস্টার সালমান খান। দীর্ঘ ১৩ বছর ধরে চলা এই মামলার রায়ে অবশেষে কারাদণ্ড হয়েছে তাঁর। তবে ঠিক একই রকম একটি ঘটনা এখনো ঝুলে আছে। না হয়েছে তদন্ত, আর না রাখা হয়েছে মামলার খোঁজখবর। এই আসামির নাম আকাশ আম্বানি, ভারতের ধনকুবের মুকেশ আম্বানির ছেলে।

দুর্ঘটনায় দুজন মারা গেছে-এমন খবর ছড়িয়ে পড়ার আগেই তা গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে মুছে ফেলার খবরও পাওয়া গেছে। ঘটনার কয়েকদিনের মধ্যে পাল্টে গেছে ক্ষতিগ্রস্তদের জবানবন্দিও।

ঘটনার প্রায় দেড় বছর পর এই মামলার অগ্রগতি দেখলে মনে হতেই পারে, ধনকুবেরের ছেলের জন্য দুই খুন মাফ করে দিতে পারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

সালমান খান থেকে আকাশ আম্বানি

২০০২ সালে মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালিয়ে কয়েকজনকে হতাহত করার ঘটনায় বলিউডের নায়ক সালমান খানতে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন মুম্বাইয়ের একটি আদালত। এই রায় ঘোষণার আগে নাটকীয়ভাবে দৃশ্যপটে আসেন সালমানের গাড়িচালক অশোক সিং। তিনি দাবি করেন, যখন ওই দুর্ঘটনা ঘটে, তখন চালকের আসনে সালমান নয়, ছিলেন অশোক। তবে আদালত অশোক সিংয়ের এই দাবি প্রত্যাখ্যান করে সালমান খানকেই দায়ী করেন।

২০১৩ সালের ৮ ডিসেম্বর মুম্বাইতে ঠিক একই রকমের একটি ঘটনা ঘটে। ভারতের শিল্পপতি মুকেশ আম্বানির ছেলের বিরুদ্ধেও আঘাত করে পালিয়ে যাওয়ার অভিযোগ ওঠে। তবে ভারতের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তির ছেলে হওয়ায় পুরো ঘটনাটিই ধামাচাপা দেওয়া হয়েছে এক প্রতিবেদনে দাবি করেছে তেহেলকা। এ বিষয়ে একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন করেছে তেহেলকা ডটকম।

ঘটনার দিন সাড়ে চার কোটি টাকা দামের অ্যাস্টন মার্টিন র‍্যাপিড মডেলের স্পোর্টস কার চালাচ্ছিলেন আকাশ আম্বানি। একসময় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন তিনি। এরপর তাঁর স্পোর্টস কারটি আরো একটি বিলাসবহুল গাড়ি এবং হুন্দাই ইলানট্রাকেও আঘাত করে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, এই দুর্ঘটনার পর একজন স্বাস্থ্যবান চালককে ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যেতে দেখেছেন তাঁরা।

এই ঘটনার পর ওই রাতের প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য নিতে পুরো ১২ ঘণ্টা দেরি করে পুলিশ। পরদিন ভোর সাড়ে ৫টায় এফআইআর দায়ের করা হয়।

এর পরদিন ঠিক সালমান খানের ঘটনার মতোই আরেকটি ঘটনা ঘটল। আকাশ আম্বানির ড্রাইভার বংশীলাল জোশি দাবি করলেন, যখন দুর্ঘটনাটি ঘটেছে তখন চালকের আসনে বসে ছিলেন তিনি নিজেই।

