মেইন ম্যেনু

সিংঙ্গাপুরে অভিবাসী শ্রমিকদের বাংলা ভাষা ও সাহিত্য চর্চা

রাশিদুল ইসলাম জুয়েল, সিঙ্গাপুর থেকেঃ পৃথিবীর আর কোন দেশে এমন উদাহরণ আছে কি ? যে দেশে অর্ধ শিক্ষিত, মধ্যম শিক্ষিত শ্রমজীবি অভিবাসী শ্রমিক কবিতা লিখে, গান লিখে, গান গায়, নাটক লিখে, অভিনয় করে, শ্রমিক জীবনের কষ্টের করুন গাঁথার ডকুমেন্টারী লিখে, সাংবাদিকতা করে, আন্তর্জাতিক মানের অনুষ্ঠানে অংশগ্রহন করে পদক ও সম্মানী কুড়ায় ? সিঙ্গাপুর থেকে প্রকাশিত দক্ষিন- পূর্ব এশিয়ার অভিবাসীদের একমাত্র বাংলা সংবাদপত্র “বাংলার কন্ঠ”‘র প্রধান সম্পাদক জনাব একে,এম মোহসিন বাংলা ভাষাকে প্রবাসী শ্রমিকের সুপ্ত মেধা বিকাশের মাধ্যম হিসেবে ধীরে ধীরে নিয়ে গেছেন বহু মাতৃক এক অজানা উচ্চতায় । বিস্মিত হই একজন মানুষ রাস্তা থেকে শ্রমিক ধরে এনে তাদেরকে পরিচর্যা করে তিলে তিলে কবি, সাহিত্যিক, গীতিকার, নাট্যকার, অভিনেতা ও শিল্পী, সাংবাদিক হিসেবে গড়ে তুলেন । বিভিন্ন ধারণা দিয়ে শ্রমিকদের ভিতর লুকিয়ে থাকা প্রতিভাকে টেনে বের করে আনেন । অনেক শ্রমিক তার মনের কথা সাজিয়ে বলতে পারেন না, লিখতে পারেন না কিন্তু তিনি নিজ হাতে কলম ও কাগজ ধরিয়ে দিয়ে তা বের করেন ।তারপর ভুল-ত্রুটি সংশোধন করে সেটিকে খাঁটি সাহিত্যিকের মত করে বাংলার কন্ঠে প্রকাশ করেন । এমন প্রচেষ্টা থেকেই ফুটে উঠে শ্রমিকের ঘাম ঝরানো বুকে লুকিয়ে থাকা সুপ্ত প্রতিভার একেকটি তাজা গোলাপ । সমাজে এলিট শ্রেণীর বাইরে এই অচেনা অজানা শ্রমজীবি মানুষ গুলোই আজ বিদেশের মাটিতে বাংলা ভাষার একেকটি আলোকিত নক্ষত্র । জনাব একে,এম মোহসিন যার রক্তে মিশে আছে বাংলা ভাষার প্রতি অকৃত্রিম ভালবাসা । বাংলা ভাষার প্রতি এতটান, নিবেদিত প্রাণ মানুষ কখনও দেখিনি। আমাদের শ্রদ্ধেয় মরহুম ভাষা সৈনিক আব্দুল মালেক ভূঁইয়া ছিলেন তাঁর পিতা । তিনি বাংলাদেশের বিভিন্ন দৈনিক পত্রিকায় সাংবাদিকতা করেছেন । যখন তিনি সিঙ্গাপুরে আসেন, এসেই তাঁর মনে বাংলা ভাষার ভালবাসা জাগে, তিনি বাংলা ভাষার একটি মুখপাত্রের অভাব মনে প্রানে অনুভব করলেন । এক সময় সিঙ্গাপুরে একটি বাংলা পত্রিকায় কাজ শুরু করলেন কিন্তু পরিচালক মন্ডলী এ সব ব্যাপারে ছিলেন অনঅভিজ্ঞ । তাই সেটি নিয়ে বেশী দূর আগাতে পারেননি । পরবর্তীতে নিজেই ২০০৬ সালে বাংলায় ম্যাগাজিন বের করতে শুরু করলেন । সাথে খুঁজতে থাকলেন প্রতিভাধর বাঙ্গালী শ্রমজীবি মানুষদের । কিছু প্রবাসী