মেইন ম্যেনু

সিরাজ সিকদার – কর্ণেল তাহেররা জীবিত থাকলে কষ্ট পেতেন

সেই ছোটবেলা থেকে বাম রাজনৈতিক নেতা রাশেদ খান মেনন, হাসানুল ইনু ও দীলিপ বড়ুয়ারা ভাইদের সুন্দর সুন্দর গণমুখী বক্তব্য শোনে বড় হয়েছি। বক্তব্য শোনে শোনে একসময় তাদের ভক্ত হয়ে গিয়েছিলাম। পত্রপত্রিকার পাতায় খোজেঁ খোঁজে তাদের বক্তব্য পড়তাম। আশেপাশে তাদের কোনো সভা-সমাবেশ থাকলে তো কোনো কথাই ছিল না। যতই ব্যস্ততা থাক না কেন, তাদের বক্তব্য শুনতেই হত।

আজও স্মরণে আছে সেই নব্বইয়ের দশকে বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে যখন রাশেদ খান মেনন আর হাসানুল হক ইনু ভাইরা ঢাকা থেকে গিয়ে রাজশাহীর সাহেববাজার জিরোপয়েন্টে গণকপাড়ায় জনসভায় ভাষণ দিতেন, তখন জনসভায় হাতেগোনা কয়েকজন লোক থাকলেও দেখতাম রাস্তার দু’ধারে দাঁড়িয়ে শত শত মানুষ তাদের বক্তব্য শুনতেন। গণমানুষের পক্ষে তাদের বক্তব্য শুনে আমি নিজেও মুগ্ধ হতাম আর সবার কাছে তাদের বক্তব্যের প্রশংসা করতাম। তাদের ভাষণের একটাই মর্মার্থ ছিল তা হলো এই পূজিঁবাদী সমাজের শোষকদের হাত থেকে জনগণকে মুক্ত করে বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠা।

তাদের ভাষণ শোনে তখন ভাবতাম, আহা এই ভাল মানুষগুলো ক্ষমতায় যেতে পারছেন না। এও ভাবতাম মেনন, ইনু, দীলিপ বড়ুয়ারা ক্ষমতায় যেতে পারলে দেশের চেহারাই হয়ত পাল্টে যেত। শোষণ ও বৈষম্যহীন সমাজ তথা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হতো। যেখানে মানুষ সুখে বসবাস করতে পারত। শ্র্রমিক শ্রেণী মুক্তি পেত পূঁজিপতিদের রক্ত শোষণ থেকে।

কিন্তু বিগত দুটি নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ও স্বৈরাচার খ্যাত জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এরশাদের সাথে জোট করে নৌকা মার্কায় নির্বাচন করেন মেনন, ইনু ও বড়ুয়া ভাইরা। এখন তারা ক্ষমতার স্বাদ নিচ্ছেন। তবে দুই মেয়াদের বিগত সাড়ে ছয় বছরে তাদের ভুমিকা আমাদের দারুণভাবে হতাশ করেছে। যে মানুষগুলো ক্ষমতার বাইরে থেকে একরকম ছিলেন, এখন ক্ষমতায় গিয়ে দেশকে পাল্টে দেয়া দূরের কথা তারা নিজেরাই পাল্টে গেছেন। সমালোচনা কিংবা প্রতিবাদ তো অনেক দূরের কথা, আঁতাত গড়েছেন শোষক, নিপীড়ক ও দুর্নীতিবাজদের সাথে। তাহলে বুঝা যায়, ক্ষমতার বাইরে থাকলে অনেক সুন্দর সুন্দর কথা বলা যায়, কিন্তু ক্ষমতা পেলে সবাই পাল্টে যায়।

