মেইন ম্যেনু

সিদ্ধান্ত গ্রহণে আপনি কি প্রজেকশন বায়াসের শিকার?

প্রতিদিন আমরা ছোটখাট অনেক সিধান্ত নিই। আমাদের সিদ্ধান্তগুলো অনেকাংশে নির্ভর করে বর্তমান মানসিক অবস্থার উপর। যেমন, সন্ধ্যায় হয়ত বন্ধুদের সাথে চমৎকার একটি পার্টিতে যাওয়ার কথা আপনার। কিন্তু সকালে কোন কারণে মন খারাপ হয়ে গেল। তাই আপনি সিদ্ধান্ত নিলেন পার্টিতে যাবেন না। কারণ আপনি ধরেই নিচ্ছেন, আপনার ভাল লাগবে না। আচরণগত বিজ্ঞান বলে, ভবিষ্যতের এই পূর্বাভাস সবসময় সঠিক হয় না। মানুষের এই পূর্বাভাসজণিত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ভুলকে বলা হয় প্রজেকশান বায়াস বা পক্ষপাতদুষ্ট অভিক্ষেপ।

প্রজেকশান বায়াসের সমস্যা যে কারোরই হতে পারে। প্রকৃতপক্ষে সবারই হতে পারে। এক্ষেত্রে আমরা ধরে নিই, আমাদের বর্তমান সিদ্ধান্ত ভুল! আমরা যেন নানা রকম নেতিবাচক ফলাফলের পূর্বাভাস পেয়ে যাই আর আমাদের বর্তমান সিদ্ধান্ত বদলে ফেলি। তাতে হয়ত অনেক সুন্দর মূহুর্ত হারিয়ে ফেলি আমরা অথবা এমন কিছু মিস করি যার ফল আসলেই নেতিবাচক হতে পারে ভবিষ্যতে।

আসুন এরকম কিছু প্রজেকশান বায়াস সম্পর্কে জেনে নিই, যাতে নিজেরাই সঠিক সিদ্ধান্তকে ভুলে পরিণত করা থেকে বিরত থাকতে পারি।

১। ক্ষুধার পূর্বাভাস-
ভেবে দেখুন তো, ভীষণ ক্ষুধার্ত অবস্থায় কোন শপিং মলে থাকলে আপনি কী করেন? আপনার মনে হয়, আপনি অনেক খেতে পারবেন। কোন একটা খাবারের দোকানে ঢুকে একটা বড় বার্গার অর্ডার করে ফেলেন আপনি। সাথে ফ্রেঞ্চ ফ্রাই, স্যুপ, একটা ডেজার্ট! কিন্তু কিছুটা খাওয়ার পরই আপনি টের পান, আর ক্ষিধে নেই। এটা কেন হয়? স্বাভাবিক অবস্থায় আমরা যতটুকু খেতে পারি, ভীষণ ক্ষুধার্ত অবস্থায় আমরা ধরে নেই আমরা আরো অনেক খেতে পারব। নিজের ক্ষুধাকে আমরা ভুলভাবে প্রজেকশান করি বা অনুভব করি আর নিজের ডায়েট ফুড চার্টকে ভুলে গিয়ে অনেকগুলো ভারী খাবার অর্ডার করে বসি। ডাঃ সাহরাম হাসমাতের মতে, প্রজেকশান বায়াস আমাদের এই সিদ্ধান্ত নিতে প্ররোচিত করে।

২। আসক্তি-
যারা বিভিন্নরকম আসক্তিতে ভোগেন, যেমন খাদ্যাসক্তি, মাদকাশক্তি, তারা সবসময়ই নিজের প্রয়োজন সম্পর্কে ভুল পূর্বাভাস পেয়ে থাকেন। অর্থাৎ, একজন ধূমপায়ী ব্যক্তি যখন অনেকক্ষণ ধূমপান থেকে বিরত থাকেন বা কোন কারণে হতাশা বা দুশ্চিন্তায় ভুগলে দেখা যায় তিনি স্বাভাবিকের তুলনায় অধিক ধূমপান করছেন। তাঁর মনে হতে থাকে তাঁর অনেক সিগারেট খাওয়া প্রয়োজন বা সিগারেটের নিকোটিন তাকে হতাশা থেকে দূরে রাখবে, অথবা তিনি দুশ্চিন্তামুক্ত হয়ে প্রশান্তি বোধ করবেন। কিন্তু এর কোনটাই কি আসলে বাস্তব সম্মত? এটিও প্রজেকশান বায়াসের ফলাফল।

