মেইন ম্যেনু

সুষ্ঠু নির্বাচনের মডেল না.গঞ্জ সিটি কর্পোরেশন

নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন (নাসিক) নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে বিশ্লেষণ চলছেই। সরকারের দাবি, সুষ্ঠু নির্বাচনের মডেল নাসিক। আর বিএনপি বলছে, আন্দোলনের ফলেই নির্বাচন কমিশন (ইসি) সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় রাখতে বাধ্য হয়েছে।

এদিকে, সরকারি দলের শীর্ষ নেতা ওবায়দুল কাদের বলছেন, ‘যেকোনো মূল্যে অবাধ, নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের যে ওয়াদা করেছিলাম, তা পালন করেছি। প্রতিপক্ষ বিএনপির শীর্ষ নেতা মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের মূল্যায়ন হচ্ছে, ‘দলীয় প্রার্থী হারলেও আন্দোলনের আংশিক বিজয় অর্জিত হয়েছে’।

দুই পক্ষ থেকে যা-ই বলা হোক না কেন, নির্বাচনের ফলাফলে যতটা না রাজনৈতিক প্রভাব পড়েছে, তারচে বেশি প্রভাব দেখা গেছে ব্যক্তি ও পরিস্থিতির। বিশ্লেষকরা বলছেন, নারায়ণগঞ্জের রাজনীতি সম্পূর্ণই ব্যতিক্রম। অন্যকোনো স্থানের সঙ্গে মেলানোর কোনো সুযোগ নেই। এখানে রাজনীতির স্বাভাবিক গতিবিধির অভিজ্ঞতা কোনোই কাজে আসে না।

এ পরিস্থিতিতে সেলিনা হায়াৎ আইভীর জয়ের পেছনের কারণ অনুসন্ধানে কৌশলী হওয়ার সুযোগ থেকে যায়। প্রশ্ন ওঠে, আইভীর ফেভারে শুধুই কি নৌকা প্রতীক বা জনপ্রিয়তা, নাকি শামীম ওসমানের শত্রুদের সহযোগিতাও রয়েছে? এসব প্রশ্নের গভীরে গিয়ে বিশ্লেষণের চেষ্টা করা হচ্ছে। আবার এসব প্রশ্নও সংশ্লিষ্ট হয়ে আছে প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দল বিএনপির প্রার্থী অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খানের পরাজয়ের পেছনেও।

বলা হচ্ছে, আইভি ব্যক্তি হিসেবে জনপ্রিয়। সারাদেশে এক নামে পরিচিত। আর ততোটা পরিচিত মুখ নয় সাখাওয়াত হোসেন খান। দলের মনোনয়ন বোর্ডই তাকে বেশি চিনতো। আবার এ দুজনকেই দলের ভেতর থেকে প্রবল প্রতিরোধের মুখে পড়তে হয়েছে। এর মধ্যে আইভী বের হয়ে এসেছেন ব্যক্তিত্বগুণে। সেখানে সাখাওয়াত পরাস্ত হয়েছেন।

দলীয় দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে বলা যায়, নির্বাচন নিয়ে যথেষ্ট দ্বিধাদ্বন্দ্বে ছিল বিএনপি। আর আওয়ামী লীগ ছিল এবং আছে আত্মবিশ্বাসে ভরপুর। এর ওপর নির্ভুল ও সাহসিকতার সঙ্গে আইভির পক্ষে বাজী ধরেছেন দলীয় প্রধান শেখ হাসিনা। এক্ষেত্রে তৈমূরকে সরিয়ে দিয়ে কোনো কূলই রক্ষা করতে পারেননি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া।

