মেইন ম্যেনু

‘সুলতান সুলেমানে’ মুগ্ধ বাংলাদেশ

সাফাত জামিল শুভ : জাতীয় ঐতিহ্য নির্মাণসহ বিভিন্ন কারণে তুরস্কের ইতিহাসে সুলতান সুলেমানের সময়কাল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে আছে তাঁর ঘটনাবহুল বর্ণাঢ্য জীবন। সব মিলিয়ে দীর্ঘ সিরিয়ালের জন্য আকর্ষণীয় চরিত্র। তাই কাজে লাগিয়েছেন তুরস্কের জনপ্রিয় নির্মাতা ইয়াগমুর তাইলান ও দুরুল তাইলান। মুহূর্তে মুহূর্তে নাটকীয়তার ছটায় সিরিয়ালটিকে নিয়ে গেছেন জনপ্রিয়তার শীর্ষে যা বিশ্বের ৬০টিরও বেশি দেশে এরইমধ্যে প্রচার হয়েছে।

অপসংস্কৃতির অবাধ প্রবেশের যুগে বাংলাদেশের দর্শকরা যখন দেশীয় নাটক,সিরিয়াল থেকে মুখ ফিরিয়ে কলকাতা ভিত্তিক সিরিয়ালে মগ্ন, ঠিক সেই সময় আশার আলো দেখায় বাংলায় ডাবিং করা তুর্কি সিরিয়াল ‘সুলতান সুলেমান’। বলা চলে, এদেশের টিভি দর্শকদের ‘আলিফ লায়লা’, ‘নূরজাহান’ বা ‘থিফ অব বাগদাদ’র যুগে নিয়ে গেছে সিরিয়ালটি।এর ধারাবাহিতায় ঐতিহাসিক ঘটনার আদলে নির্মিত ধারাবাহিক ‘সুলতান সুলেমান’ দিয়ে জনপ্রিয়তার শীর্ষে উঠে এসেছে দেশের ২৬ তম বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল ‘দীপ্ত টিভি’।২০১৫ সালের ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহ টিআরপি রেটিং-এ দ্বিতীয় স্থান ও চলতি বছরের জানুয়ারি মাসের প্রথম সপ্তাহে দশর্ক জনপ্রিয়তার দিক থেকে প্রথমস্থান দখল করেছে দীপ্ত টিভি।

টিভি সিরিজ ‘সুলতান সুলেমান’-এর তুর্কি নাম ‘মুহতেসেম ইউজেল’। ইংরেজিতে এর অর্থ ‘দ্য ম্যাগনিফিসেন্ট সেঞ্চুরি’।সুলতান সুলেমানের যুবরাজ থেকে সুলতান হয়ে ওঠা এবং সাম্রাজ্য বিস্তারই ধারাবাহিকটির মূল কাহিনী।আত্মবিশ্বাসী, বীর, দৃঢ়চেতা এবং সর্বোপরি মহান শক্তিধর এই মানুষটির নাম সুলতান সুলেমান। ইউরোপের ইতিহাসবিদরা তাঁকে ‘গ্রেট ম্যাগনিফিসেন্ট হিরো’ বলে মানতেন। ইতিহাসের এই গ্রেট ম্যাগনিফিসেন্টের জন্ম ১৪৯৪ সালের ৬ নভেম্বর, সাগর পাড়ের ট্রাবজন নামক এলাকায়। তাঁর মৃত্যুর ৩০ বছর পর মহান নাট্যকর উইলিয়াম শেকসপিয়ার ‘দ্য মার্চেন্ট অব ভেনিস’ নাটকে প্রথম কোট করেছিলেন এই রাজাধিরাজের নাম।

প্রায় ৭০০ বছর ধরে তুরস্কের অটোম্যান সাম্রাজ্যের রাজত্ব ছিল পৃথিবী জুড়ে। এই সাম্রাজ্যের স্বর্ণযুগ ছিল সুলতান সুলেমানের নেতৃত্বে ষোড়শ থেকে সপ্তদশ শতাব্দী পর্যন্ত। ক্ষমতার টানাপোড়নে সেসময়ের অটোম্যান সাম্রাজ্যে ষড়যন্ত্র, গুপ্তহত্যা, ভাই হত্যা, সন্তান হত্যা এবং দাসপ্রথার অন্তরালে নানা কাহিনির জন্ম হয়। সেসব সেলুলয়েডের পাতায় নিয়ে র্নিমিত হয়েছে ‘সুলতান সুলেমান’ নামের মেগা-সিরিয়াল। জনপ্রিয় এই সিরিজে জীবন্ত হয়ে উঠেছে সুলতানকে প্রেমের জালে আবদ্ধ করে হুররাম(রোক্সেলানা) নামক এক সাধারণ দাসীর সম্রাজ্ঞী হয়ে উঠার কাহিনি।দাসী থেকে সুলতানের উপপত্নী হওয়া এবং হেরেম থেকে সুলতানের অন্য উপপত্নীদের বের করার লড়াইটাও পর্দায় এসেছে। হেরেমের অন্ধকার দুনিয়ার পাশাপাশি আছে প্রেম ও প্রেমের কারণে প্রাণ হারানোর নানা ঘটনাও। আর চিরায়ত ক্ষমতার দখল নেওয়ার জন্য কূটকৌশল না থাকলে তো সিরিয়াল হিসেবে প্রাণই পাওয়ার কথা নয় এই ধারাবাহিকের। হুররামের প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল সুলেমানের প্রথম প্রেম মাহিদেভ্রান সুলতান, সুলেমানের মা আয়েশা হাফসা সুলতানা, সাম্রাজ্যের প্রধান উজির ইব্রাহিম পাশা।