সেদিন যা ঘটেছিল

ডিসেম্বর মাসের রাত। দক্ষিণ মুম্বাই শহরতলির পেদার রোড দিয়ে যাচ্ছিল একটি অ্যাস্টন মার্টিন র‍্যাপিড মডেলের স্পোর্টস কার। যাকে অনুসরণ করছিল নিরাপত্তারক্ষীদের আরো দুটি গাড়ি। হঠাৎ নিয়ন্ত্রণ হারান অ্যাস্টন মার্টিন গাড়ির চালক। ধাক্কা দেন একই পথে চলতে থাকা অডি গাড়িকে। এরপর গিয়ে ধাক্কা দেয় রাস্তার পাশে পার্ক করে রাখা হুন্দাই ইলান্ট্রা গাড়িকে। ঘটনার পরপরই অ্যাস্টন মার্টিনের চালক তাঁকে অনুসরণ করা নিরাপত্তারক্ষীদের গাড়িতে করে পালিয়ে যান।

এর পরদিন অডি গাড়ির চালক ফোরাম রুপারেল তাঁর জবানবন্দি দেন। তিনি জানান, তাঁর গাড়িকে ধাক্কা দেওয়ার সময় অ্যাস্টন মার্টিনটি চালাচ্ছিলেন একজন যুবক। যাঁর চেহারার বর্ণনা ভীষণভাবে আকাশ আম্বানির সঙ্গে মিলে যায়। কিন্তু এর পরদিন আম্বানিদের দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত কর্মী ৫৫ বছর বয়সী বংশীলাল জোশি, যাঁর ওজন প্রায় ১০০ কেজি তিনি পুলিশের কাছে যান এবং বলেন, চালকের আসনে তিনিই ছিলেন। দুর্ঘটনার জন্য তিনিই দায়ী। সাড়ে চার কোটি টাকা দামের গাড়িটির নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অংশ হিসেবেই সেটিকে নিয়ে বের হয়েছিলেন তিনি।

নিহত হন দুজন?

অসমর্থিত সূত্রের বরাত দিয়ে তেহেলকা ডট কম জানায়, পেদার রোডের ওই দুর্ঘটনায় দুজন ব্যক্তি নিহত হন বলে সে সময় বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও কিছু গণমাধ্যমে খবর আসে। তবে ঘটনা ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে ওই সব সংবাদের লিংকগুলো আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। যেসব ওয়েবসাইট এগুলো প্রকাশ করেছিল, সেখান থেকেও সংবাদগুলো মুছে দেওয়া হয়। রিলায়েন্স তাদের সমস্ত শক্তি ও ক্ষমতা ব্যবহার করে এই দুর্ঘটনা সংক্রান্ত খবরগুলো মুছে দেয়। এমনকি এই ঘটনার কোনো তদন্ত বা অগ্রগতিও পর্যবেক্ষণ করা হয়নি। ফলে ধীরে ধীরে জনগণের মন থেকে ঘটনাটি মুছে যেতে থাকে।

ভয়াবহ ওই দুর্ঘটনার পর প্রত্যক্ষদর্শীরা জবানবন্দি দিলেও নয়দিন পার হয়ে গেলেও গ্রেপ্তার করা হয়নি কাউকে। অথচ এর কিছুদিন আগেই গাড়িটিকে সবশেষ দেখা গিয়েছিল ক্রিকেট তারকা শচীন টেন্ডুলকারের সম্মানে মুকেশ আম্বানির দেওয়া উৎসবে। সেখানে গাড়িটিতে আকাশ আম্বানিও উপস্থিত ছিলেন।

মুকেশ আম্বানির ব্যবসাপ্রতিষ্ঠার রিলায়েন্স গ্রুপের একজন মুখপাত্র জানান, দুর্ঘটনার ফলাফল এত বেশি মারাত্মক ছিল না এবং চালকও ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যাননি। তবে চালক জোশি আসলেই দোষী কি না, তা নিয়ে সন্দেহ থাকায় পুলিশ তাঁকেও গ্রেপ্তার করেনি। এ ছাড়া স্থানীয় ক্যাডবেরি জংশনে থাকা সিসিটিভির ফুটেজেও চালকের স্পষ্ট চেহারা ধরা পড়েনি।

বিভিন্ন গণমাধ্যমে আসা প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, জোশী পুলিশকে জানিয়েছেন, তিনি সাধারণত আকাশের গাড়ি চালান। ওই দিন ঘটনার পর আকাশ ভয় পেয়ে যান এবং নিরাপত্তারক্ষীদের গাড়িতে চড়ে বসেন।