৩। অতিরিক্ত আত্নবিশ্বাস-
অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসের কারণে আপনি প্রজেকশান বায়াসের শিকার হতে পারেন। আপনি হয়ত চাকরির ইন্টারভিউ দিতে যাবেন। আগেই ঠিক করে রেখাছিলেন, কীভাবে নিজেকে তুলে ধরবেন ইন্টারভিউ বোর্ডের সামনে। সকালে এমন কোন তথ্য পেলেন যাতে আপনার মনে হল, চাকরিটা আপনি নিশ্চিত পাবেন। আত্মবিশ্বাস বেড়ে গেল বহুগুণে। আগের সিদ্ধান্ত বদলে ফেললেন, অনেক কিছু যোগ-বিয়োগ করে নতুন করে তৈরি হলেন। মনোবিজ্ঞানীদের মতে, অধিক আত্মবিশ্বাস আমাদের ভুল সিদ্ধান্ত নিতে প্ররোচিত করে।

৪। অযৌক্তিক কেনাকাটা-
আপনি কি শপিং মলে প্রায়ই অপ্রয়োজনীয় পণ্য কিনে ফেলেন? অন্যকারো অনুকরণে পণ্যের চাহিদা অনুভব করেন? তাহলে কিন্তু কেনাকাটায় আপনার সিদ্ধান্তগুলো প্রজেকশান বায়াসের শিকার। খেয়াল করুন, অফিসে যেদিন আপনার বেতন হয় অথবা কোনভাবে হাতে কিছু টাকা আসে, এমনকি হয়ত এসব কিছুই না, আপনি বরং আর্থিক সংকটে আছেন, তবু শপিং মলে গিয়ে ৭০% ছাড় দেখে অনেক শপিং করে ফেললেন। ভুলে গেলেন মাসিক অর্থ ব্যয়ের যে পরিকল্পনা করে রেখেছিলেন আগে। এরকম ভুল সিদ্ধান্তের কারণে হয়ত সারা মাস আপনাকে মেপে খরচ করতে হবে অথবা সহকর্মীর কাছ থেকে ঋণ নিয়ে চলতে হবে।
৫। ভবিষ্যৎ নিয়ে হতাশা-
যারা জীবন নিয়ে হতাশায় ভোগেন তারা মনে করেন ভবিষ্যতে আরো হতাশা অপেক্ষা করছে তাদের জন্য। তারা ভাবতে থাকেন, তাদের সব সিদ্ধান্ত ভুল। তাই ক্রমাগত সিদ্ধান্ত বদলাতে থাকেন তারা। আর হতাশার নেতিবাচক পূর্বাভাস তাদের সিদ্ধান্তকে আরো ভুল দিকে নিয়ে যায়। তারা মনে করেন তাদের জীবনে আর ভাল কিছু হবে না, আর কোন কিছুতেই তারা সফল হবেন না। নিজের ভবিষ্যত সম্পর্কে ভুল প্রজেকশান তাদের নিজের সম্পর্কে ভাল ধারণাগুলোকেও ধীরে ধীরে গ্রাস করে নেয়। হতাশার এই দিকটি খুব ভয়ঙ্কর। অতিমাত্রায় বায়াস মানুষদের মানসিক চিকিৎসার দরকার পড়তে পারে।

পরিশেষে, ভুল পূর্বাভাস দ্বারা চালিত হওয়া আপাতদৃষ্টিতে ছোট সমস্যা মনে হলেও এ থেকেই পরবর্তীতে শপাকোহলিক, ফুড এডিকশান, বিষন্নতা এসব মানসিক রোগে আক্রান্ত হতে পারেন আপনি। তাই প্রজেকশান বায়াস সম্পর্কে ধারণা আমাদেরকে ভুল সিদ্ধান্ত গ্রহণ থেকে বিরত রাখতে পারে। নিজেদের আবেগের ভুল ব্যাখ্যা, হীনমন্যতা বা হতাশায় ভুগতে থাকা মানুষ আবার ফিয়ে আসতে পারে স্বাভাবিক জীবনে।