মেইন ম্যেনু

“সে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আমার সাথে একান্তে থাকতো, এখন কীভাবে..”

“কেমন আছেন আপনি? প্রতিদিনই আপনার সুন্দর, বুদ্ধিদীপ্ত উত্তর পড়ে মুগ্ধ হই। কখনো নিজের সমস্যা নিয়ে আপনাকে লিখতে হবে ভাবিনি। কিন্তু আজ আমি প্রচন্ড মানসিক সমস্যার ভেতর দিয়ে যাচ্ছি, তাই আপনার পরামর্শ আমার খুবই প্রয়োজন। আমি খুবই আত্মবিশ্বাসী ছেলে কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি আমার মানসিক শক্তিকে ভেঙে চুরমার করে দিচ্ছে, অনেক খারাপ ও অন্যায় ইচ্ছা আমাকে প্রভাবিত করতে চাচ্ছে। অনুগ্রহ পূর্বক আমাকে সহযোগিতা করবেন।

দূ:খিত ভুমিকা বড় করার জন্য। আমি বাংলাদেশের একটি জেলা শহরের একটি প্রাইভেট হসপিটালের মালিক। শিক্ষাগত যোগ্যতার দিক দিয়ে দেশের সর্বোচ্চ ডিগ্রি আছে বলে ধরে নেয়া যায়। আর শিক্ষা জীবনেও অনেক কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখেছি। কিন্তু চাকরীর প্রতি অনীহা থাকায় ব্যবসাকেই জীবিকা হিসেবে বেছে নেই। হসপিটাল প্রতিষ্ঠিত করার পূর্বে আমার খুব ভালো একটি ব্যবসা ছিল যা থেকে ঈর্ষনীয় আয় হতো। ২০১৩ সালের শুরূতে আমি জীবনে প্রথম বারের মতো প্রেমে পড়ি। মেয়েদের থেকে সবসময় ১০০ হাত দুরে থাকতাম আর সবসময় মুড নিয়ে থাকার কারণে অনেক মেয়েই আমাকে পছন্দ করলেও আমার মুডের কারণে ধারে কাছে আসতো না। ও আর একটি ব্যাপার বলতে ভুলে গেছি, এটা গর্ব বা অহংকার করে বলছি না। আমার উচ্চতা, গায়ের রং ও চেহারা ১ম দর্শনেই পছন্দ করার মতো।

তো যাই হোক,অবশেষে প্রেমে পড়লাম। মেয়েটি শহরের প্রতিষ্ঠিত এক ব্যবসায়ীর ইন্টার পডুয়া এক সুন্দরী মেয়ে। প্রেম প্রথম দিকে গোপনই ছিলো, শুধু মেয়ের মা-ই জানত এবং তার মৌন সমর্থনে আমাদের সম্পর্ক গভীর থেকে গভীরতর হতে থাকে। এর মাঝেই বাইরে দেখা করতে গিয়ে সম্পর্কের ব্যাপারটি মেয়ের বাবা ও বড় ভাই জেনে ফেলে এবং যথারীতি কারফিউ ও মেয়েটির উপর শারীরিক-মানসিক নির্যাতন। অবশেষে যোগাযোগ বন্ধ। ধরা পড়ার ৩ দিন পর আমি সরাসরি মেয়েটির বাসায় গিয়ে তার বাবা, মা ও বড় ভাইয়ের সাথে দেখা করি এবং তাদের রাগ ভাঙাতে সক্ষম হই। কিন্তু মেয়ের বাবা শর্ত দেয় যে , তার স্ট্যাটাসের সমকক্ষ হতে হবে তবেই বিয়ে সম্ভবপর হবে। তাই ভালোবাসার জন্য আমি জীবনের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি নিলাম। ব্যবসা পরিবর্তন করে একটি প্রাইভেট হাসপাতাল প্রতিষ্ঠিত করতে শুরু করলাম। কিন্তু অভিজ্ঞতা ছাড়া অতো বড় ব্যাবসা শুরু করা যে চরম বোকামী ছিলো তা পরবর্তীতে বুঝতে পারি। মেয়েটির বাবা আমার একাগ্রতা দেখে আমার ব্যবসার সহযোগিতার জন্য আমার পাশে এসে দাঁড়ান এবং আমার হসপিটালের শেয়ার হয়। আমরা অনেক চেষ্টা করেও প্রতিষ্ঠানটিকে ভালো অবস্থানে নিয়ে যেতে পারিনি। যার ফলে আমি ক্রমান্বয়ে ঋণগ্রস্থ হয়ে পড়ি। আমার সুনাম নষ্ট হতে থাকে আর ভবিষ্যত ক্রমান্বয়ে অন্ধকারাচ্ছন্ন হতে থাকে।