জামায়াতে ইসলামও ক্ষমতায় যাওয়ার আগে সুন্দর কথা বলত, কিন্তু বিগত জোট সরকারের আমলে ক্ষমতার অংশীদার হয়ে খালেদার কথার বাইরে যেতে পারেনি। এখানে জামায়াতের সাথে মেনন, ইনু ও বড়ুয়া ভাইদের কোন পার্থক্য কোথায়? জামায়াত নেতারা যেমন খালেদার তলবীবাহক ছিলেন, আজ মেনন, ইনুরা শেখ হাসিনার চামচামী করছেন। পার্থক্য শুধু এতটুকুই দেখছি। যাদের নিজেদের কোন বিবেকবুদ্ধি নেই, সেরকম ব্যক্তিত্বহীন চামচা জাতীয় লোকদেরকে আমরা এতদিন কতই না ভাল জাতের নেতা মনে করেছিলাম। তাই আজ মেনন ইনুভাইদের জন্য আমাদে খুবই কষ্ট হয়। দু:খ হয় তাদের রাজনৈতিক দেউলিয়াত্বে। হায়রে ক্ষমতা! তুমি এতটাই প্রিয় যে মানুষকে তার নীতি-আদর্শ সবকিছুই বুলিয়ে দিতে পার!

আমরা এই সব নেতাদের মুখে বছরের পর পর শোনে এসেছি পুজিঁবাদের শোষণের কথা। কিন্তু ক্ষমতায় গিয়ে তারা আজ নিজেরাই পাল্টে গেছেন। এই তো কিছুদিন আগে পত্র-পত্রিকায় দেখলাম, সাবেক শিল্প মন্ত্রী দিলীপ বড়ুয়া নাকি নিজের এবং তার পরিবারের সদস্যদের নামে ঢাকা ও চট্টগ্রাম শহরে পাঁচ-ছয়টি প্লট নিয়েছেন! পত্রিকার প্রতিবেদনের দেয়া তথ্যমতে, তিনি নাকি এখন খুবই দামী জিপে চলাফেরা করেন আজকাল। তার এবং তার পরিবারের নামেও কী কী সম্পদ আছে, তারও কিছু বিবরণ দেখলাম ওই ওইসব প্রতিবেদনে। এসব খবরে আমরা হতবাক হয়েছি। আমি মিলাতে পারলাম না। এটা কি সেই দিলীপ বড়ুয়া, যাকে আমরা এতদিন আদর্শবান নেতা হিসেবে দেখেছিলাম? যাকে মন্ত্রী হওয়ার পরও সাধারণ জীবনযাপন করতে দেখেছি। আচ্ছা, ঠিক আছে, না হয় ধরে নিলাম পত্রিকাগুলো অতিরঞ্জণ করে লিখেছে। কিন্তু পাঁচটি না হলেও তিনটি, কিংবা দু’টি প্লটতো ঠিক আছে।

শুধু বড়ুয়া নয়, এখন রাশেদ খান মেনন-ইনু ভাইদের গাড়ি-বাড়ি, বিশ্ববিদ্যালয়ের মালিক হওয়ার খবরও শোনা যাচ্ছে। জানি না, তা কতটা সত্য কিংবা মিথ্যা। তবে গ্রামবাংলা একটা বহুল প্রচলিত প্রবাদ বাক্য আছে ‘যাহা রটে তাহা কিছু না কিছু ঘটে।’ যাই হোক- মন্ত্রীত্ব হারালে হয়তো আরো অনেক কিছুই জানা যাবে।

বামপন্থী রাজনীতি বলতে আসলে ঠিক কি বুঝায়, তা আমি নিজেও ভালো বুঝি না। তবে একসময় বামপন্থী মতধারায় বিশ্বাসী লোকজনদের সাথে আমার অনেক উঠাবসা ছিল। তাদের অতি সাধারণ জীবনযাপন দেখারও সৌভাগ্য হয়েছে আমার । আমার এক মামা সারাজীবন বামধারার রাজনীতির প্রতি অনুগত ছিলেন। অর্থ-সম্পদ-প্রতিপত্তি’র প্রতি লোভ তার মধ্যে কখনো দেখিনি। শুনেছি, বামপন্থীদের নাকি একধরনের অহঙ্কার থাকে- ব্যক্তিগত সম্পদ না থাকার অহঙ্কার। খুব জানতে ইচ্ছা করে, এই সরকারের সঙ্গে জড়িত মহান নেতা রাশেদ খান মেনন, কিংবা হাসানুল হক ইনু-এরা কি ওই অহঙ্কারে অহঙ্কারী?

