মেইন ম্যেনু

স্টিফেন হকিং-এর বাংলাদেশি রুমমেটের গল্প

সাফাত জামিল শুভ: নিজদেশের গুণী লোকের কদর করতে বাংলাদেশিরা বরাবরের মতই পিছিয়ে, ভিনদেশের আলোড়ন সৃষ্টিকারী ব্যক্তিদের বন্দনায় মত্ত্ব হলেও এদেশের গুণীজনদের ব্যাপারে আগ্রহ নেই আমাদের।

২০০১ সালের মাঝামাঝি সময়ে পৃথিবী অচিরে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে- এ রকম একটা আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছিল সারা বিশ্বে। বাংলাদেশের মতো হুজুগে দেশে এই আতঙ্ক মারাত্মক হয়ে দেখা দেয়।কিন্তু আমাদের সব কৌতুহল,ভয় আর উদ্বেগকে প্রশমিত করেছিল যাঁর অভয়বাণী তিনি জামাল নজরুল ইসলাম (আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে যিনি জে.এন. ইসলাম নামে পরিচিত)| কোনো দৈবজ্ঞান নয়, তিনি রীতিমতো গণিতের হিসাব কষে জানান যে, আমাদের সৌরজগতের অধিকাংশ গ্রহ প্রাকৃতিক নিয়মে একই সরলরেখা বরাবর এলেও এর প্রভাবে এই গ্রহে অস্বাভাবিক কিছু ঘটার আশঙ্কা নেই। জামাল নজরুল ইসলামের কথায় আমরা ভরসা পেয়েছিলাম। সেটি শুধু এ কারণে নয় যে, তিনি স্টিফেন হকিং কিংবা প্রফেসর আব্দুস সালামের মতো খ্যাতিমান বিজ্ঞানীদের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। তিনি নিজেও একজন বিশিষ্ট বিজ্ঞানী, মহাবিশ্বের ভবিষ্যত্ নিয়ে তাঁর একাধিক গ্রন্থ কেমব্রিজ, প্রিন্সটন, হার্ভার্ডয়ের মতো বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠ্য। প্রচারবিমুখ দেশপ্রেমিক এই বিজ্ঞানী কেমব্রিজে অধ্যাপনা করতেন।

১৯৮৪ সালে কেমব্রিজের সোয়া লাখ টাকা বেতনের অধ্যাপনার চাকরীটি ছেড়ে বাংলাদেশের ‘চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে’ মাত্র হাজার তিনেক টাকা বেতনে অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন গুণী এ ইমেরিটাস অধ্যাপক। শুধু নিজে নয়, তাঁর প্রিয় সবাইকেই তিনি পড়াশোনা শেষে দেশে ফেরার পরামর্শ দিয়েছেন। বাংলাদেশের আরেক বিশিষ্ট বিজ্ঞানী ও কল্পবিজ্ঞান লেখক মুহম্মদ জাফর ইকবাল যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশে ফেরার আগে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করামাত্র তিনি তাঁকেও দেশে ফেরার ব্যাপারে উৎসাহিত করেন।

১৯৭১ সালে ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রীর কাছে চিঠি লিখে বাংলাদেশে পাকিস্তানী বাহিনীর আক্রমণ বন্ধের উদ্যোগ নিতে বলেছিলেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে তার এই পরোক্ষ অবদান ও পরবর্তীতে দেশে ফিরে আসা থেকে তার প্রবল দেশপ্রেমের প্রমাণ পাওয়া যায়।

নিরহংকারী সহজ-সরল, বহুমাত্রিক গুণের অধিকারী প্রফেসর জামাল নজরুল একাধারে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ভৌতবিজ্ঞানী, পদার্থবিজ্ঞানী, গণিতবিদ, জ্যোতির্বিজ্ঞানী, বিশ্বতত্ত্ববিদ, সঙ্গীততত্ত্ববিদ, সেতারবাদক, পিয়ানোবাদক ছিলেন। জ্যোতির্বিজ্ঞানে গবেষণা ও বিশেষ অবদানের জন্য বিশ্ববিখ্যাত স্টিফেন হকিংয়ের পর উচ্চারিত হয় জামাল নজরুল ইসলামের নাম।

