মেইন ম্যেনু

‘সেদিন নেত্রীকে ছেড়ে যাননি কেউই’

ঘটনার পর পেরিয়ে গেছে অনেকগুলো বছর কিন্তু এখনো সেই দিনটির কথা মনে হলেই যেন শিহরিত হয়ে উঠেন সবাই। দিনটি যেন একটা দুঃস্বপ্নের রাতের মতো। ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট আওয়ামী লীগের সমাবেশে গ্রেনেড হামলার সময় কিভাবে যে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনাকে রক্ষা করেছিলেন আওয়ামী লীগের নেতা কর্মীরা সেটা যেন একটা ইতিহাস। সেই দুঃসহ সংকটকালেও নেত্রীকে ছেড়ে যাননি কেউই। নিজের জীবন দিয়ে হলেও তাকে রক্ষার চেষ্টা করেছেন সবাই।

সেই দুঃস্বপ্নের কথাই আর একবার বর্ণনা করলেন আওয়ামী লীগের মন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া। তিনি বলেন, ওই সময়ে আর কোনো কিছুই মাথায় আসেনি। শুধু মনে হয়েছিলো নিজের জীবন গেলে যাবে কিন্তু নেত্রীকে রক্ষা করতে হবে। সেজন্যই নিজেদের কি হবে সেই চিন্তা না করে আমরা কয়েকজন তাকে ঘিরে মানব ঢাল গড়ে তুলি। সেই সময়ের সেই নৃশংস ঘটনা থেকে নিজেদের নেত্রীকে রক্ষা করতে আমরা তাকে সবাই মিলে ঘিরে গাড়িতে তুলে সুধা সদনের দিকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করি। কিন্তু নেত্রী এত সব রক্তাক্ত মানুষকে ছেড়ে কিছুতেই যাবেন না। তবু আমি, মজিদ, জাহাঙ্গীর আর মামুন তাকে নিয়ে ছুটছি। গাড়িতে মুহুর্মুহ বুলেট এসে লাগছে। কিভাবে যে সেই দিনটি গেছে তা আর ভাবতেও পারি না।

একইভাবে সেই দুঃসহ দিনের কথা বর্ণণা করেন বর্তমানে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের মেয়র সাইদ খোকন। সেই সময়ে বাবা মোহাম্মদ হানিফের সঙ্গে সেখানে উপস্থিত ছিলেন সাঈদ খোকন। নেত্রীকে রক্ষার ওই মানবঢালে ছিলেন তার বাবাও। ফলে গ্রেনেডের স্প্রিন্টার ঢুকে যায় তার মাথায় ও শরীরে। মাথার স্প্রিন্টার বের করতে না পারায় কয়েক বছর ভুগে মারা যান মোহাম্মদ হানিফ। সেই দিনের কথা মনে করে সাঈদ খোকন বলেন, তখন আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর ভাষণ প্রায় শেষ। এক ফটোগ্রাফারের অনুরোধে আবারো দুই একটি কথা বলছেন তিনি। ট্রাকের নিচের সিঁড়িটিতে বসে ছিলাম আমি। হঠাৎ একটি বিষ্ফোরণ। তারই কিছুক্ষণের মধ্যেই আরো কয়েকটি বিষ্ফোরণ। কিছু বুঝে ওঠার আগেই মনে হলো আমার পা যেন আগুনে ঝলসে গেলো। দেখলাম আমার বাম পায়ে স্প্রিন্টার ঢুকে গেছে। ডান পায়ে খোঁড়াতে খোঁড়াতে একটু এগিয়ে দেখি, বাবারা কয়েকজন মিলে নেত্রীকে বাঁচাতে মানববর্ম তৈরি করেছেন। সেখানে বাবা তার বুক আর মাথা দিয়ে যতটা পারেন আগলে রেখেছেন নেত্রীকে। এসময়ই তার মাথায় স্প্রিন্টারগুলো ঢুকে পড়ে। বাবার শরীরের রক্তে ভিজে যাচ্ছে নেত্রীর শাড়ি। কোনোরকমে তারা কয়েকজনে নেত্রীকে গাড়িতে তুলে দেন। পরে আমাদের পাশেই যুবলীগের অফিসে নিয়ে যাওয়া হয়। ওই রক্তাক্ত অবস্থাতেই আমার বাবা তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া জানান। তারপর তাকে ও আমাকে অ্যাম্বুলেন্সে করে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। এর পর উন্নত চিকিৎসার জন্য দেশের বাইরেও যাই আমরা।

