মেইন ম্যেনু

সেই ৩ পুলিশের কী হবে?

সিলেটের শিশু সামিউল আলম রাজন হত্যার বিচার গতকাল রোববার শেষ হয়েছে। আলোচিত ওই মামলায় চারজন আসামির ফাঁসির আদেশ দিয়েছেন আদালত। কিন্তু ওই হত্যাকাণ্ড ধামাচাপা দেয়ার অভিযোগ ওঠা তিন পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে তদন্তই শেষ হয়নি এখনো।

জালালাবাদ থানার তৎকালীন ওসি (তদন্ত) আলমগীর হোসেন, সাব ইন্সপেক্টর (এসআই) জাকির হোসেন ও এসআই আমিনুল ইসলামের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে তারা রাজন হত্যার ঘটনা ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা করেছিলেন। নিহত রাজনের বাবার অভিযোগ আমলে না নিয়ে মূল আসামিদের আড়াল করে ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নয় এমন দুজনকে আসামি করে তারা মামলা দায়ের করেন এবং হত্যাকাণ্ডের মূল হোতা ও ঘাতক কামরুলকে ৬ লাখ টাকার বিনিময়ে সৌদি আরবে পালিয়ে যেতে সহযোগিতা করেন।

এ অভিযোগ ওঠার পর ওসি আলমগীর হোসেনকে সিলেট থেকে প্রত্যাহার করে তাকে রংপুর রেঞ্জে সংযুক্ত করা হয়। আর সাময়িক বরখাস্ত করা হয় এসআই জাকির হোসেন ও এসআই আমিনুল ইসলামকে। ঘটনার পর পুলিশের ভূমিকায় জনমনে সৃষ্ট ক্ষোভের প্রেক্ষিতে সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের পক্ষ থেকে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। ওই তদন্ত কমিটি প্রাথমিক তদন্তে রাজন হত্যার ঘটনায় পুলিশের গাফিলতির ‘প্রাথমিক প্রমাণ’ পাওয়ায় গত ২৪ জুলাই শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়।

ওসি তদন্ত পরিদর্শক পদমর্যাদার কর্মকর্তা হওয়ায় তার বিরুদ্ধে তদন্তের জন্য পুলিশ সদর দপ্তর ডিআইজি পদমর্যাদার এক কর্মকর্তাকে নির্দেশ দেয়। অন্য দুই সাব ইন্সপেক্টরের বিরুদ্ধে তদন্তের দায়িত্ব পান সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের এক উর্ধ্বতন কর্মকর্তা। ঘটনার প্রায় চার মাস পেরিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত ওই তদন্তের দায়িত্বপ্রাপ্তরা তাদের তদন্ত শেষ করতে পারেননি বলে নিশ্চিত করেছে পুলিশের একাধিক সূত্র।

অভিযোগে প্রকাশ, চাঞ্চল্যকর রাজন হত্যাকাণ্ডের পর ঘটনাটিকে ধামাচাপা দিতে জালালাবাদ থানার এসআই আমিনুল, সেকেন্ড অফিসার জাকির হোসেন ও ওসি তদন্তের দায়িত্বে থাকা ইন্সপেক্টর আলমগীর হোসেন বিতর্কিত ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। জালালাবাদ থানার ওসি (অপারেশন) আখতার হোসেন ঘটনার প্রাক্কালে ছুটিতে ছিলেন।

নির্মম এ ঘটনার পর নিহত রাজনের বাবা শেখ আজিজুর রহমান থানায় মামলা দিতে গেলেও পুলিশ তার মামলা নেয়নি। উল্টো এসআই আমিনুল রাজনের বাবাকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে থানা থেকে বের করে দেন। ততক্ষণে মূল আসামি কামরুল সনাক্ত হলেও এসআই আমিনুল ইসলাম নিজে বাদি হয়ে কামরুলকে বাদ দিয়ে অন্য আরো দুই ব্যক্তিকে আসামি করে থানায় মামলা দায়ের করেন। এমনকি ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী দুই ব্যক্তি আজমত উল্লাহ ও ফিরোজ আলী থানায় গিয়ে ঘটনার বর্ণনা দেন।

