মেইন ম্যেনু

সিএনজির চালক-মালিকদের স্বেচ্ছাচারে দুর্ভোগে যাত্রীরা

সময় সকাল ১০টা। রাজধানীর মাদারটেক চৌরাস্তার সামনে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে আছেন রুম্মান আরা জাহান। যাবেন বাড্ডায়। কয়েকটি সিএনজি অটোরিকশার চালকের সঙ্গে কথা বলে হতাশ হলেন। তারা মিটারে যাবেন না। চুক্তিতে ভাড়া আড়াই শ টাকা দাবি করেন তারা।

রুম্মান আরা কারণ জানতে চাইলে চালক আলামিনের উত্তর, “প্রতিদিন জমা দেই দেড় হাজার টাকা। গ্যাসের খরচ, পুলিশ আর খাওয়া-দাওয়া শেষে কিছু না থাকলে চলুম ক্যামনে।”

রুম্মন আরা জাহান বলেন, “বাড্ডায় মায়ের বাসায় যাব। প্রায় এক ঘণ্টা ধরে দাঁিড়য়ে আছি। পাঁচ-ছয়টি সিএনজির সঙ্গে কথা বলেছি, কিন্তু কেউ মিটারে যাবে না।”

একই অবস্থার শিকার ফারহানা আলম। দুপুর ১২টার দিকে রাজধানীর শাহজাহানপুরের ফ্লাইওভারের গোড়ায় দাঁড়িয়ে সিএনজির খোঁজ করছিলেন তিনি। যাবেন মিরপুর সনি সিনেমা হলের দিকে। সেখানে থাকেন তার বাবা ও ছোট ভাই। সাড়ে তিন শ টাকার নিচে কোনো সিএনজি যেতে চাচ্ছে না মিরপুর। অগত্যা অপেক্ষা করছেন অন্য কোনো সিএনজির জন্য।

রুম্মান ও ফারহানার মতো অনেককেই এভাবে রাজধানীতে বিড়ম্বনা পোহাতে হচ্ছে সিএনজির চালকদের স্বেচ্ছাচারিতার কারণে।

অথচ সিএনজি অটোরিকশার ভাড়া বৃদ্ধির সময় ঘোষণা দেয়া হয়েছিল যেকোনো জায়গায় যাতায়াতে মিটারে চলবে সিএনজি অটোরিকশা।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ঢাকা অটোরিকশা শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি ফারুক চৌধুরী বলেন, “এটা বন্ধ করতে হলে মালিকদের গ্যারেজে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করতে হবে। কারণ তারা সরকার নির্ধারিত ৯০০ টাকা জমা নেয় না। এক হাজার টাকা থেকে ১৭০০ টাকাও জমা নেয়া হচ্ছে। এই বাড়তি টাকার জন্যই চালকরা স্বেচ্ছাচারিতা করছে।” যাত্রী হয়রানি কমাতে ভ্রাম্যমাণ আদালত বাড়ানো প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।

বিআরটিএ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় প্রতিদিনিই ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করছে তারা। এ ছাড়া অটোরিকশার বিরুদ্ধে দপ্তরে জমা পড়া বিভিন্ন অভিযোগের শুনানি করে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।

কিন্তু যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, যে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে, সেটা দৃশ্যমান নয়। তাদের কার্যক্রম কোনো প্রভাবও ফেলছে না বাস্তবে। এতে চালকদের স্বেচ্ছাচারিতা বেড়েই চলছে।