তাঁর প্রিয় বন্ধুদের মধ্যে ছিলেন নোবেল বিজয়ী আবদুস সালাম, জোসেফসন, অমর্ত্য সেন।বিশ্ববরেণ্য বিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং তাঁর রুমমেট ছিলেন। দেশ, জাতি বা বয়সের বিভেদ তাঁদের বন্ধুত্বের মাঝে বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। জ্ঞানচর্চার সূত্রে একই সমতলে নেমে এসেছেন তাঁরা। হকিং বয়সে তাঁর চেয়ে দুই বছরের ছোট। ১৯৬৭ সালে জামাল নজরুল ইসলাম কেমব্রিজের ইনস্টিটিউট অব থিওরেটিক্যাল অ্যাস্ট্রোনমিতে কাজ শুরু করেন (১৯৬৭ থেকে ১৯৭১)| হকিং পরে এসে সেখানে যোগ দেন। তাঁরা দুজন দুজনের মেধা,প্রজ্ঞা সম্পর্কে জানতেন।দুজনের কাজের প্রতি পরস্পরের আগ্রহ ছিল। প্রফেসর জামাল নজরুল ইসলাম কোথাও লেকচার দিতে গেলে হকিং যেতেন তাঁর লেকচার শুনতে বা হকিং কোথাও লেকচার দিতে গেলে, সেখানে জামাল নজরুল ইসলাম গিয়েছেন তাঁর কথা শুনতে।

বয়সে হকিং যেমন তাঁর কনিষ্ঠ, তেমনি বয়োজ্যেষ্ঠ হলেন অমর্ত্য সেন। ১৯৫৭ সালে তিনি যখন কেমব্রিজ কলেজে পড়তে গেলেন তখন অমর্ত্য সেন ট্রিনিটি কলেজের ফেলো।১৯৫৯ সালে অমর্ত্য সেনের সঙ্গে তাঁর প্রথম পরিচয় হয় ভারতের বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ অমিয় বাগচীর মাধ্যমে।১৯৯০ সালে অমর্ত্য সেন যখন বাংলাদেশে এলেন তখন চট্টগ্রামে গিয়ে জামাল নজরুল ইসলামের বাড়িতেই ছিলেন। দুজনের ঘনিষ্ঠতা হওয়ার একটা কারণ হলো দুজনেরই গণিতের প্রতি আগ্রহ বেশি। অমর্ত্য সেনের গাণিতিক অর্থনীতির ওপর আগ্রহ বেশি। আর জামাল নজরুলের বিশুদ্ধ গণিতের প্রতি। অমর্ত্য সেন নোবেল পাওয়ার আগের রাতে তাঁরা দুজনই কেমব্রিজে ছিলেন। রাতে একসঙ্গে ডিনার করলেন। দুজনের মধ্যে অনেক কথা হলো দেশ-কাল-জাতি, অর্থনীতি, গণিত নিয়ে। ডিনার শেষে দুজনই ফিরে গেলেন যার যার ঘরে। ওই রাতেই অমর্ত্য সেন চলে যান আমেরিকা। পরদিন সকালে এল সেই সুসংবাদ : অমর্ত্য সেন নোবেল পেয়েছেন।

পাকিস্তানের নোবেল বিজয়ী বিজ্ঞানী প্রফেসর আবদুস সালামও তাঁর বয়োজ্যেষ্ঠ বন্ধু ছিলেন। জামাল নজরুল ইসলামের চেয়ে আবদুস সালামের বয়স অনেক বেশি হলেও (তিনি আমার চেয়ে ১৩ বছরের বড়) তাঁর আচরণে কখনো তা মনে হতো না। তিনি সবসময় তাঁর সঙ্গে বন্ধুত্বসুলভ ব্যবহারই করতেন। কেমব্রিজের ট্রিনিটিতে পড়ার সময় আব্দুস সালামের সঙ্গে তাঁর প্রথম দেখা হয়।

ড. জামাল নজরুল গণিত এবং পদার্থবিদ্যা নিয়ে গবেষণা করতেন। বেশকিছু গাণিতিক সূত্র এবং জটিল গাণিতিক তত্ত্বের সহজ পন্থার উদ্ভাবক জামাল নজরুল ইসলাম মহাকাশের উদ্ভব ও পরিণতি বিষয়ে মৌলিক গবেষণা করেছেন। মহাবিশ্বের উদ্ভব ও পরিণতি বিষয়ে মৌলিক গবেষণার জন্য বিশেষভাবে খ্যাত। তার লেখা বেশকিছু বই অক্সফোর্ড, ক্যামব্রিজসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।

