মেইন ম্যেনু

স্ত্রীকে ‘শায়েস্তা’ করতে দুর্বৃত্তদের ভাড়া করেছিল স্বামী!

‘স্বামী ঠিকমতো ভরণপোষণ দিত না। অসুস্থ হলে ডাক্তারের কাছে যেতে দিত না। এমনকি মেয়ের পড়াশোনার কোনো খরচ চাইলেও সে মারধর করত। নিজের কথা কখনোই চিন্তা করিনি। মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে গার্মেন্টে চাকরি করার সিদ্ধান্ত নিই। কিন্তু সে তাতেও রাজি হচ্ছিল না।

তার অমতেই এক মাস আগে চাকরি নিই। এ কারণেই সে লোক ভাড়া করে এসিড নিক্ষেপ করল আমার ওপর। এর আগে মারধর করায় অসুস্থ হলে ভুয়া ডাক্তার দেখিয়ে একটি চোখ নষ্ট করেছিল। এখন আমার দু’চোখের আলো নিভে যাওয়ার দশা।

পাশে বসে থাকা সন্তানকেও দেখতে পাচ্ছি না। পুরো শরীর ঝলসে যাওয়ায় অসহনীয় যন্ত্রণা হচ্ছে। আমার জীবনটা আমার স্বামী তছনছ করে দিল।’

রাজধানীর রূপনগরে ১৩ নম্বর টিনশেড বস্তিতে দুর্বৃত্তদের ছোড়া এসিডে দগ্ধ মাহফুজা আক্তার সুবর্ণা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের বিছানায় শুয়ে এভাবেই তার যন্ত্রণার কথা বলছিলেন। সুবর্ণার মতো পুলিশও বলছে, সুবর্ণার স্বামী সুরুজ আলী খান স্ত্রীর ওপর এসিড হামলা চালানোর জন্য দু’জন দুর্বৃত্তকে ভাড়া করেছিল।

গত বৃহস্পতিবার ভোরে ঘরে ঢুকে স্বামী সুরুজের সামনেই সুবর্ণার ওপর এসিড হামলা চালায় দুই দুর্বৃত্ত। এ সময় তার শিশুসন্তান সানজিদা আক্তারও দগ্ধ হয়। সুবর্ণাকে বাঁচাতে গিয়ে সুরুজের দ্বিতীয় স্ত্রী নিলুফা সামান্য দগ্ধ হন। ঘটনার সময় সুরুজের হাতেও সামান্য এসিড লাগে।

আত্মীয় পরিচয়ে মিষ্টি নিয়ে তারা সুরুজের সঙ্গে ঘরে ঢোকে। হামলা চালিয়ে তারা নির্বিঘ্নে পালিয়ে যায়। সুরুজ তাদের ধরতে বা সুবর্ণাকে বাঁচাতে এগিয়ে আসেনি। পরে সুবর্ণার অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ তাকে আটক করে।

বৃহস্পতিবার রাতে সুবর্ণা তার স্বামী সুরুজ ও অজ্ঞাত আরও দু’জনকে আসামি করে রূপনগর থানায় মামলা করেন। গতকাল শুক্রবার আদালতের মাধ্যমে সুরুজকে রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন করা হয়েছে।

প্রযুক্তিগত তদন্তে পুলিশ নিশ্চিত হয়েছে, সুরুজ পরিকল্পনা করেই তার স্ত্রী-সন্তানের ওপর এসিড হামলা চালায়। ঘটনার এক সপ্তাহ আগে এই পরিকল্পনা করে সে। এই সময়ে একটি মোবাইল নম্বরে সে অনেকবার কথা বলেছে। এমনকি ঘটনার ১৫ মিনিট আগেও সে ওই ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলেছিল।

সন্দেহভাজন ওই ব্যক্তি এখন পলাতক। হামলাকারীদের মধ্যে একজনের মাথায় নকল ব্যান্ডেজ ছিল। দুই দুর্বৃত্তকে নিয়ে ঘরে ঢুকে সুরুজ বলেছিল, ‘সুবর্ণা তোমার বাবা বাড়ি থেকে দু’জন আত্মীয় এসেছেন মিষ্টি নিয়ে। এক ব্যক্তির মাথার ব্যান্ডেজ দেখিয়ে সে বলেছিল, তিনি অসুস্থ, আশ্রয় চাইছেন।’ এর পরই দুই দুর্বৃত্ত এসিড নিক্ষেপ করে পালিয়ে যায়।

সুবর্ণা জানান, চাকরি করা নিয়ে এক সপ্তাহ ধরে সুরুজের সঙ্গে তার মনোমালিন্য চলছিল। তবে একসময় সে দাবি করছিল, চাকরি করলে তাকে মাসে পাঁচ হাজার টাকা দিতে হবে।

প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণ ও ঘটনার পারিপার্শিক অবস্থা বিবেচনায় পুলিশ নিশ্চিত যে, ঘটনার মূল পরিকল্পনাকারী সুরুজ। রূপনগর থানার ওসি শহীদ আলম বলেন, সুরুজ প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে ঘটনার কথা স্বীকার করেনি। তবে প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণে এ বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া গেছে, তার পরিকল্পনায় মর্মান্তিক এ ঘটনাটি ঘটেছে। ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তাকে রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের আবাসিক সার্জন পার্থ শঙ্কর পাল বলেন, সুবর্ণার শরীরের বিভিন্ন অংশ পুড়ে গেছে। তবে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে মুখমণ্ডল। তার একটি চোখে আগে থেকেই সমস্যা ছিল। এসিডের কারণে দুটি চোখেই সমস্যা দেখা দিয়েছে।

চিকিৎসকরা পরীক্ষা করে দেখছেন। দীর্ঘমেয়াদে কোনো সমস্যা হবে কি-না এ বিষয়ে এখনও নিশ্চিত করে কিছু বলা যাচ্ছে না। সূত্র: সমকাল।