শ্রমিক পেয়েও গেলেন । যারা লেখা-লেখিতে সামান্য দক্ষতা রাখেন, তাদেরকে সংগঠিত করে বিভিন্ন পদে পদায়িত করে, বাংলার কন্ঠ সাহিত্য পরিষদ নামে একটি সংগঠন করে দেন । ২০১২ সালে বাংলার কন্ঠ সাহিত্য পরিষদ পুরস্কার দিলেন । প্রবন্ধ আহবান করে পুরষ্কার দিলেন । এমন বহু কাজ করে বাংলা ভাষাকে এগিয়ে নিয়ে চলেছেন তিনি । বাংলার কন্ঠ সাহিত্য পরিষদের মাধ্যমেই সিঙ্গাপুরে চলছে বাংলা ভাষায় উন্মুক্ত সাহিত্য চর্চা, আলোচনা, লেখা-লেখি । যে লেখা অনেকেই ভুলেই গিয়েছিলেন, তাই আজ মুক্ত দানার মত অবিরত ঝরছে বহু গদ্যে, পদ্যে ও কবিতায় । শ্রমিকদের বসার জায়গা ছিল না, তিনিই তাদের বসার জায়গা করে দিলেন । শ্রমিকদের লেখাগুলো তিনিই বাংলার কন্ঠে’র প্রতিটি সংস্করণে প্রতিনিয়ত প্রকাশ করে যাচ্ছেন । বাংলার কন্ঠের কবি সাহিত্যিক লেখক ও সাংবাদিক সবাই অভিবাসী শ্রমিক। আমাদের কবি ও লেখক সীমিত সংখ্যক কিন্তু এই সীমিত প্রতিভাধর মানুষগুলোই আজ বীরের বেশে বিচরণ করছেন । সিঙ্গাপুরের বিভিন্ন সাহিত্য ও সংস্কৃতির অঙ্গনে, বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশগ্রহন করে তাঁরাই কুড়িয়ে এনেছেন পাহাড় সমান সম্মান । উল্লেখযোগ্য অনুষ্ঠান গুলোর মধ্যে প্রথমেই আসে সিংগাপুর ন্যাশনাল লাইব্রেরীতে “মাইগ্রেন্ট ওয়ার্কারস পয়েট্রি কম্পিটিশন” যেখানে দু’জন বাঙ্গালী কবি প্রথম ও দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেছিলেন। সিংগাপুর ন্যাশনাল লাইব্রেরীতে অধিবাসীদের লেখা ছয়টি বইয়ের মোড়ক উন্মোচন, স্পিক ইজি সহ সর্বশেষ সংযোজন গত ৮’ই নভেম্বর’১৫ সিংঙ্গাপুর রাইটার্স ফেস্টিবল-এ প্রথম অংশগ্রহন । যেখানে একেক দিন পৃথিবীর ভিন্ন দেশের কবিরা তাদের কবিতা, প্রবন্ধ পড়েন, দর্শকদের সাথে মতামত বিনিময় করেন। এমন বহু স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক মানের অনুষ্ঠানে বাংলাকে নিয়ে যাওয়ার সকল কৃতিত্ব জনাব একে,এম মোহসিন সাহেবের। আমাদের প্রাপ্তিতে ইতিমধ্যে অনেকে নক্ষত্র যুক্ত হয়েছেন কিন্তু দু:খের বিষয় বাঙ্গালীর গর্ব নিজেরাই খর্ব করে। একটু সুযোগ পেলেই, একটু উপরে উঠলেই নদী পেরিয়ে ভেলায় লাথি দিতে বাঙ্গালী কখনও ভুল করেনি । এটি যেন যুগে যুগে আমাদের সংস্কৃতিরও একটা অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে । যুগ বদলায় তবুও বাঙ্গালী বদলায় না । আমাদের সাহিত্যিকদেরও একই সমস্যা, নাম