বলা বাহুল্য, দলীয় কোন্দল মেটাতে বঙ্গবন্ধুকন্যা যতটা ক্ষিপ্র, ততটা হতে পারেননি জিয়াপত্নী। ঠিক একইভাবে ভোটের মাঠে যতটা স্মার্টনেসের পরিচয় দিয়েছেন আইভী, ততোটা স্মার্ট ছিলেন না সাখাওয়াত। রাজনীতির তথাকথিত ফরমুলায় আটকে থাকা বিএনপি এতো সুষ্ঠু ভোটের ক্ষেত্রে যে সুক্ষ্ম কারচুপির কথা তুলেছে সেটা বড্ড অশোভন, এমনি বিভাগীয় তদন্ত দাবি করাটাও অযৌক্তিকই বটে। আর মিষ্টি নিয়ে সাখাওয়াতের বাড়িতে গিয়ে সকালের নাশতা করা আইভীর রাজনৈতিক দূরদৃষ্টিরই পরিচয়।

আরেকটি যুক্তি যথেষ্টই আমলযোগ্য। তা হচ্ছে, আইভির মায়াবী চেহারার মধ্যে কোথাও রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কোনো আগুন দেখতে পায় না কেউ। একমাত্র ওসমান পরিবারের প্রভাবশালী সদস্য শামীম ওসমানের সঙ্গে বৈরিতার প্রসঙ্গ বাদ দিলে তার বিরুদ্ধে কথা বলার লোক খুঁজে পাওয়া যাবে না। বিপরীতদিকে, সাখাওয়াতের মুখচোরাভাবের মধ্যে কোনো আশ্রয় খুজে পায়নি ভোটাররা। কারণ আইভির মায়াতে আচ্ছন্ন হয়ে পড়া ভোটারদের টানতে আরো বেশি আবেদনময় আচরণ প্রয়োজন ছিল সাখাওয়াতের।

আবার কেউ কেউ বিশ্লেষণ করে দেখেছেন, দ্বিতীয়বারের মতো আইভীর পৌরপিতার আসন অলংকিত করার পেছনে তিনটি কারণ রয়েছে। এক নম্বরে রয়েছে- তার ব‌্যক্তিগত ভাবমূর্তি। দুই নম্বরে রয়েছে- নারী ভোটারদের কাছে তার অনেক উপরে ওঠা জনপ্রিয়তার পারদ। আর তিন নম্বরে বলা যায়- প্রতিপক্ষ বা প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী শিবিরে সমন্বয়হীনতা।

কয়েকটি নারী ভোটকেন্দ্রের ফল বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বিএনপির প্রার্থীর চেয়ে আইভীর ভোটের পাল্লা যথেষ্টই ভারী। অন্যদিকে, বিএনপির স্থানীয় নেতাদের নিজেদের কেন্দ্রগুলোতে ভোটের হার বিশ্লেষণেও ধানের শীষের প্রার্থীর পিছিয়ে পড়ার চিত্র পাওয়া গেছে।

তবে এর মধ্যেও সমালোচকরা বলছেন, প্রায় ৮০ হাজার ভোট বেশি পেয়ে আইভীর বিজয়ী হওয়ার ঘটনায় বিএনপির জনপ্রিয়তা নিয়ে প্রশ্ন তোলার কোনো কারণ নেই। তাদের দাবি, অপরিচিত আর ‘মুখোচোরা ভাবের’ সাখাওয়াতের বাক্সে ৯৬ হাজার ভোট পড়াকে ছোট করে দেখারও সুযোগ নেই। কেননা, জনপ্রিয়তাই যদি কমতো তাহলে বেশিরভাগ কাউন্সিলর কি করে বিএনপির হতো?

তবে এটা ঠিক, শত্রুর শত্রু সব সময়েই বন্ধু। এ সূত্রে হিসাব করলে, শামীম ওসমানের স্বদলীয় ‘শত্রু’ বাদেও প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দলের ‘শত্রুদের’ কেউ কেউ আইভীকে তুমুলভাবে সমর্থন করেছে হয়তো। তাতে লাভ বৈ ক্ষতি তো দেখি না। এক্ষেত্রে তাহলে বলতেই হয়, নৌকা প্রতীকের চেয়েও একধাপ এগিয়ে আছেন ব্যক্তি আইভী।


(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্ত নিজস্ব। আওয়ার নিউজ বিডি’র সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আওয়ার নিউজ বিডি আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় গ্রহণ করে না)