ড. জামাল নজরুল ইসলাম ১৯৬৩ থেকে ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব মেরিল্যান্ডে ডক্টরাল-উত্তর ফেলো হিসেবে কর্মরত ছিলেন। কেমব্রিজের ইন্সটিটিউট অব থিওরেটিক্যাল অ্যাস্ট্রোনমিতে (বর্তমানে ইন্সটিটিউট অব অ্যাস্ট্রোনমি), ক্যালিফোর্নিয়া ইন্সটিটিউট অব টেকনোলজিতে ভিজিটিং লেকচারার হিসেবে, ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ে জ্যেষ্ঠ গবেষণা সহযোগী হিসেবে, লন্ডনের কিংস কলেজে ফলিত গণিতের প্রভাষক হিসেবে তিনি শিক্ষকতা করেন। ইউনিভার্সিটি কলেজ, কার্ডিফের (বর্তমানে কার্ডিফ বিশ্ববিদ্যালয়) সায়েন্স রিসার্চ কাউন্সিলে তিনি ফেলো ছিলেন। ১৯৭৮ সালে তিনি লন্ডনের সিটি ইউনিভার্সিটিতে প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন এবং পরে রিডার পদে উন্নীত হন। এ বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত কর্মরত ছিলেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রিস্টনে অবস্থিত ইন্সটিটিউট ফর অ্যাডভান্সড স্টাডিজে ১৯৬৮, ১৯৭৩ ও ১৯৮৪ সালে ভিজিটিং সদস্য হিসেবে কাজ করেন। ১৯৮৪ সালে ড. জামাল নজরুল চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগে অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন।

অধ্যাপক জামাল নজরুল ইসলাম তার গবেষণার বিষয়বস্তু নিয়ে অসংখ্য বই লেখেন। এসব বই বিশ্বের বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়। তার উল্লেখযোগ্য রচনাবলীর মধ্যে দি আল্টিমেট ফেইট অব দি ইউনিভার্স ১৯৮৩ সালে কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটি প্রেস থেকে প্রকাশিত হয়। বইটি জাপানি, ফরাসি, পর্তুগিজ ও যুগোস্লাভ ভাষায় অনূদিত হয়। এছাড়া তার রোটেটিং ফিল্ডস ইন জেনারেল রিলেটিভিটি গ্রন্থটি ১৯৮৫ সালে কেমব্রিজ থেকে প্রকাশিত হয়। তিনি ‘স্কাই অ্যান্ড টেলিস্কোপ’ নামে একটি বই লেখেন, যা পরে স্প্যানিশ ভাষায় অনূদিত হয়। তার অন্য গ্রন্থগুলো হচ্ছে ১৯৯২ সালে ‘অ্যান ইন্ট্রোডাকশন টু ম্যাথমেটিক্যাল কসমোলজি’, বাংলা একাডেমী থেকে প্রকাশিত কৃষ্ণবিবর এবং মাতৃভাষা ও বিজ্ঞান চর্চা। এছাড়া তিনি শিল্প-সাহিত্য ও সমাজ বিষয়ক বিভিন্ন প্রবন্ধ রচনা করেছেন। এছাড়া তিনি ১৯৮৪ সালে ডব্লিউ বি বনোর সঙ্গে যৌথভাবে ক্লাসিক্যাল জেনারেল রিলেটিভিটি সম্পাদনা করেন।

২০০১ সালে একুশে পদক লাভ করেন প্রফেসর নজরুল। পদার্থবিজ্ঞানে বিশেষ অবদান রাখার জন্য ২০১১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজ্জাক-শামসুন আজীবন সম্মাননা পদক লাভ করেন। বাংলাদেশ বিজ্ঞান একাডেমি ১৯৮৫ সালে তাকে স্বর্ণপদকে ভূষিত করে। ১৯৯৪ সালে তিনি ন্যাশনাল সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি পদক পান। ১৯৯৮ সালে ইতালির আবদুস সালাম সেন্টার ফর থিওরিটিক্যাল ফিজিক্সে থার্ড ওয়ার্ল্ড একাডেমি অব সায়েন্স অনুষ্ঠানে তাকে মেডাল লেকচার পদক দেয়া হয়।

প্রফেসর ড. জামাল নজরুল ইসলামের পৈতৃক নিবাস চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি এলাকায়। তিনি ১৯৩৯ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি ঝিনাইদহ শহরে জন্মগ্রহণ করেন।ফুসফুসের সংক্রমণ ও হৃদরোগের কারণে ১৬ মার্চ ২০১৩ সালে চট্টগ্রামে ৭৪ বছর বয়সে মারা যান ক্ষণজন্মা এই গুণীজন।

লেখকঃ সাফাত জামিল শুভ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়