মেইন ম্যেনু

সৈয়দ আশরাফকে সরানোর নেপথ্যে

নানা জল্পনা-কল্পনা চলেছে দু’দিন আগে। কিন্তু মূল খবরটি পাওয়া গেল আজ। আওয়ামী লীগের ডাকসাইটে নেতা সৈয়দ আশরাফুল ইসলামকে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে।

দলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সবচেয়ে বিশ্বস্ত হিসেবে পরিচিত বলে প্রকাশ্যে কেউ এর কারণ নিয়ে উচ্চবাক্য না করলেও কানাঘুষা চলছিল গত মঙ্গলবার থেকেই। ঘটনার সূত্রপাত এ দিন পরিকল্পণা কমিশনের এনইসি সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত জাতীয় অর্থনৈতিক নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় প্রধানমন্ত্রীর মনোভাব দেখে।

বৈঠকে নির্ধারিত এজেন্ডা ছিল ‘গ্রামীণ সড়ক উন্নয়ন প্রকল্প-২’। এই প্রকল্পের আওতায় সব সংসদ সদস্যকে তার এলাকায় ইচ্ছেমতো উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের জন্য ২০ কোটি টাকা করে বরাদ্দ দেয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, স্থানীয় সরকার বিভাগের প্রকল্পটি একনেক বৈঠকে অনুমোদনের জন্য উপস্থাপনের পর অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেন, ‘এতো গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর একটি প্রকল্প অনুমোদনের আলোচনা হচ্ছে। তবে বৈঠকে প্রকল্প বাস্তবায়নকারী মন্ত্রণালয়ের দু’জন মন্ত্রীর কেউ উপস্থিত নেই। সুতরাং প্রকল্পটি ফেরত দেয়া উচিত’। তিনি বলেন, ‘আগেও প্রকল্পটি ছিল। সেটি জনগণের চাহিদা অনুযায়ী বাস্তবায়িত হবে। এলাকার জন্য এমপিদের কাজ করার সুযোগ রয়েছে।’

অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যের পর প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আপনারা চাইলে কাজের সুবিধার্থে মন্ত্রীকে চেঞ্জ করে দেব। এখানে কেবিনেট সেক্রেটারি আছেন। প্রকল্পটি স্থগিত করার দরকার নেই’। প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ‘এ প্রকল্পটি অনুমোদন করতে হবে। কারণ, তৃণমূলের উন্নয়নের জন্য প্রকল্পটি খুব প্রয়োজন। মন্ত্রীর জন্য বসে না থেকে প্রকল্পটি অনুমোদন দেয়া যেতে পারে।’

এরপর পরিকল্পনা কমিশন চত্বরে এ নিয়ে কর্মকর্তাদের মধ্যে আলোচনা চলে। কিন্তু বৈঠকে উপস্থিত কমিটির কোনো সদস্য এ ব্যাপারে গণমাধ্যমে কথা বলেননি। এমনকি একনেক পরবর্তী সভায়ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই প্রকল্প নিয়ে বেশি কথা বলেননি পরিকল্পনামন্ত্রী। তিনি বর্ডার ম্যানেজমেন্ট ইক্যুইপমেন্ট ফর বর্ডার গার্ডস বাংলাদেশ প্রকল্প, রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ, মানবপাচার এবং মাদক চোরাচালান নিয়ে কথা বলেন।

এরপর কিছু কিছু সংবাদমাধ্যমে সৈয়দ আশরাফের মন্ত্রীত্ব থাকা নিয়ে সংবাদ প্রকাশিত হয়। যদিও এদিন বিকেলে মন্ত্রী পরিষদ সচিব এ ব্যাপারে তার হাতে কোনো তথ্য নেই বলে জানান।

কিন্তু বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, একনেক বৈঠকে থাকাকালেই প্রধানমন্ত্রী জরুরী ভিত্তিতে সৈয়দ আশরাফকে তলব করেন। এমনকি সবসময় বৈঠক থেকে সবার আগে প্রধানমন্ত্রীর বের হয়ে আসার একটা অলিখিত বিধান থাকলেও এদিন সবাইকে আগে যেতে বলা হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এরপর অর্থমন্ত্রী, আরও দু’জন সিনিয়র মন্ত্রী এবং মন্ত্রিপরিষদ সচিবের সঙ্গে একান্তে কথা বলেন। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, সেখান থেকেই আশরাফকে ডেকে পাঠানো হয়। এরপর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংসদ অধিবেশনে যোগ দেয়ার জন্য জাতীয় সংসদ ভবনে চলে যান।