স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশে দিলীপ বড়ুয়া, রাশেদ খান মেনন, হাসানুল হক ইনু, সুরঞ্জিত সেন গুপ্ত, মতিয়া চৌধুরীসহ আরো অনেক বাম নেতাদের ভুমিকা, জীবিত বঙ্গবন্ধু আর মৃত বঙ্গবন্ধুর সাথে তাদের সম্পর্ক-মন্তব্যের কথা নাইবা বললাম। কেননা, এসব ইতিহাস তো সবারই জানা। এছাড়া বর্তমানে ক্ষমতার স্বাদ আস্বাদনে মত্ত যারা তাদের সম্পর্কে এর চেয়ে বেশী কিছু বলে জেনেশোনে বিপদ ডেকে এনেই বা লাভ কি তাতে!

তাই বারবার মনে পড়ছে সিরাজুল হক সিকদার ওরফে সিরাজ সিকদার এবং কর্ণেল তাহের ভাইদের কথা যারা বৈষম্যহীন সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠনের প্রচেষ্টায় জীবন উৎসর্গ করে গেছেন। যারা স্বপ্ন দেখতেন একটি বৈষম্যহীন সমাজের। যারা লোভ লালসা বিলাসী জীবনের মোহ উৎসর্গ করে বেছে নিয়েছিলেন সংগ্রামের পথ। জীবন দিয়ে প্রমাণ করে গেলেন তারা একটি মুক্ত সমাজের জন্যই লড়াই করেছেন। আপোষ করেননি বরং হাসিমুখে মৃত্যুকে বরণ করে নিয়েছিলেন। শোষনের রাষ্ট্র ব্যবস্থার ভীত কাপিয়ে দেন এই সাহসী পুরুষরা।

যতদূর জানি, মেনন, কিংবা হাসানুল হক ইনু ভাইরা তো তাদের সহযোগী ছিলেন। ফলে সিরাজ সিকদার এবং কর্ণেল তাহের ভাইদের নীতি আদর্শের এবং তাদের জীবন বিসর্জনের কথা কি স্মরণ হয় না আমাদের এই সব নেতাদের? নিশ্চয় হয় কিন্তু ক্ষমতার স্বাদ তাদের সক কিছু ভুলিয়ে রেখেছে। জানি না, এভাবে তারা আর কতকাল ভুলে থাকবেন। তবে এটা সত্য যে- ইতিহাস কখনো অসত্য বলে না।

তাই আজ আমার কেন জানি মনে হয়, এদেশে বামপন্থী রাজনীতির পথপদর্শক সেই সিরাজ সিকদার এবং কর্ণেল তাহের ভাইরা এসব কিছু দেখার আগেই চলে গিয়ে ভালই করেছেন। অন্যথা তারা আজ জীবিত থাকলে খুবই কষ্ট পেতেন।ওই মৃত্যুর বেদনার চেয়েও আজকের এই বেদনা তাদেরকে বেশি করে তাড়িয়ে বেড়াত। তাই স্যেলুট সিরাজ সিকদার, স্যেলুট কর্ণেল তাহের। তোমাদের সহযোগী মেনন-ইন্যু ভাইরা তোমাদের ভুলে যেতে পারে কিন্তু বৈষম্যহীন সমাজ প্রচেষ্টায় তোমাদের আত্মত্যাগ এদেশবাসী কখনো ভুলবে না। তাই তোমাদের বিদেহী আত্মার প্রতি আমাদের স্যেলুট।

 

লেখক: গবেষক ও কলাম লেখক। ই-মেইল: [email protected]