আমার এই দুরাবস্থার কারণে মেয়েটির পরিবার আমার প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলে আর মেয়েটিকে আমার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করতে অনবরত মানসিক চাপ দিতে থাকে। যার কারণে মেয়েটির মন সবসময় খারাপ থাকতো আর আমি তাকে সবসময় ধৈর্য ধরতে বলতাম আর সান্ত্বনা দিতাম।  কিন্তু ক্রমান্বয়ে মেয়েটির উপর মানসিক নির্যাতন বেড়ে যায় যার ফলে ও আমার সাথে অধিকাংশ সময় খারাপ আচরণ করতো। আর আমি তার অপারগতা ও পরিস্থিতি বুঝতাম আর ধৈর্য ধরে তাকে বুঝাতাম। অবশেষে পরিস্থিতি আমার প্রতিকুলে চলে গেলো, গত এপ্রিল থেকে আমাকে ও আমাকে এড়িয়ে চলা শুরু করলো আর ফোন রিসিভ করতো না। এ বছর মে মাসের ৮ তারিখে ও ম্যাসেজ পাঠালো যে আমার সাথে আর সম্পর্ক রাখবে না। আমি অনেক অনুরোধ করেছি, অনেক অনুনয় করেছি , কিন্তু তাকে ফেরাতে পারিনি। ওই দিন আমি রাগ করে বলেছি যে আমি আর কখনো তোমার সাথে যোগাযোগ করবো না, তোমাকে ফোনও দেব না|। তবে তোমার জন্য অপেক্ষা করবো, সারা জীবন অপেক্ষা করবো। আমি জানি তুমি আমার, আর আমার জীবনে ফিরে আসবেই। আমি সেই দিনের জন্য অপেক্ষা করবো। এটাই ওর সাথে আমার শেষ যোগাযোগ।

এর পর দুই ঈদ গেলো, আমি আশা করেছিলাম ও আমাকে ম্যাসেজ পাঠাবে, কিন্তু পাঠায় নি। ও ওর জিপি সিম অফ করে রেখেছে, আমি ঈদে ওর মায়ের টেলিটক নাম্বারে ম্যাসেজ পাঠিয়েছিলাম, কিন্তু উত্তর পাইনি। গত মাসে আমার জন্মদিন ছিল। আমি সারা দিনরাত অপেক্ষা করেছি ওর একটি উইশ এর জন্য, কিন্তু পাইনি। বুঝতে পারছিলাম ও আমাকে ভুলে গেছে। ভাবি এটা কীভাবে সম্ভব? আমাদের মধ্যে এতোটা ভালোবাসা ছিলো যে, এক মূহুর্ত একজন আরেক জনকে ছাড়া ভাবতে পারতাম না। রাত ২ টা/৩ টা পর্যন্ত ফোনে কথা বলতাম, অনেক যায়গায় আমরা একসাথে বেড়াতে গিয়েছি, এমনকি ঘন্টার পর ঘন্টা চার দেয়ালের মাঝে দুজন একান্তে কাটিয়েছি। কীভাবে একটি মেয়ে এতো সহজে সব ভুলে যেতে পারে? ভালোবাসা প্রেম সবই কি মিথ্যা? প্রতারনা? টাকাই কি জীবনের সব?

