মেইন ম্যেনু

সাহসী পুলিশ কর্মকর্তা শামসুন্নাহারের সেই দিনটি…

খবরটি জেনেই অভিনন্দন জানানোর ইচ্ছে ছিল। কিন্তু ফোন দিলাম প্যারেড শেষ হয়ে যাওয়ার পরদিন এই বলে, ‘অভিনন্দন বন্ধু। পুলিশ সপ্তাহের প্যারেডে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য। নারী হিসেবে তোমার এ অর্জন অনন্য। আমরা যারা তোমার সহপাঠী ছিলাম, গর্বে তাদের বুকটা স্ফিত হয়ে গেছে অনেক।’ ফোনের অপর প্রান্ত থেকে বন্ধুটির হাসির শব্দই ভেসে আসল। প্রাণোচ্ছল হাসিই বলে দেয় বন্ধুটি পুলিশ প্যারেডে নেতৃত্ব দেওয়ার সুযোগ পেয়ে খুশি। এমন একটি অর্জনে কে খুশি হবে না বলুন! তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে এসব গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে ওঠতে যেখানে ছেলেদেরই অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়, সেখানে একজন নারীর ওই পর্যায়ে যাওয়াটা কিন্তু কম অর্জন নয়। অসীম সাহসিকতা, কঠোর অধ্যবসায়, মেধা আর দৃঢ় মনোবল না থাকলে কারও পক্ষেই এমন চূড়ায় ওঠা সম্ভব নয়।

এতক্ষণ যার কথা বলছিলাম তিনি হলেন শামসুন্নাহার। চাঁদপুর জেলা পুলিশ সুপার (এসপি)। ২৬ জানুয়ারি পুলিশ সপ্তাহ উপলক্ষে ঢাকায় প্রধানমন্ত্রীর সামনে যে প্যারেড হলো, তাতে নেতৃত্ব দিয়ে শামসুন্নাহার একটি রেকর্ডের অধিকারী হলেন। তিনি প্রথমবারের মতো কোনো নারী কর্মকর্তা হিসেবে বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীর ইতিহাসে পুলিশ সপ্তাহের প্যারেডে নেতৃত্ব দিলেন। যতদিন বাংলাদেশ থাকবে, বাংলাদেশ পুলিশ থাকবে, ততদিন তার নাম রেকর্ড বুক-এ অক্ষয় হয়ে থাকবে। শামসুন্নাহারের সহপাঠী হিসেবে আমাদের অহঙ্কার-শ্লাঘাটি এখানেই। আমাদেরই একজন ক্লাসমেট, যিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাদেরই সঙ্গে একই সিলেবাসে পাঠ নিয়েছেন, একই ক্যাম্পাসে ঘুরেছেন, হলের একই মানের খাবার খেয়েছেন, একই লাইব্রেরিতে পাঠ্যবই অধ্যয়ন করেছেন। অথচ তিনি আজ আলাদা, আপন মহিমায় ভাস্বর।

শামসুন্নাহারকে নিয়ে আমি যে অভিব্যক্তি প্রকাশ করলাম, তা আমার একার নয়। অন্য সহপাঠীরাও দেখলাম একইভাবে গর্বভরা সম্ভাষণ জানাচ্ছেন শামসুন্নাহারকে। পুলিশ সদর দপ্তর থেকে যখন সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে মিডিয়ায় জানিয়ে দেওয়া হলো যে, শামসুন্নাহারের মতো কোনো নারীর নেতৃত্বে পুলিশ বাহিনীর ইতিহাসে এই প্রথম পুলিশ প্যারেড অনুষ্ঠিত হচ্ছে, তখন থেকেই ফেসবুকে আমাদের সহপাঠীরা পত্রিকার ওই খবরটি শেয়ার করতে ভুলেননি। শেয়ার করা পোস্টে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে থাকা আমাদের সহপাঠীরা লাইক দিয়েছেন, কমেন্ট করেছেন। সেই কমেন্টগুলো পড়লে বোঝা যায়, গর্বে তারা কতটা আপ্লুত হয়েছেন!

