মেইন ম্যেনু

সেবা না বাড়িয়েই ভাড়া বাড়ছে ট্রেনে

ট্রেনের সিটে ছারপোকা, ছেঁড়া-ফাটা সিট, পাখা ঘোরে না। ট্রেনের জানালা একবার বন্ধ হলে আর খোলে না। টয়লেটে নেই পানি। সময়সূচি ঠিক থাকে না প্রায়ই। প্রায় প্রতি সপ্তাহে ঘটছে একাধিক দুর্ঘটনা। এমন হাজারো সমস্যা আর অব্যবস্থাপনায় জর্জরিত বাংলাদেশ রেলওয়ে।

যাত্রীসেবার এই দুরবস্থার মধ্যেই আবার ভাড়া বাড়ানো হচ্ছে ট্রেনের। রেল মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, আসছে ফেব্রুয়ারি থেকে ট্রেনে ভাড়া বাড়ছে ৭.৮ শতাংশ। রেলওয়ের এ-সংক্রান্ত প্রস্তাব প্রধানমন্ত্রীর কাছে পাঠানো হয়েছে। তার অনুমতি পেলে আগামী মাস থেকেই রেলের বর্ধিত ভাড়া কার্যকর হবে।

এবার ভাড়া কী হারে বাড়ছে জানতে চাইলে রেলসচিব ফিরোজ সালাহউদ্দিন বলেন, “প্রধানমন্ত্রীর কাছে পাঠানো প্রস্তাবে ৭ দশমিক ৮ শতাংশ ভাড়া বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। এতে সর্বনিম্ন ভাড়া বাড়বে পাঁচ টাকা। আর ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথের ট্রেনে শোভন শ্রেণির ভাড়া ৪৫ টাকার মতো বাড়তে পারে।”

রেলওয়েকে লোকসানের হাত থেকে বাঁচাতে ভাড়া বাড়ানোর এই উদ্যোগ জানিয়ে সচিব বলেন, এখন থেকে প্রতি বছরই রেলভাড়া সমন্বয় করা হবে। তবে জ্বালানি তেলের দাম না বাড়লে কখনোই তা সাড়ে ৭ শতাংশের বেশি হবে না।

এর আগে গত ২০১২ সালের বাংলাদেশে ট্রেনের ভাড়া বাড়ানো হয় ৫০ শতাংশ। কিলোমিটার প্রতি গড় ভাড়া ২৪ পয়সা থেকে বাড়িয়ে করা হয় ৩৬ পয়সা। যদিও বাস্তবে এই বৃদ্ধি কোথাও কোথাও ৫০ শতাংশে না থেকে শতভাগও হয়েছে। যেমন, ঢাকা থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় আন্তনগর শোভন চেয়ার টিকিটের মূল্য ছিল ৬৫ টাকা, সেটি বৃদ্ধি পেয়ে হয় ১৩৫ টাকা।

কিন্তু ভাড়া বাড়লেও যাত্রীসেবার মান বাড়েনি এতটুকু। এর মধ্যে পৃথক মন্ত্রণালয় গঠনের পর রেলওয়ের জন্য বরাদ্দও বেড়েছে। কিন্তু যাত্রীসেবার মান বাড়ার বদলে ক্ষেত্রবিশেষে কমেছে সেবার মান। দুর্ঘটনা, সিডিউল বিপর্যয়সহ ঘটছে অহরহ।

আজ বুধবার বিকাল পাঁচটার দিকে কমলাপুর স্টেশন থেকে ছেড়ে যাওয়া ৭৭৬ নম্বর সিরাজগঞ্জ–ঈশ্বরদী এক্সপ্রেস ট্রেনের যাত্রী সেলিমা জুই ট্রেনের ভেতরের এক ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “আমি প্রায় ঢাকা আসি পাবনা থেকে। ট্রেনের সিটে ছারপোকা, ছেঁড়া-ফাটা সিট। ফ্যানের পাখা ঘোরে না। বন্ধ হয় না জানালা, একবার বন্ধ হলে আর খোলে না। টয়লেটে পানি নেই। বিনা টিকেটের যাত্রীদের চাপে বসা দায়। হকার-পকেটমারের উৎপাত। ট্রেনের চেকারদের বললে তারা বলে, তাদের কিছু করার নাই।”

