মেইন ম্যেনু

সে-ও আমাকে খারাপ কিছুই করেছে…

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন জানিয়েছেন নিজের সমস্যার কথা। আমার জীবনে এত বড় সংকট কখনো আসবে আমি ভাবিনি। বাবা মা এবং এক মাত্র ভাই সবাই আমাকে খুব আদর করে, এমন কখনো হয়নি যে কিছু চেয়ে পাইনি। যখন ক্লাস টেনে পড়তাম তখন এক ক্লাস মেট আমাকে প্রপোজ করে বসে, আমার কল্পনাতে যেমন মানুষের ছবি আঁকা ছিল, তার সাথে ছেলেটির কোন মিল ছিল না। তবে সেই সময়ে কম বয়সের আবেগে আমি ছেলেটির মন ভাংতে পারলাম না, তার পাশে থাকলাম এবং কথা দিলাম যে সে যদি নিজেকে পড়াশুনা করে ভাল অবস্থানে নিয়ে যেতে পারে আমি তার পাশে সারা জীবন থাকব।

এক বছর ভালই কাটছিল। সমস্যা শুরু হল মেট্রিকের রেজাল্টের পর, আমি গোল্ডেন এ প্লাস পেলাম কিন্তু ছেলেটি পেল এ মাইনাস। আমি তবু তার পাশে থাকলাম, বললাম চেষ্টা চালিয়ে যেতে। কিন্তু এ মাইনাস রেজাল্টে ভাল কলেজে চান্স পাওয়া মুশকিল আর যেসব কলেজ ভাল নয়, সেসব কলেজের পরিবেশও ভাল থাকেনা। ছেলেটি সেখানে গিয়ে সিগেরেট ধরলো, আমি তখন তার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করলাম। কারণ যে আমার অনুরোধ, কেয়ার এসব অগ্রাহ্য করে ওই জিনিস স্পর্শ করলো, সে আরো অনেক কিছুই করতে পারে। নামী কলেজে এডমিশন নিলাম, আমার তখন মনে হত আমার কল্পনার যে মানুষ, তেমন কেউ আসলে এক্সিস্ট করে না। ব্রেকআপের পর খুব লোনলি লাগত, বন্ধু বান্ধবও তেমন ছিল না, কলেজে আমি একা হাঁটতাম, তখন কৃশকায় একটি ছেলে আমার পাশে হাঁটা শুরু করলো। সে আমাকে গান শুনাতো, ভালবাসবে বলে প্রতিশ্রুতি দিল, আমি আবারও ফাঁদে পরলাম। ফাঁদ বলছি একারণে, সম্পর্কের প্রথম কদিন সে বাবু হয়ে আসলেও কদিন পরে দেখলাম তার শার্টের হাতায় ময়লা। মানে ঠিক আমার রুচির সাথে মেলে না। এদিকে কিছু ক্লাসমেট-এর ফিসফাসও কানে এলো যে এত সুন্দর মেয়ে শেষে এই ছেলের কাছে ধরা খেল! এসব শুনে মন বিষাক্ত হয়ে,তার সাথে প্রতিদিন ঝগড়া হত। মনে অশান্তি,আমি তার ভিতরের পশুটিকে দেখলাম। সে নানান ভাবে আমাকে আঘাত করতে চাইত। এমনকি আমাকে ধর্ষণ-এর হুমকিও দিয়েছিল। বহু কষ্টে ফ্যামিলির হস্তক্ষেপের পর মুক্তি পেলাম, কিন্তু আমার ইনটারের রেজাল্ট যাচ্ছে তাই হল। আমি ভেঙে পড়লাম।