বাংলাদেশি দর্শকদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু মনোমুগ্ধ রাজকীয় রূপের অধিকারী হুররাম সুলতান।তার আসল নাম মারিয়াম উজারলি। জার্মান এ অভিনেত্রী এখন বিশ্বব্যাপী ‘হুররাম সুলতান’ নামেই বেশি পরিচিতি। এ দেশের পর্দায় হুররামকে দর্শক আবিষ্কার করেন ‘সুলতান সুলেমান’ নামের টিভি সিরিয়ালের মধ্য দিয়ে। চরিত্রের সঙ্গে একেবারেই মিশে গিয়েছিলেন তিনি। জার্মান এ মডেলকে এ চরিত্রে নেয়াটা হুট করেই যেন হয়েছে। ইতিহাসনির্ভর এ হুররাম চরিত্রের জন্য উপযুক্ত কাউকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। প্রায় আট মাস ধরে চলে ‘হুররাম’-এর খোঁজ। এরপর ২০ হাজারের বেশি প্রতিযোগীকে পেছনে ফেলে ওই চরিত্রের জন্য নির্বাচিত হন মারিয়াম।সুলতান সুলেমানে সম্পৃক্ত হওয়া প্রসঙ্গে বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে ৩২ বছর বয়সী এ অভিনেত্রী বলেন, ‘হঠাৎ শুটিংয়ের জন্য তুরস্কে আসার আমন্ত্রণ জানানো হয়। শুটিংয়ের জন্য পাক্কা দুই বছর হোটেলেই থাকতে হয়েছে আমাকে।’

সুলেমান’র বাংলা ডাবিংটির দিকে লক্ষ করলে উল্লেখযোগ্য কিছু দিক পাওয়া যায়। বিশেষ করে ভাষার ব্যবহার। বেশ সমৃদ্ধময় কবিত্বের লক্ষণ আছে চিত্রনাট্যে। একে চমৎকার ভাষান্তরের নির্দেশন বলা যায়। এ ছাড়া সিরিয়ালটিতে এক ধরনের ইসলামী আবহ পান অনেক দর্শক। যা এর জনপ্রিয়তার অন্যতম কারণও। পাশাপাশি প্রথাগত সিরিয়ালে জাঁকজমকপূর্ণ সকল বৈশিষ্ট্য এতে বিদ্যমান।

ইতিহাসনির্ভর হওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই এটিও সমালোচনার বাইরে ছিল না।এই সিরিজটার বিরুদ্ধে ৭০ হাজার অভিযোগ পাওয়া গেছে এবং একজন ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের গোপনীয়তাকে ভুলভাবে প্রদর্শনের গুরুতর অভিযোগ আছে। সিরিজটি দেখে খোদ তুরস্কের প্রধানমন্ত্রী রেসেপ তায়িপ এরদোগানও নিন্দা করেছেন। তাঁর মতে দেশের তরুণ প্রজন্মের কাছে তুরস্কের জাঁকালো ইতিহাসটাকে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে এতে।সেদেশের একজন সংসদ সদস্য অকায় সারাল “ঐতিহাসিক ব্যক্তিগণকে ভুলভাবে তুলে ধরার” কারণে তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেবার হুমকি দেন। অনেকে আবার খেপেছেন ঐতিহাসিক চরিত্রগুলোর অন্দরমহল দেখানোয়, তাঁদের মতে এটা করা মোটেই উচিত হয়নি। এটা তাঁদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তায় হস্তক্ষেপ! অবশ্য জনপ্রিয়তার নিরিখে সহসা সিরিজটিকে বন্ধ করার সাহস পায়নি কেউ। এখন পর্যন্ত সারা বিশ্বে ৬০ টি দেশে এটির দর্শক হয়েছে প্রায় ২০ কোটি।