ট্রেনের বিলম্ব যাত্রা কিংবা বিলম্ব আগমন নিয়মিত চিত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে রেলে। এসবের জন্য কে বা কারা দায়ী তা কোনো দিন তদন্ত করে দেখা হয় না বলে অভিযোগ যাত্রীদের। সিলেট থেকে জয়ন্তিকা ট্রেনটি কমলাপুরে পৌঁছার কথা বিকেল চারটা নাগাদ। ট্রেনটি ভৈরব পর্যন্ত মোটামুটি সিডিউল মেনে এলেও তার পরে কমলাপুরে আসতে বেশি সময় নেয় প্রায় দুই ঘণ্টা।

শুধু এটি নয়, প্রায় সব কটি আন্তঃনগর ট্রেনের একই অবস্থা। কিন্তু যাত্রীদের অভিযোগ কখনো আমলে নেয়নি রেলওয়ে।

দীর্ঘদিন ধরে ট্রেনে যাতায়াত করেন এমন একজন যাত্রী বলেন, ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম যেতে আন্তঃনগর ট্রেনে সময় লাগে ৭-৮ ঘণ্টা। কখনো কখনো ১০ ঘণ্টাও লেগে যায়। অথচ নব্বইয়ের দশকে ৫ ঘণ্টায় এ পথে যাতায়াত করা যেত। অনেক আন্তঃনগর ট্রেনের স্টপেজ বাড়ানোয় সেগুলো এখন অনেকটাই লোকাল ট্রেনে পরিণত হয়েছে বলে জানান তিনি।

নিরাপদ পরিবহন মনে করা হলেও ট্রেনে দুর্ঘটনা বাড়ছেই। গত অর্থবছরে ট্রেন দুর্ঘটনা বেড়ে দাঁড়ায় ২০০-এর বেশি। গড়ে প্রতি সপ্তাহে তিনটি দুর্ঘটনা ঘটছে। আগের দুই বছরে দুর্ঘটনার সংখ্যা ছিল যথাক্রমে ১৫৪ ও ১৭৭। কিন্তু কোনো একটি দুর্ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত না হওয়ায় শাস্তি হয়নি কারো। রেলওয়ের সেতুগুলোর প্রায় অর্ধেক ঝুঁকিপূর্ণ।

পরিসংখ্যানে দেখা যায়, গত কয়েক বছরে রেলওয়ের সময়ানুবর্তিতারও কোনো উন্নয়ন হয়নি। বর্তমানে বিভিন্ন ট্রেন গড়ে ৭৮ শতাংশ সময়ানুবর্তিতা মেনে চলে। গত বছর এ হার ছিল ৮২ শতাংশ, তার আগের বছর ছিল ৮১ শতাংশ।

নিয়মিত মনিটরিংয়ের অভাব, পুরাতর লাইন মেরামত না করা, লাইনে পাথর না থাকা, সাবেক ড্রাইভার-গার্ডসহ নানা ক্যাটাগরির কর্মী দিয়ে জোড়াতালি দিয়ে রেল চালানো, মান্ধাতার আমলের রেল ব্যবস্থাপনাসহ নানাবিধ অনিয়মের কারণে এখন ধুঁকছে রেল।

যদিও রেলমন্ত্রী মুজিবুল হক এই দুর্দশার জন্য বিএনপি আমলের অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি ও অবহেলাকে দায়ী করছেন। তিনি দাবি করেন, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর রেলওয়ের উন্নয়নে বিশেষ উদ্যোগ নেয়। এতে রেলের দুর্নীতি অনেকটাই কমে এসেছে। রেলওয়ের দুর্নীতি, দায়িত্বে অবহেলা এবং যাত্রীসেবার বাড়ানো হচ্ছে।

মন্ত্রী আরো বলেন, “ট্রেনের সিটে ছারপোকা আছে এমন অভিযোগ আমি শুনেছি। ভারত ও মালয়েশিয়া থেকে আসছে নতুন বগি। এগুলো এসে গেলে যাত্রীরা আরামে যাতায়াত করতে পারবেন।”

বাংলাদেশ রেলওয়ে মহাপরিচালক মো. আমজাদ হোসেন বলেন, বিশ বছর পুরানো ৬৫ শতাংশ ইঞ্জিন এখন আর নেই। নতুন ইঞ্জিন দিয়ে ট্রেন চলছে। আগামীতে আরো উন্নত মানের ইঞ্জিন আনা হচ্ছে।ঢাকাটাইমস