অনেক দিন কেটে গেল। প্রেম ভালবাসা থেকে মন উঠে গেল। তখন সত্যিকার অর্থে আমি আমার প্রিন্স চার্মিং-এর দেখা পেলাম। তিনি দেখতে অনেক সুদর্শন, পড়াশুনায় অনেক ভাল। একদম আমার মনের মত। আর কি অবাক কান্ড, তিনি আমাকে ভালবাসলেন। আমি অনুভব করেছিলাম তিনি আমাকে সত্যিই ভালবাসেন। তিনি আমাকে স্বপ্ন দেখাতেন, আমি স্থাপত্যকলা পড়ছি, তিনি চাইতেন আমি যেন মন দিয়ে পড়ি। আমিও ভালবাসি তাকে, তাকে নিয়েই ভাবি সারাদিন। ভবিষ্যৎ নিয়ে নানান প্ল্যান। কিন্তু আগের দুইটা রিলেশনের কথা মাঝে মাঝে মনে আসত। তখন আমি তার সাথে খারাপ ব্যবহার করে ফেলতাম। একটা উদাহরণ দেই, আমার প্রিন্স চার্মিং আমাকে ভালবেসে জড়িয়ে ধরেছিলেন, আমাদের মধ্যে লিপ কিস হয়, অবশ্যই আমার অনুমতি নিয়েই হয়। কিন্তু একদিন হঠাৎ করে আমার পুরোন প্রেমিক যে আমাকে হুমকি দিয়েছিল তার কল পেয়ে আমি আবার বিষণ্ণতায় মগ্ন হয়ে সব কেমন গুলিয়ে ফেলি। আমার ভালবাসার মানুষটিকে বলে ফেলি যে সে-ও আমাকে খারাপ কিছুই করেছে, ভালবাসেনি। এতবড় কথাটি শুনে তিনি কেমন যেন আমার থেকে সরে গেলেন। সরে যেতে দেখে আমার আরো খারাপ লাগে, আমি আরো তাকে অনেক ঝাঁঝালো কথা শুনাই, রাগের মাথায়। তিনি সিদ্ধান্ত নেন তিনি আমার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করবেন। আমিও সায় জানিয়ে দেই। এও বলে দেই সব ছেলে খারাপ। তারপর আবার রাগ কমলে নিজেই সরি বলে তার কাছে গেছি। তিনি আমাকে গ্রহনও করেছেন কিন্তু কদিন বাদে আবার আমারই রাগের জন্য ঝগড়া হয়, আবার ব্রেক আপ। আবার আমি অনুতপ্ত হই।

এই করে করে এক বছর দুই জনেই অশান্ত। তারপর গত তিনমাস আগে ফাইনাল ব্রেক আপ। কিন্তু আপু, কদিন পর মাথা ঠান্ডা করে ভেবে দেখলাম আমি আসলেই বার বার ভুল করেছি। আমি অনুতপ্ত হয়ে তার কাছে আবার ফিরে গেছি, আমার বন্ধুদেরদের দিয়ে বলিয়েছি। কিন্তু তিনি আমাকে আর ভালবাসতে পারবেন না বলেন। কিন্তু পুরানো চিঠি, ছবিগুলি দেখলে আমি বুঝি তিনি আমাকে কতটা ভালবাসতেন। আমি নিজেই নষ্ট করেছি সেই পবিত্র সম্পর্ক,তাই আমি ভাল নেই। প্লিজ আমাকে বলুন আমি কী করে তাকে ফিরে পাব। তিনি আমার সাথে কথা বলতেই রাজি না। সব জায়গায় ব্লক। আমার দোষ আমি তাই প্রায়শ্চিত্ত করতে চাই। কী করব আমি? নিজের কাছেই ছোট হয়ে আছি আমি, কীভাবে সব আগের মত হবে? হারানো ভালবাসা ফিরে পাব? সুখী হব?

পরামর্শ:
আপু, আপনার চিঠি পড়ে আমি কয়েকটি ব্যাপার লক্ষ্য করলাম। এবং মনে হচ্ছে যে এই সমস্যাগুলো আসলে আপনার জীবনে অশান্তি তৈরির মূল কারণ। আপনি অনেক গুছিয়ে চিঠি লিখেছেন, কাব্যিক ভাষায়। বুঝতে পারছি যে আপনি খুবই আবেগী, নিজের চার পাশে সবকিছু সুন্দর আর টিপটপ পছন্দ করেন। আপনার সব কিছু পারফেক্ট চাই! আর এই পারফেক্ট পারফেক্ট খুঁজতে গিয়ে আপনার জীবনে একের পর এক ভুল হয়েই গিয়েছে।

কেউ এ মাইনাস পেলো, এটা সম্পর্ক ভাঙার কারণ হতে পারে না। হ্যাঁ, সিগারেট ধরেছে এটা অবশ্যই একটা কারণ। কিন্তু এত বড় কারণও নয় যে সম্পর্ক ত্যাগ করতে হবে। যাই হোক, তখন বয়স অনেক কম ছিল, সম্পর্ক ত্যাগ করে আসলে খুব ভালো করেছেন। কিন্তু আপু, শার্টের হাতায় ময়লা বলে একজন মানুষকে ছেড়ে দেবেন? ছেলেরা স্বভাবতই একটু এলোমেলো স্বভাবের হয়, ক্রিয়েটিভ ধরণের মানুষেরা আরও বেশি হয়। তাই বলে শার্টের হাত ময়লা বলে কেউ কাউকে ছেড়ে দেয়? আমি নিজেই উল্লেখ করেছে ছেলেটি ছিল “কৃশকায়”। আপনার যখন এটি সুপুরুষ প্রয়োজন, তাহলে কেন কৃশকায় মত গায়ক ছেলেটির সাথে সম্পর্ক করেছিলেন? নিজের চেহারা নিয়ে অহংকার আছে আপনার বুঝতে পারছি, না থাকলে নিন্দুকের কথায় কান দিতেন না। এই জন্যই ভাবছেন যে আপনার মত রূপসী ছেলেটার সাথে মানানসই নয়। একটা কথা বলি আপু, সৌন্দর্য কতদিনের? আজকে একটা দুর্ঘটনা ঘটুক, এক মুহূর্তে সৌন্দর্য হারিয়ে যাবে। এই সৌন্দর্যের অহংকার করতে নেই, এই সৌন্দর্য দিয়েও মানুষকে বিচার করতে নেই। তাহলে দিন শেষে নিজেকেই পস্তাতে হবে। সেই গায়ক ছেলেটি হয়তো রাগের মাথায় অনেক কিছু বলেছে, যেগুলো খুব খারাপ কথা। কিন্তু আপনি তাঁর সাথে যা করেছেন সেটা আরও অনেক বেশি খারাপ। তাঁকে ভালোবাসার আশা দেখিয়ে আঘাত করেছেন স্বার্থপরের মত প্রায় অকারণেই। এটা কি ঠিক হয়েছে বলুন?