ধাম হয়ে গেলেই দেহটি কালাজ্বরে জর্জরিত হয় । তখন সে আপন মনে মুক্ত আকাশে বলাকার মত উড়তে পারে, পাখা ঝাপটিয়ে ঘুরতে পারে অসীমে কিন্তু ভুলে যান তার উপরে উঠার সিড়ির কথা । এমন বহু প্রতিভা আজ খন্ড খন্ড হয়ে নিজেরাই গড়ে তুলেছেন নানান সংগঠন, এখন আর পুরাতন সংগঠনে আসার প্রয়োজন মনে করছেন না । পারলে তাদের জন্মদাতার দূর্নাম করে বেড়াতেও পিছপা হচ্ছেন না । আমাদের প্রাপ্তির এক বিরাট অংশ জুড়েও এমন কিছু দু:খবোধও রয়ে গেছে । সাংগঠনিক কার্যক্রমে এ দু:খবোধ আজীবনই থাকবে কারণ আমরাত সময় ও সুযোগে একাই একশ কিন্তু একশ জন বাঙ্গালী কখনও এক নই । ভূল ভ্রান্তির উপরে উঠে নিজেকে একটু খাট করে কেহ বড় হতে চাই না । নাম জশ্ হয়ে গেলে গান কি বন্দরে আর পিছন ফিরে তাকাই না । আমাদের উল্লেখযোগ্য প্রাপ্তিও কম নয় । সিঙ্গাপুর অভিবাসী শ্রমিকদের লেখা বাংলা কবিতা ইংরেজী অনুবাদ করে সেটি নিয়ে গবেষনাও শুরু হয়ে গেছে। সিঙ্গাপুরের শ্রেষ্ঠ কবি,সাহিত্যিকগন বাংলা কবিতা ইংরেজীতে পড়েন, আবৃতি করেন। শ্রমজীবি কবি যখন তার নিজের কবিতা বাংলায় আবৃতি করেন তখন বড় স্ক্রীনে প্রদর্শিত ইংরেজী পড়ে অনেক বিদেশী, বিদেশীনির চোখে জল ঝরতে দেখেছি । অনুষ্ঠানের শেষে বিদেশী দর্শকদের প্রতিক্রিয়া জানতে গিয়ে দেখলাম বাংলা কবিতায় মানুষকে কাঁদায় । বহু দর্শক কথাটি স্বীকার করলেন । এই প্রাপ্তির সাক্ষী হয়ে ভাবী, বাংলায় কি নেই? সবই আছে, ছিল বলেই আজও আছে, ভবিষ্যতেও থাকবে ইনশাল্লাহ। বিদেশী এই সমাজের এলিট, বার্জার পেইন্ট বাঙ্গালী সমাজ অথবা বাংলাদেশ দূতাবাস কোনদিন শ্রমজীবি মেহনতী মানুষের এসব কার্যক্রম উঁকি মেরে দেখতেও আসেননি । এদের কোন সাহায্য এগিয়ে এসেছে বলে আমার জানা নেই । অথচ তাঁরাই কত বড় বড় অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত অথিতির প্রধান আকর্ষন । প্রধান অথিতির আসনে বসেন, বিনামূল্যে বহু মূল্যবান বক্তব্য বিতরণ করেন । শ্রমিকের ঘর্মাক্ত দেহের বুকে সুখ দু:খের অনুভুতি প্রকাশের খবর কেউ নেয় না । উচ্চ সমাজের অপাংক্তেয় অংশ এই শ্রমজীবি মানুষের অক্লান্ত পরিশ্রমে দেশের না কি রিজার্ভ স্ফীত হয় ? রিজার্ভ বাড়লে দেশের অর্থনীতির চাকা সচল হয়, দূর্নীতির চাকাও দ্রুত ঘুরে কিন্তু শ্রমিক ঘুরে দাঁড়াতে পারে না। প্রতিনিয়ত বহু ঘাত প্রতিঘাত অতিক্রম করেই এগিয়ে যায় কষ্টের নোনা জলে ভাসমান শ্রমিকের কল্পনা বিলাসী দুর্বিসহ জীবন।