কিন্তু পুলিশ তাদের বক্তব্য আমলে না নিয়ে উল্টো আজমত উল্লাহ ও ফিরোজ আলীকে মামলায় আসামি করে। অবশ্য, এ দুজনকেই আদালত গতকাল প্রদত্ত রায়ে বেকসুর খালাস দিয়েছেন।

ঘটনাটিকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করতে মামলার প্রত্যক্ষদর্শী ইসমাইল আলী আবরুছ নামের এক ব্যক্তিকে ঘটনাস্থলের কয়েক কিলোমিটার দূরে তার বাড়ি থেকে ধরে এনে নাটক সাজানোর চেষ্টা করে পুলিশ। পুলিশ এদেরকে গ্রেপ্তার করে ঘটনায় জড়িত মর্মে স্বীকারোক্তি আদায়ের চেষ্টা চালায়। গতকাল খালাসপ্রাপ্ত চার জনকেই পুলিশ ফাঁসানোর চেষ্টা করে মামলায়।

অথচ, পরবর্তীতে এ ঘটনায় জড়িত প্রকৃত আসামিদের সবাইকেই এলাকাবাসী আটক করে থানায় হস্তান্তর করেন। একজন আসামিকেও গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। শুধু তাই নয়, অভিযোগ রয়েছে, জালালাবাদ থানার তৎকালীন সেকেন্ড অফিসার এসআই জাকির হোসেন ও এসআই আমিনুল ইসলাম মামলার মূল আসামি কামরুলকে বিদেশ পালিয়ে যেতে সহায়তা করেন। এর বিনিময়ে প্রায় ৬ লাখ টাকা নেন তারা কামরুলের পরিবারের কাছ থেকে।

কামরুলের পরিবার দুটি সিএনজি অটোরিক্সা বিক্রি করে তাদেরকে এই ঘুষ প্রদান করে। এত সব অভিযোগের পরও পুলিশের এই তিন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়নি এখনো।

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ প্রমাণিত হলে ওই পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে পুলিশ আইনের ৭২৯ ধারা, পিআরবির ৪৩৪৮৫৭ নং নিয়ম অনুযায়ী চাকুরী থেকে অপসারণ, চাকুরী থেকে বরখাস্তকরণ, পদাবনতি, পদোন্নতি স্থগিত করণ, বেতন বৃদ্ধি স্থগিতকরণ, সতর্কীকরণ, তিরস্কার ইত্যাদি শাস্তির বিধান রয়েছে।

এছাড়া, সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ এক্ট-২০০৯ (২০০৯ সালের ২৩ নং আইন)-এর ১১০ ধারাতেও পুলিশ কর্মকতার্দের কর্তব্যে অবহেলার বিরুদ্ধে একই ধরনের শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। কিন্তু, বিতর্কিত ওই তিন পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে এখনো তদন্ত শেষ না হওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া যাচ্ছেনা বলে জানিয়েছেন সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা।

সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের এডিসি (মিডিয়া) মো. রহমত উল্লাহ জানান, পরিদর্শক আলমগীর হোসেনের বিরুদ্ধে রংপুর পুলিশের ডিআইজি রেঞ্জের এক কর্মকর্তা তদন্ত করছেন। আর এসআই জাকির ও এসআই আমিনুলের দায়িত্বে অবহেলার বিষয়টি তদন্ত করছেন সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের এক উর্ধ্বতন কর্মকর্তা। ঠিক কবে নাগাদ এই তদন্ত শেষ হবে, সে ব্যাপারে নিশ্চিত কিছু জানাতে পারেননি সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের এই মুখপাত্র।বাংলামেইল