শামসুন্নাহার তার পোশাকি নাম। আমাদের কাছে তিনি বিউটি নামেই পরিচিত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসের একটি পরিচিত মুখই বলা যায় বিউটি। রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ থেকে অনার্স ও মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করে এমফিল করেছেন। তিনি ২০তম বিসিএস কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হয়ে পুলিশ বাহিনীতে যোগ দেন। এরপর উচ্চ শিক্ষার্থে বিদেশ যান এবং লন্ডনের একটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমবিএ ডিগ্রি অর্জন করেন। তাছাড়া পুলিশ বিভাগেও তিনি অনেক সম্মাননা অর্জন করেছেন। তাই শামসুন্নাহার প্যারেডে নেতৃত্ব দিয়েছেন যোগ্য হিসেবেই। এ ব্যাপারে তার প্রতিক্রিয়া হচ্ছে, ‘২০০১ সাল থেকে পুলিশ একাডেমির সারদার ক্যাম্প থেকে প্যারেড করে আসছি, আমি অপেক্ষায় ছিলাম দিনটির জন্য। কারণ, প্যারেড একটি অত্যন্ত দায়িত্বশীল ও সূক্ষ্ম কাজ। এ জন্য দেশবাসীসহ সবার কাছে আমি দোয়া কামনা করছি। যাতে করে যথাযথভাবে আমি আমার দায়িত্ব পালন করতে পারি।’

সোমবার (২৫ জানুয়ারি) পুলিশ সদর দপ্তর থেকে যে সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয় তাতে বলা হয়, বিউটির প্যারেডে নেতৃত্ব দেওয়ার ঘটনাটি ‘লৈঙ্গিক সমতা এবং নারীর ক্ষমতায়নে নতুন মাইলফলক।’ নারী কর্মকর্তাকে প্যারেড অধিনায়ক নির্বাচন করার বিষয়ে পুলিশের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক মোখলেসুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমাদের লক্ষ ছিল দুটি। একটি হলো নারীর ক্ষমতায়নের বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া, আরেকটি লৈঙ্গিক সমতা। গত বছর পুলিশ সপ্তাহে প্যারেডে উপ-অধিনায়ক ছিলেন একজন নারী। এবার আমরা অধিনায়কের দায়িত্ব একজন নারী কর্মকর্তাকে দিয়েছি।’

সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ অর্জনে যতগুলো শর্ত রয়েছে, তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে লৈঙ্গিক সমতা এবং নারীর ক্ষমতায়ন। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের পক্ষে উন্নতি করা মোটেই সম্ভব নয়, যদি না এখানকার নারীদের ক্ষমতায়ন করা হয়। নারীর উন্নয়ন নিশ্চিত না হলে দেশের টেকসই উন্নয়নও সম্ভব নয়। তাই নারীর ক্ষমতায়ন ও লিঙ্গ-জেন্ডার সমতা নিশ্চিত করতে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা প্রণয়নেও নারীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে, একজন নারীর একই অঙ্গে কিন্তু অনেক রূপ। অর্থাৎ তিনি যখন চাকরি করছেন, সেই তিনিই আবার বাড়ির হেঁশেলও সামলাচ্ছেন। একসঙ্গে একজন নারীকে কিন্তু অনেক কাজ সামাল দিতে হচ্ছে। সবদিক সামাল দিয়ে একজন নারী যখন তার কর্মক্ষেত্রে সাফল্য পান, তখন বুঝতে হবে সেই সাফল্যের পেছনে রয়েছে অনেক কষ্ট, অনেক ধৈর্য ও অধ্যবসায়। তাদের এই অধ্যবসায়কে যেন আমরা পায়ে দলে না দেই, অবহেলা না করি।

অতীতে অনেক নারীই সমাজে অনেক অবদান রেখে গেছেন। কিন্তু আমরা কেবল জানি গুটি কয়েকজনের নাম। আমাদের মা-বোনদের কথাই বলি না কেন। আমাদের সংসারে তাদের যে অবদান তা টাকার অঙ্কে হিসাব করা যাবে না। মা-বোনদের নৈবেদ্য, আলতো ছোঁয়া, একাগ্রতা না থাকলে সংসারের কোনো কাজই সুষ্ঠুভাবে এগুতো না। মনীষীরা বলে গেছেন, প্রত্যেক সফল ব্যক্তির পেছনে রয়েছেন একজন নারী। সেই দিক থেকে বিচার করলে আমার বন্ধু শামসুন্নাহার যিনি নারী হিসেবে পুলিশ প্যারেডে প্রথম নেতৃত্ব দেওয়ার গৌরব অর্জন করলেন, তা মোটেও খাটো করে দেখার নয়। তার এই সাফল্য আরও অনেক নারীকে উৎসাহ যোগাবে। আরও অনেকে এ পথে এগিয়ে আসবে এটাই হলো শামসুন্নাহারের বড় সাফল্য। জয়তু শামসুন্নাহার।