নিয়তির কি পরিহাস দেখুন, প্রিয়জন হারাবার যে ব্যথা আপনি অন্যকে দিয়েছেন, আজ সেটাই ফিরে এসেছে আপনার কাছে। এখন কি বুঝতে পারছেন প্রিয় মানুষটিকে আচমকা হারিয়ে ফেললে কী ভয়াবহ কষ্ট হয়? আপনিও তো রাগের মাথায় বর্তমান প্রেমিককে কতবার কতকিছু বলেছেন। এখন কি বুঝতে পারছেন যে রেগে গেলে মানুষের মাথা ঠিক থাকে না, সে আসলে অনেক কিছুই বলতে পারে? এইসব কথা আমি আপনাকে খোঁটা দেবার জন্য বলছি না, বোন। আমি বলছি আপনাকে পরিস্থিতি বোঝানোর জন্য। কারণ পৃথিবীতে কোন কিছু পারফেক্ট নয়, আপনি পারফেক্ট নন, জীবন পারফেক্ট নয়। তাহলে আপনি পারফেক্ট কেন খোঁজেন? আজ যে সুপুরুষের প্রেমে আপনি পড়েছেন, বিয়ের পর তাঁর মাঝেও যখন অসুন্দর কিছু দেখবেন, তখন আপনি সহ্য করতে পারবেন না। ফলাফল হবে সম্পর্কের ভেঙে যাওয়া। ভাবছেন তাঁর মাঝে অসুন্দর কিছু নেই? অবশ্যই আছে। আমাদের সবার মাঝে অসুন্দর কিছু না কিছু আছেই, কেবল আমরা সেটা বুঝতে পারছে না।

কেবল সুন্দর করে চিঠি লিখলেই তো ভালোবাসা হয় না। আপনার এই সুপুরুষ প্রেমিক যে যথেষ্ট ডমেনেটিং স্বভাবের, এবং বেশ স্বার্থপরও- সেটা কি আপনি বুঝতে পারছেন? আপনার অতীত তিনি জানেন। তারপরও আপনাকে মানসিক সাপোর্ট দিয়ে কষ্টটা থেকে বের করে আনার চাইতে তিনি আপনাকে আরও কষ্ট দিচ্ছেন। এটাই কি ভালোবাসা? সত্যিকারের ভালোবাসায় তো ফাইনাল ব্রেকাপ বলতে কিছু নেই, আর কখনো ভালবাসতে পারবো না- এমন কিছুও নেই। আর আপু, কীভাবে নিশ্চিত হচ্ছেন যে এই মানুষটিও কেবল আপনার রূপের জন্য আপনাকে ভালবাসছে না। ২/১ টি সন্তান অবার পর আপনি যখন মোটা হয়ে যাবেন, হয়তো সৌন্দর্য হারিয়ে ফেলবেন… তখন যদি মানুষটা আর আপনাকে ভালো না বাসে? কেবল সুন্দর বলেই তাঁকে ফেরেশতা ধরে নেবেন না। একজন মানুষের পরিচয় কেবল তাঁর সৌন্দর্য বা সোশ্যাল স্ট্যাটাস না।

প্রায়শ্চিত্ত যদি করতেই চান, নিজের দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন আনুন আপু। মানুষকে সৌন্দর্য আর অর্থ দিয়ে বিচার করা বন্ধ করুন। মানুষের মাঝে পারফেক্ট খুঁজবেন না। জোর করে কারো সাথে সম্পর্ক রাখার কোন উপায় নেই। ছেলেটি যদি সত্যিই আপনাকে ভালোবেসে থাকে, আপনাকে ছাড়া থাকতে না পেরে কিছুদিন পর সে নিজেই ফিরে আসবে। আর যদি ফিরে না আসে, ধরে নেবেন এটা তেমন কোন গভীর ভালোবাসা ছিল না। প্রিয়.কম