সেই দুর্যোগপূর্ণ সময়ে যখন মানুষের বোধবুদ্ধি লোপ পেয়ে যায় সেই সময়েও এভাবে দলের নেত্রীকে রক্ষা করার চিন্তা কেবল মনের ভেতরে ভালোবাসা থাকলেই করা সম্ভব বলে মনে করেন দুজনেই। মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া বলেন, তখন অন্য কিছু আর কেউ ভাবিনি, শুধু ভেবেছি, যে করেই হোক নেত্রীকে রক্ষা করতে হবে। আরেকটি ১৫ আগস্ট হতে দেব না আমরা। এতে নিজের জীবন গেলে যাবে। আগে নেত্রীকে নিরাপদ জায়গায় রাখি তারপর যা হওয়ার তা দেখা যাবে। শেষপর্যন্ত সেদিন তাকে রক্ষা করতে পেরে আমরা আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞ। সেই গ্রেনেড হামলার পরেও কিন্তু আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের উপর আরো নির্যাতন হলো। তাদের উপরে টিয়ারগ্যাস ছুড়ে মারা হলো। হাসপাতালে চিকিৎসা মিললো না। রাতেই ধুয়ে মুছে ঘটনাস্থল পরিস্কার করে ফেলা হলো। এবং এখনো সেই ঘটনার বিচার হলো না।

একই কথা বলেন সাঈদ খোকনও। তিনি বলেন, ওই সময়ে একজন মানুষ তার সিদ্ধান্ত নেয়ার ও চিন্তা করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। সেই অবস্থাতেও আমার বাবারা সবাই মিলে নেত্রীকে রক্ষার যে চেষ্টা করেছেন তা তাদের মনে ছিলো বলেই সম্ভব হয়েছে। তারা মনেই সেটা ধারণ করতেন বলেই সেই দুর্যোগের সময়েও নিজেদের জীবনের চিন্তা বাদ দিয়ে এই সিদ্ধান্তই নিয়েছিলেন। বাবারা কয়েকজন মিলে যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন তা খুবই অনুকরণীয়। মনের ভেতর মায়া ও আনুগত্য থাকলেই কেবল তেমন করা সম্ভব।

দলের নেত্রীর প্রতি দলের কর্মীদের তীব্র ভালোবাসা প্রকাশিত হয়েছে দুর্যোগের সময়ও এমন আচরণের মধ্যে দিয়ে। সেই সময়ে তো বটেই এখনো দলের নেতাকর্মীরা সেই মনোভাবই ধারণ করেন বলে মনে করেন এই দুজন। মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া বলেন, এই পর্যন্ত দলনেত্রীকে হত্যার জন্য ১৯ বার চেষ্টা করা হয়েছে। বারবারই তাকে আল্লাহ রক্ষা করেছেন। এখন যারা দলে আছেন তারাও নেত্রীকে আগলে রাখতে চান সবদিক দিয়েই। সবাই বিশ্বাস করে তাকে দিয়েই আল্লাহ নিশ্চয়ই দেশের জন্য এমন কিছু কাজ করিয়ে নিতে চান বলেই বারবার তাকে ঘাতকদের হাত থেকে রক্ষা করেছেন।

একইভাবে সাঈদ খোকন মনে করেন, দলের পরবর্তী নেতাকর্মীদের জন্য সেই ঘটনায় নিহত ও আহতরা যে দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন তা কখনো ভোলার নয়। এবং সবাই সেই সব কথা সবসময় মনে রাখে। এখনো যারা দলে আছে তারা সবাই জীবন দিয়ে হলেও নেত্রীকে রক্ষার মনোভাব পোষন করেন।

২০০৪ সালের ২১ আগস্ট তৎকালীন বিরোধী দল আওয়ামী লীগের সমাবেশে চালানো ভয়াবহ সেই গ্রেনেড হামলায় প্রাণ হারান ২৪ জন। আহত হন প্রায় ৪শ জন।

এই বর্বরোচিত গ্রেনেড হামলায় নিহতরা হলেন, আইভি রহমান, প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত নিরাপত্তারক্ষী ল্যান্স করপোরাল (অব:) মাহবুবুর রশীদ, আবুল কালাম আজাদ, রেজিনা বেগম, নাসির উদ্দিন সরদার, আতিক সরকার, আবদুল কুদ্দুস পাটোয়ারি, আমিনুল ইসলাম মোয়াজ্জেম, বেলাল হোসেন, মামুন মৃধা, রতন শিকদার, লিটন মুনশী, হাসিনা মমতাজ রিনা, সুফিয়া বেগম, রফিকুল ইসলাম (আদা চাচা), মোশতাক আহমেদ সেন্টু, মোহাম্মদ হানিফ, আবুল কাশেম, জাহেদ আলী, মোমেন আলী, এম শামসুদ্দিন এবং ইসাহাক মিয়া।

মারাত্মক আহত হন শেখ হাসিনা, আমির হোসেন আমু, প্রয়াত আব্দুর রাজ্জাক, সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, ওবায়দুল কাদের, এডভোকেট সাহারা খাতুন, প্রয়াত মোহাম্মদ হানিফ, আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, নজরুল ইসলাম বাবু, আওলাদ হোসেন, সাঈদ খোকন, মাহবুবা পারভীন, এডভোকেট উম্মে রাজিয়া কাজল, নাসিমা ফেরদৌস, শাহিদা তারেক দিপ্তী, রাশেদা আখতার রুমা, হামিদা খানম মনি, ইঞ্জিনিয়ার সেলিম, রুমা ইসলাম, কাজী মোয়াজ্জেম হোসেইন, মামুন মল্লিক প্রমুখ।