অবশেষে গত ডিসেম্বর মাসের শুরূতে তার বিয়ে হয়ে যায়। যদিও বিয়ের ২ দিন আগেই আমি খবর পেয়েছিলাম, কিন্তু বিশ্বাস করনি। তাই খবর নিলাম, যে সত্যি বিয়ে হতে যাচ্ছে। আর আমি অপেক্ষায় ছিলাম তার একটি ফোন বা মেসেজের। যদি সে আমার সাথে যোগাযোগ করতো তবে আমি তার বাসায় গিয়ে পরিস্থিতি সামলানোর চেষ্টা করতাম। আমার বিশ্বাস কেউ তাকে আমার কাছ থেকে কেড়ে নিতে পারতো না। কিন্তু সে আমার সাথে যোগাযোগ করেনি । তাই ভাবি, যে মেয়েটি আমার সাথে শারীরিক সম্পর্ক করেছে, অনেক দিন আমার খালি বাসায় গিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা আমার বিছানায় থেকেছে, সে কীভাবে এখন বিনা দ্বিধায় আরেকজনের সাথে …

আমি যখন এটা ভাবি আমার মাথা খারাপ হয়ে যায়। মনে হয় কেউ যদি চাকু দিয়ে আমার বুকটা চিড়ে আমার কলিজাটা টেনে ছিডে ফেলত, তবেও মনে হয় এতোটা কষ্ট পেতাম না। মাঝে মাঝে আত্মহত্যার চিন্তা এসে পড়ে। অথচ আমার কাছে ওর ওনেক ছবি, কথোপকথনের রেকর্ড ও ম্যাসেজ আছে। আমি চাইলে এখনো ওর অনেক ক্ষতি করতে পারি কিন্তু করবো না। কারণ আমি তো ওকে ভালোবাসি। ও আমার সাথে যা-ই করুক, আমার ভালোবাসা তো সত্যি। আমি ওর কোন ক্ষতি সহ্য করতে পারবো না। কিন্তু নিজের কষ্ট সহ্য করতে পারছি না। মনে হয় আমি পাগল হয়ে যাচ্ছি। মাঝে মাঝে ভাবি সব ছেড়ে দিয়ে দূরে কোথাও চলে যাই। দিনে কয়েকবার বাথরূমে গিয়ে পানির কল ছেড়ে দিয়ে হাউ মাউ করে কাঁদি, যাতে মনটা শান্ত হয়| আল্লাহর কাছে শুধু দোআ করছি যেন তিনি আমাকে এই কষ্ট সহ্য করার শক্তি দেন। নিজের কষ্ট কারো সাথে শেয়ার করতে পারছি না, তাই আপনার দ্বারস্থ হলাম। দয়া করে আমাকে পরামর্শ দিন।”

পরামর্শ:
জানেন ভাই, ঠিক একই রকম চিঠি এই সপ্তাহে আরও একজন ভাইয়া আমাকে লিখেছেন। ঠিক একই রকম চিঠি! তাঁর ঘটনাও ঠিক আপনার মতই। একেবারে একই বলা যায়! আপনাদের চিঠিগুলো পড়ে আমার বুক ভেঙে যায়। মানুষ মানুষের সাথে এমন প্রতারণা কীভাবে করে? কেন করে? বিবেকে কি একটুও বাঁধে না?

আমি জানি ভাই, আপনি তাঁকে অনেক ভালোবাসেন। কিন্তু আমি মনে করি না মেয়েটি আপনার ভালোবাসা পাবার যোগ্য। ইনফ্যাকট, আমি মনে করি না মেয়েটি কারো ভালোবাসা পাবারই যোগ্য। মেয়ে এবং মেয়ের পরিবার উভয়েই অত্যন্ত লোভী। তাঁদের কাছে টাকাটাই সব। যেখানে মেয়েই আপনার ভালোবাসাকে দাম দেয়নি, সেখানে মেয়ের পরিবার কী দেবে!

