মেইন ম্যেনু

সে দৃশ্য কারও সহ্য করা কঠিন

‘দীপন কখনো ব্লগে যায়নি। সে বলত, ব্লগে যারা লেখালেখি করে, তারা মূলত দুটি ধারায় লেখে। যাদের একটি ধর্ম নিরপেক্ষতার নামে উসকানি দেয়, অপরটি প্রকৃত ইসলাম থেকে অনেক দূরে সরে এসে ইসলামের সপক্ষে কথা বলতে যায়। ব্লগারদের এই দুই ধারার কোনোটিই তাকে টানে না। এর পরও আমার ছেলেকে খুন হতে হলো।’ কান্নাজড়ানো কণ্ঠে ফয়সাল আরেফিন দীপনের বাবা আবুল কাসেম ফজলুল হক এসব কথা বলেন।
ছেলের নির্মম খুন হওয়ার ঘটনা বর্ণনা দিতে গিয়ে অধ্যাপক কাসেম বলেন, ‘দীপনের অফিসের দরজা ভেঙে প্রথম যে দৃশ্যটি দেখেছিলাম, তা কোনো বাবার পক্ষে সহ্য করা কঠিন। ছেলে আমার রক্তের আস্তরণের ওপর উপুড় হয়ে পড়ে আছে। নিথর পা দুটো তার প্রিয় চেয়ারের সঙ্গেই লেগে ছিল। সেখান থেকে যখন বের করে আনা হলো, তখন দেখলাম, জমাটবাঁধা কালো রক্তের মধ্যে ফরসা মুখ, যেন এক রাজপুত্র ঘুমিয়ে আছে। কেবল প্রাণটিই নেই ভেতরে।’ ছেলের অনেক স্মৃতিই একে একে তুলে ধরলেন বাবা।
তিনি বলেন, ‘আমি “লোকায়ত” নামে একটি সাময়িকী বের করতাম। দীপনকে অনেকবার বলেছি সেটির সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য হতে। সে কখনো রাজি হয়নি। অথচ রাত জেগে জেগে আমার সঙ্গে এই সাময়িকীর জন্য কাজ করেছে। সে প্রচারে বিশ্বাসী ছিল না।’ তিনি বলেন, ‘ছোটবেলা থেকে দীপন খুব মেধাবী ছিল। ওকে নিয়ে কোথাও গেলে শুধু প্রশ্ন করত, বাবা, এটা কী, সেটা কী; কেন হলো। আমি ওর আগ্রহ দেখে অবাক হতাম। ভালো লাগত।’ এ কথাগুলো যখন বলছিলেন অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক, দু-গাল বেয়ে চোখের পানি নেমে আসছিল।
তিনি বলেন, ‘এসএসসির পর ছেলের খুব শখ ছিল বিদেশে পড়াশোনা করতে যাবে। পরিবারে অভাব-অনটন থাকায় পাঠাতে পারিনি। সে সময় ছেলে-মেয়ের অনেক শখ-আহ্লাদই পূরণ করতে পারিনি। এর পরও আমাদের হাসি-খুশির সংসারে সুখের অভাব ছিল না। আজও নেই। কেবল আমার ছেলেটিই সব ছেড়ে চলে গেল।’ বাবা আবুল কাসেম বলেন, ‘আমি টুকটাক লেখালেখি করলেও আমাকে তেমন কেউ চেনে না। আমার কোনো “পপুলারিটি” নেই। কিন্তু আমার ছেলের আছে। তার এই ৪৩ বছর বয়সেই ধর্ম-বর্ণ দল-মত নির্বিশেষে সবাই পছন্দ করত। অন্তত তার জানাজায় অগণিত মানুষের অংশগ্রহণ এটিই প্রমাণ করে।’
তিনি বলেন, ‘অনেকে আমার ও আমার ছেলেকে বিশেষ কোনো রাজনৈতিক দলের মধ্যে ফেলার চেষ্টা করছে। এটি ঠিক না।’ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের এই অধ্যাপক বলেন, ‘মাহবুব-উল আলম হানিফের মতো প্রকাশ্যে কিছু বললে মানুষ সেটির প্রতিবাদ করতে পারে। কিন্তু গোপনে “ট্রাপে” ফেলে কারও নামে কিছু রিউমার ছড়ালে তো সেগুলো সামাল দেওয়া যায় না।’
আবুল কাসেম বলেন, ‘দীপন যে বইগুলো প্রকাশ করেছে তার মধ্যে দু-তিনটি বই ব্লগার অভিজিতের ছিল। এর মধ্যে “অবিশ্বাসের দর্শন” নামে একটি বইয়ের দু-এক পাতা আমি পড়েও দেখেছি। কিন্তু সেখানে মানুষকে হত্যা করে ফেলার মতো কোনো দোষ খুঁজে পাইনি। দীপন বলত, সে বই প্রকাশ করে বা ব্লগে ঢুকে ইসলামকে সমর্থন দেবে বা বিরুদ্ধে কথা বলবে এমন মানসিকতা নেই। এই দর্শনের কোনোটিই তাকে সাড়া দেয় না।’
তিনি বলেন, ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদে বিশ্বাস করত দীপন। সে ভারত সমর্থন করত না। আবার ভীষণভাবে আমেরিকাবিরোধী ছিল।’ আবুল কাসেম ফজলুল হক বলেন, ‘আমরা আইন মেনে চলা মানুষ। মামলা বিচারিক ব্যবস্থারই একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ। তাই মামলা দিয়েছি। আমি মনে করি, প্রকৃত অর্থে, লাশ দেখে যখন পুলিশকে খবর দিয়েছি, তখনই এক ধরনের বিচার দেওয়া হয়ে গেছে। এখন তাদের ব্যাপার।’
‘বিচার চাই না’ কথাটি কাউকে আঘাত করে বলিনি বলেও মন্তব্য করেন তিনি। অধ্যাপক কাসেম বলেন, ‘বিচার চেয়ে কী হবে। কারও জেল হবে, ফাঁসি হবে। বিনিময়ে আমাদের দীপনকে তো আর ফিরে পাব না। আর সে কারণেই বলেছি, মানুষের শুভ বুদ্ধির উদয় হোক, যাতে আর কোনো দীপনকে খুন হতে না হয়।’ তিনি বলেন, ‘দীপন অনেক সাদাসিদে সাধারণ জীবন যাপন করত। খুব পরোপকারী ছিল। টাকা গড়ার প্রতি তার কোনো আগ্রহ ছিল না। কোনোরকম খেয়ে-পরে জীবন চললেই খুশি থাকত। ছেলেটা আমার বেড়াতে খুব ভালোবাসত। পরিবার নিয়ে কখনো কক্সবাজার আবার কখনো বাড়ির কাছে চিড়িয়াখানায়ও ঘুরতে যেত।’