এদিকে জানা গেছে, সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের দিনের কার্যাবলীর মধ্যে ছিল দুপুর সাড়ে ১২টায় কিশোরগঞ্জে রওনা দেয়া। কিন্তু জরুরি তলবের পর বেলা পৌনে ১টার দিকে মন্ত্রিপাড়ার সরকারি বাসভবন থেকে বের হয়ে সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম সংসদে যান। সংসদ লবিতে অবস্থিত প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে তার ঘণ্টাব্যাপী বৈঠক হয়। বৈঠক শেষে মনমরা আশরাফ সংসদ ভবন থেকে বের হয়ে সোয়া দুইটার দিকে আবার মন্ত্রিপাড়ার বাসভবনে ফিরে যান। কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে বেলা পৌনে তিনটার দিকে তিনি কিশোরগঞ্জের উদ্দেশে রওনা দেন। সেখানেও গণমাধ্যমের কাছে মন্ত্রীত্ব যাওয়ার বিষয়ে কোনো কথা বলেননি।

তবে রাজনৈতিকবোদ্ধারা শুধু একনেক বৈঠকের কারণে সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের মতো একজন ডাকসাইটে নেতার মন্ত্রীত্ব গিয়েছে বলে মনে করেন না। এ জন্য বিভিন্ন সময়ে মন্ত্রীর কার্যকলাপকে দায়ী করছেন তারা।

ওয়ান-ইলেভেনের সংকটময় মুহূর্তে তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত সভাপতি প্রয়াত জিল্লুর রহমানের সঙ্গে শক্ত হাতে ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক হিসেবে আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব দেন সৈয়দ আশরাফ। দল ক্ষমতায় এলে তাকে দেয়া হয় স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব। এরপর দলের কাউন্সিলে সৈয়দ আশরাফুল ইসলামকে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক করা হয়। কিন্তু এ দায়িত্ব পাওয়ার পর সৈয়দ আশরাফ দলীয় নেতাকর্মীদের কাছে সোনার হরিণে পরিণত হন। তাকে পাওয়াটা হয়ে দাঁড়ায় রীতিমতো ভাগ্যের ব্যাপার। এ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে অভিযোগের পাহাড় জমতে থাকে।

মন্ত্রিপরিষদ সদস্য থেকে শুরু করে কেন্দ্রীয় এবং সারা দেশে আওয়ামী লীগের নেতারা আশরাফের ব্যাপারে অসন্তোষ প্রকাশ করেন। সৈয়দ আশরাফ সচিবালয়ে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে যান কালেভদ্রে। দলীয় কর্মসূচিগুলোতে ধারাবাহিকভাবে অনুপস্থিত থাকা শুরু করেন। আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় কমিটির বৈঠকে আশরাফ সম্পর্কে কথা উঠলে খোদ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা হাসতে হাসতে আশরাফকে বলেন, আমার ফোনটা ধর।

এ অবস্থার মধ্যেই দ্বিতীয় দফায় আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে দল পুনরায় ক্ষমতায় এলে আবারও স্থানীয় সরকারমন্ত্রীর দায়িত্ব পান তিনি। কিন্তু অজ্ঞাত কারণে বিএনপি-জামায়াতের টানা অবরোধ-হরতালে নীরব থাকেন আশরাফ। তখন শোনা যায়, শীর্ষ নেতৃত্বের ইচ্ছের বাইরে বিএনপির সঙ্গে আলোচনায় আগ্রহী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম। এতে তাকে নিয়ে আওয়ামী লীগের হাইকমান্ডে বেশ অসন্তোষ দেখা দেয়।

তখন দেশের ক্রান্তিকালে ঢাকা সফররত যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিশা দেশাই বিসওয়ালকে ‘দু আনার মন্ত্রী’ বলে মন্তব্য করেছিলেন।

আশরাফের এ মন্তব্যে প্রভাবশালী দেশটি প্রকাশ্যে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া না জানালেও ভেতরে ভেতরে ক্ষমতাসীন দলের ওপর ক্ষুব্ধ হয়। ভিন্ন দেশের একজন গুরুত্বপূর্ণ অতিথি রাজনীতিক সম্পর্কে কটাক্ষ করায় সৈয়দ আশরাফুল ইসলামকে সতর্ক করে দেন দলের সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের মন্তব্য আর না করেন সে ব্যাপারেও হুশিয়ার করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী।

তারপর থেকেই সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম লোকচক্ষুর অন্তরালে চলে যান। মাঝেমধ্যে আওয়ামী লীগের কর্মসূচিতে তাকে দেখা যায়। তবে সৈয়দ আশরাফ তার চিরচেনা জীবনযাপন থেকে আর বের হতে পারেননি। সর্বশেষ মঙ্গলবার একনেকের বৈঠকে উপস্থিত না থেকে ভর্ৎসনার শিকার হন তিনি।

প্রসঙ্গত, সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় বাংলাদেশের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামের ছেলে। তিনি টানা দ্বিতীয় মেয়াদে শাসক দল আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক।



« (পূর্বের সংবাদ)