ক্ষতিগ্রস্তের জবানবন্দি পরিবর্তন

দুর্ঘটনার এক সপ্তাহ পর ক্ষতিগ্রস্ত গাড়ি দুটির একটির চালক রুপারেল দায়ী চালক হিসেবে শনাক্ত করলেন ৫৫ বছর বয়সী বংশীলাল জোশীকে। একই সঙ্গে রিলায়েন্সের এক মুখপাত্র ফোর্বস ম্যাগাজিনকে জানালেন, অ্যাস্টন মার্টিন আম্বানিদের পারিবারিক গাড়ি এবং জোশীই এর চালক। আর দুর্ঘটনার দিন জোশীই চালকের আসনে ছিলেন।
অথচ দুর্ঘটনার পরদিন এই রুপারেলই পুলিশকে বলেছিলেন, গাড়ি চালাচ্ছিলেন এক যুবক।

ক্ষতিগ্রস্ত গাড়ির বদলে নতুন মডেলের গাড়ি

সে বছরের ২৬ ডিসেম্বর মুম্বাইভিত্তিক একটি সংবাদপত্র একটি চমকপ্রদ খবর প্রকাশ করে। তারা জানায়, দ্রুতগতিতে আসা অ্যাস্টন মার্টিনের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত গাড়ি দুটির মালিককে নতুন দুটি গাড়ি দিয়েছে রিলায়েন্স গ্রুপ। এদের মধ্যে অডি গাড়ির মালিককে দেওয়া হয় নতুন অডি এ-সিক্স মডেলের গাড়ি আর হুন্দাই-এর মালিক পান নতুন স্কোডা সুপার্ব মডেলের গাড়ি। এমনকি গাড়ি দুটির মালিকরা এই মামলা চালানোর ক্ষেত্রে আর আগ্রহী নন বলেও জানিয়ে দেন পুলিশকে।

তবে এনডিটিভির এক প্রতিবেদনে জানা যায়, রুপারেল জানিয়েছেন, রিলায়েন্স গ্রুপ থেকে তাঁকে কোনো ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়নি। আর নতুন অডি গাড়িটি তিনি ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি থেকে পেয়েছেন। আর ইকোনমিক টাইমস জানায়, ইন্স্যুরেন্স প্রতিষ্ঠানটি এ কথা অস্বীকার করেছে। এমনকি ক্ষতিগ্রস্ত গাড়ির বদলে নতুন মডেলের গাড়ি দেওয়ার কোনো প্রশ্নই ওঠে না বলেও জানিয়েছে তারা।

অমীমাংসিত যত প্রশ্ন

যেভাবেই ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়া হোক না কেন, এ ঘটনার ক্ষেত্রে কিছু প্রশ্নের উত্তর আজও রহস্যই রয়ে গেছে।

প্রথমত, বংশীলাল জোশি নিজে দায় স্বীকার করার পরও পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করেনি। কারণ পুলিশ এ ব্যাপারে নিশ্চিত হতে পারছে না। এখন প্রশ্ন হলো, একজন ড্রাইভার নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অংশ হিসেবে রাতে গাড়ি নিয়ে রাস্তায় বের হয়েছে, আর তাঁকে অনুসরণ করছে নিরাপত্তারক্ষীদের দুটি গাড়ি। এই বিষয়টি কতটুকু বিশ্বাসযোগ্য?

দ্বিতীয়ত, এত দ্রুতগতিতে গাড়ি চালানোর অপরাধে কেন এর চালককে জরিমানা করা হয়নি?

আর সবশেষ প্রশ্ন হলো, যদি রিলায়েন্স কিংবা ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি কেউই ক্ষতিপূরণ হিসেবে নতুন গাড়ি দিয়ে না থাকে, তাহলে কে সেই দয়ালু তৃতীয় ব্যক্তি যিনি বড়দিনের উপহার হিসেবে ক্ষতিগ্রস্ত গাড়ির মালিকদের নতুন গাড়ি উপহার দিলেন?



« (পূর্বের সংবাদ)