ভালোবাসায় একটি ভুল আমরা সবাই করি ভাইয়া। আর সেটি হচ্ছে কারো জন্য নিজেকে বদলে ফেলি! এটা ভুলে যাই যে একদিন এই মানুষটি নাও থাকতে পারে, তাঁর জন্য নিজেকে পরিবর্তনের অর্থ নিজেকে আজীবনের জন্য হারিয়ে ফেলা। আর এটাও আমরা ভুলে যাই যে কেউ যদি আমাদের বর্তমান দেখে আমাদের হাত ধরে, সেটাই ভালোবাসা। তুমি আরও ধনী হলে তোমাকে বিয়ে করবো, এটা আর যাই হক ভালোবাসা হতো না। ভালোবাসা তখন হতো, যখন মেয়েটি আপনার ওই অবস্থাতেই আপনার হাত ধরে চলে আসতো, আপনার আরও ধনী হবার অপেক্ষা করতো না। সত্যি বলতে কি, আমি হলে তখনই মেয়েটির সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করতাম।

ভাবছেন, অভিজ্ঞতা না থাকলে বলা সহজ। কিন্তু সত্যি বলতে কি ভাই, আমার অভিজ্ঞতাও এমনই ভয়াবহ। একজন মানুষের পেছনে আমি নিজের সমস্ত ধনসম্পদ বিলিয়ে নিঃস্ব হয়ে গিয়েছিলাম, দীর্ঘ ৭/৮ টি বছর কেবল তাঁর জন্যই করে গিয়েছি, কখনো নিজের দিকে তাকাইনি। একটা সময়ে সে যখন প্রতারণা করলো, বুঝলাম কী ভুলটি করেছি। তাঁকে ভালো রাখতে গিয়ে আমি নিজেকেই হারিয়ে ফেলেছি একেবারে! তবে হ্যাঁ ভাই, পার্থক্য এখানে যে প্রতারণা বুঝতে পেরে আমি নিজেই তাঁকে ত্যাগ করেছিলাম। আমি কঠোর হয়েছিলাম কারণ সেটাই সঠিক ছিল। আমি বুঝে গিয়েছিলাম যে সে আমার ভালোবাসা পাবার যোগ্য নয়।

হ্যাঁ ভাইয়া, আমারও মনে হয়েছিল যে জীবন সেখানেই শেষ। কিন্তু জীবন সেখানে শেষ হয়নি। শেষ হয় না। আমি জানি আমি প্রতারণা করিনি, তাহলে আমার সাথে কেন খারাপ হবে? আল্লাহর ইচ্ছায় এখন খুব ভালো একজন মানুষের স্ত্রী আমি, আমার কোন অভিযোগ নেই। এত কথা এই কারণেই বললাম কারণ আপনার মনে হচ্ছে আপনি আর কাউকে কখনো ভালবাসতে পারবেন না। কিন্তু সত্য এটাই যে, পারবেন। সময়ে সময়ে ক্ষত মলিন হবে, আর তারপর আপনি সেই মানুষটিকে খুঁজে পাবেন যা সাথে সৃষ্টিকর্তা আপনার জোড়া বেঁধে রেখেছেন। হ্যাঁ, আমি সোলমেটে বিশ্বাস করি।

ভাই, মেয়েটির সাথে আপনার বিয়ে না হয়ে আপনি বেঁচে গিয়েছেন। প্রেমে প্রতারণার কষ্ট তাও সওয়া যায়, স্ত্রী প্রতারণা করলে সওয়া যায় না। আপনি একটু ধৈর্য ধরুন ভাই, আমি কথা দিচ্ছি আপনার কষ্ট এক পর্যায়ে কম হতে শুরু করবে। আপনি নতুন উদ্যম নিয়ে কাজে ঝাঁপিয়ে পড়ুন। মেয়েটিকে শিক্ষা দেয়ার একটাই উপায়, মেয়েটির স্বামীর চাইতেও সফল মানুষ হওয়া। তখন মেয়েটি দেখবেন হায় হায় করছে, আফসোস করছে। আর এটাই হবে তাঁর শিক্ষা। তাঁর আগ পর্যন্ত হার মানবেন না ভাই। প্লিজ। আপনাকে এখনো অনেক দূর যেতে হবে।

যদি প্রয়োজন বোধ করেন, একজন কাউন্সিলারের সাথে নিয়মিত কথা বলুন। কষ্ট কম করতে এই পদ্ধতিটি অনেক কাজে আসে। শুভকামনা আপনার জন্য।-প্রিয়.কম