এদিকে যাত্রী কল্যাণ সমিতি নামের একটি সংগঠন সম্প্রতি ৫০০ সিএনজি অটোরিকশার ওপর তাদের পর্যবেক্ষণের কথা জানিয়ে অভিযোগ করছে, এগুলোর মধ্যে ৭৮ শতাংশই মিটারে চলছে না। অথচ নতুন ভাড়া কার্যকর হওয়ার শুরুর দিকে মিটারে চলেছে ৭৫ শতাংশ সিএনজি।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে বিআরটিএর সচিব মুহাম্মাদ শওকত আলী বলেন, মিটারে না যাওয়া ও নির্দিষ্ট গন্তব্যে যেতে না চাওয়াসহ বিভিন্ন অপরাধে গত ২৫ জানুয়ারি বিআরটিএর ভ্রাম্যমাণ আদালত ২৮টি অটোরিকশাকে ডাম্পিংয়ে পাঠান। একই সঙ্গে ১৯ জন চালককে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদ- দেন। পরের দিন ২৬ জানুয়ারি ২৬টি অটোরিকশা ডাম্পিং করা হয় এবং ৩২ জন চালককে দ- দেয়া হয়। প্রতিটি যানবাহনের অনিয়ম ধরার জন্য বিআরটিএ প্রতিদিনই পাঁচটি ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে। প্রতিদিনই চালকদের জরিমানাসহ অটোরিকশা ডাম্পিং করা হচ্ছে।

গত বছরের ১ নভেম্বর রাজধানী ঢাকায় সিএনজিচালিত অটোরিকশার নতুন ভাড়া কার্যকর হয়। নতুন ভাড়া অনুযায়ী অটোরিকশার প্রথম দুই কিলোমিটার ৪০ টাকা; পরবর্তী প্রতি কিলোমিটারের ভাড়া ১২ টাকা। প্রতি এক মিনিট ওয়েটিংয়ের (যাত্রাবিরতি, যানজট ও সিগন্যাল) জন্য দুই টাকা। একই সঙ্গে মালিকের জমা ৯০০ টাকা নির্ধারণ করে দেয়া হয়।

ভাড়া বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হওয়ার পর সরকারের পক্ষ থেকে ঘোষণা দেয়া হয়েছিল ঢাকায় সব অটোরিকশা মিটারে চলবে। কিন্তু ভাড়া বাড়ানোর সিদ্ধান্ত কার্যকর হওয়ার পরও অনেক চালকই তা মানছেন না বলে অভিযোগ উঠছে প্রতিনিয়ত।

এ ব্যাপারে ঢাকা মহানগর সিএনজি অটোরিকশা ব্যবসায়ী মালিক সমিতির সভাপতি বরকত উল্যাহ বুলু বলেন, “কোনো মালিকের বিরুদ্ধে ৯০০ টাকার বেশি জমা আদায়ের অভিযোগ পাওয়া গেলে আমরা অবশ্যই ব্যবস্থা নেব।” তিনি চালকদের ৯০০ টাকার বেশি জমা না দিতে পরামর্শ দেন। একই সঙ্গে চালকদের দুই শিফটে গাড়ি না চালানোর আহ্বান জানান তিনি।

এদিকে সিএনজির মিটারে চলাচল ও মালিকের জমা নিয়ে অনিয়মের বিষয়ে ২৭ জানুয়ারি বিআরটিএর প্রধান কার্যালয়ে মালিক, শ্রমিক ও বিআরটিএর মধ্যে এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। বিআরটিএর চেয়ারম্যানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ওই সভায় চারটি মালিক সমিতির নেতারা সরকার-নির্ধারিত জমার অতিরিক্ত টাকা না নেয়ার অঙ্গীকার করেন। সভায় বিআরটিএর পক্ষ থেকে বলা হয়, চালকদের স্বেচ্ছাচারিতা প্রতিরোধে প্রয়োজনে রাজধানীতে সিভিল টিম নামানো হবে।

সিএনজি চালকদের মিটারে না যাওয়া কিংবা অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর ট্রাফিক পুলিশের সহকারী কমিশনার মো. আবু ইউছুফ কাছে দাবি করেন, এ ধরনের অভিযোগ পেলে তারা ব্যবস্থা নেন। তবে অভিযোগ না পেলে সব সময় সিএনজি অটোরিকশার অতিরিক্ত ভাড়া আদায় কিংবা মিটারে না-যাওয়ার বিষয় প্রতিরোধ করা একা পুলিশের পক্ষে সম্ভব নয়। ঢাকাটাইমস