মেইন ম্যেনু

সেই ‘অপূর্ণাঙ্গ’ শিশুটি পূর্ণাঙ্গ সুস্থ জীবন নিয়ে বাড়ি ফিরলো

মা-বাবার সাথে পরিপূর্ণ সুস্থ জীবন নিয়ে হাসিমুখে বাড়ি ফিরে গেছে সেই অপূর্ণাঙ্গ জোড়া শিশু মোহাম্মদ আলী। প্রায় সাড়ে ৪ মাস আগে মাত্র তিনদিন বয়সে যখন শিশুটির দরিদ্র বাবা-মা শিশু মোহাম্মদ আলীকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএসএমএমইউ) নিয়ে এসেছিলেন।

বুধবার (২০ জুলাই) সকাল ১০টায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ডা. মিল্টন হলে শিশু সার্জারি বিভাগের উদ্যোগে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলন শেষে উপাচার্য অধ্যাপক ডা. কামরুল হাসান খান শিশু মোহাম্মদ আলীকে তার মায়ের কোলে তুলে দেন।

মোহাম্মদ আলীকে সম্পূর্ণ সুস্থ অবস্থায় কাছে মা হীরামনি বলেন, ‘আমি যে কি খুশি তা ভাষায় প্রকাশ করতে পারছি না; আমি গর্বিত ও আনন্দিত। অস্ত্রোপচারের আগে পর্যন্ত ভাবিনি ছেলেটি সুস্থ হয়ে উঠবে।’ তিনি সুস্থ ছেলেকে নিয়ে বাড়ি ফিরে যেতে পারছেন বলে মাননীয় উপাচার্য অধ্যাপক ডা. কামরুল হাসান খানসহ অত্র বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ এবং চিকিৎসা ও অস্ত্রোপচারের সাথে জড়িত সকলের প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানানোর পাশাপাশি শিশু মোহাম্মদ আলীর জন্য সকলের কাছে দোয়া প্রার্থনা করেন।

এর আগে সংবাদ সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের মাননীয় উপাচার্য অধ্যাপক ডা. কামরুল হাসান খান বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্তজার্তিক মানের চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। অপূর্ণাঙ্গ জোড়া শিশু মোহাম্মদ আলীর সফল অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা নতুন মাইলফলক রচনা করেছেন। শিশু মোহাম্মদ আলীর অভিভাবক তার পিতামাতা হলেও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শিশুটিকে সর্বাতত্মক সহায়তা করা হবে।’

তিনি আরো বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে বিদেশ থেকেও রোগীরা চিকিৎসা নিতে আসছেন। এ বিশ্ববিদ্যালয়কে আরো এগিয়ে নিতে বর্তমান প্রশাসন আন্তরিকভাবে নিরলস প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।’

সংবাদ সম্মেলনে আরো বক্তব্য দেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মানিত উপ-উপাচার্য (গবেষণা ও উন্নয়ন) অধ্যাপক ডা. মো. শহীদুল্লাহ সিকদার, উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. মো. শারফুদ্দিন আহমেদ, উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক ডা. এএসএম জাকারিয়া (স্বপন), কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. মো. আলী আসগর মোড়ল, শিশু (প্যাডিয়াট্রিক) সার্জারি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. মো. রুহুল আমিন, নবজাতক বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. মো. আব্দুল মান্নান, শিশু (প্যাডিয়াট্রিক) সার্জারি বিভাগের অধ্যাপক ডা. মো. তোসাদ্দেক হোসেন সিদ্দিকী প্রমুখ। এসময় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিষ্ট্রার অধ্যাপক ডা. এবিএম আব্দুল হান্নান, প্রক্টর অধ্যাপক ডা. মো. হাবিবুর রহমান দুলাল, শিশু সার্জারি বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. শফিকুল হক, এনেসথেসিয়া টিমে ছিলেন এনেসথেশিয়া, এনালজেসিয়া অ্যান্ড ইনটেনসিভ কেয়ার মেডিসিন বিভাগের সিনিয়র কনসালটেন্ট ডা. মনজুরুল হক লস্করসহ শিশু সার্জারি বিভাগের সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকবৃন্দ ও সম্মানিত সাংবাদিকবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।

উল্লেখ্য, আরেকটি শিশুর শরীরের প্রায় অর্ধেক অংশ নিয়ে জন্মানো মোহাম্মদ আলী নামের পূর্ণাঙ্গ শিশুটি গত ৭ মার্চ জন্মগ্রহণ করে। জন্মের ৩ দিন পর থেকে অর্থাৎ ১০ মার্চ থেকে শিশুটি বিএসএমএমইউতেই চিকিৎসাধীন ছিল। অপূর্ণাঙ্গ শিশুটির একটি কিডনী, মূত্রাশয় ও লিঙ্গ ছিলো যা দিয়ে সে নিয়মিত প্রসাব করতো। অপূর্ণাঙ্গ শিশুটি সংযুক্ত ছিলো পূর্ণাঙ্গ শিশুটির পেটের ডান দিকে এবং অপূর্ণাঙ্গ শিশুটির পিঠের হাড় পূর্ণাঙ্গ শিশুটির বুকের হাড়ের সাথে মিশানো ছিল। এছাড়া পূর্ণাঙ্গ শিশুটির নাভিও অসম্পূর্ণ যাকে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় এক্সমফালোস এর ভিতরের যকৃৎ ও খাদ্যনালী একটি পর্দা দিয়ে ডাকা অবস্থায় ছিল, বর্তমানে এটার অবস্থা ভালো। গত ২০ জুন ২০১৬ইং তারিখে পেডিয়াট্রিক সার্জারি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. মোঃ রুহুল আমিনের নেতৃত্বে ১৮ সদস্যের মেডিকেল টিম সফল অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ শিশু থেকে অপূর্ণাঙ্গ শিশুটিকে আলাদা করেন।

প্রসঙ্গত, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে শিশু সার্জারি বিভাগ অতীতেও এ ধরণের জটিল অস্ত্রোপচারের ক্ষেত্রে গৌরবোজ্জ্বল নেতৃত্বের ভূমিকা পালন করে আসছে। গত ২০০৮ সালে বহুল আলোচিত বন্যা ও বর্ষাকে মাত্র তিন মাস বয়সে শিশু সার্জারি বিভাগের তৎকালীন চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. মো. শফিকুল হকের নেতৃত্বে দীর্ঘ ৮ ঘণ্টাব্যাপী সফল অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে আলাদা করা হয়েছিল। তবে বর্ষার হৃদযন্ত্র বন্যার উপরে নির্ভরশীল থাকায় আলাদা করার পর বর্ষাকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি। বন্যা গত ২৪ মার্চ তারিখে আট বছর পূর্ণ করেছে। এছাড়া বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে শিশু সার্জারি বিভাগে সফল অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে আরও একটি শিশুর পেটের ভেতর থেকে তিনটি অসম্পূর্ণ শিশু বা প্যারাসাইটিক ট্রিপলেট অপসারণ করা হয়।