মেইন ম্যেনু

স্বল্পবসনা মানেই দুশ্চরিত্র?

জেসমিন চৌধুরী : কয়েকদিন আগে আমার প্রাক্তন স্বামী আমার মেয়ের ফেইসবুক প্রোফাইল থেকে তার ভাষ্যমতে কিছু ‘আপত্তিকর ছবি’ ডাউনলোড করে আমাকে পাঠিয়ে দিলেন। সাথে জানালেন, তার অনেক বন্ধু এসব ছবি দেখে আমার মেয়ের চরিত্র এবং লাইফস্টাইল সম্পর্কে প্রশ্ন তুলেছেন।

একদিক থেকে দেখলে এগুলো ব্যক্তিগত বিষয়, পাবলিকলি শেয়ার করা বাঞ্ছনীয় নয়। আরেক দিক থেকে দেখলে এটা সামাজিক সমস্যা, এবং আলোচনা করা যেতে পারে। বিভিন্ন সময়ে আরো অনেক শুভাকাঙ্খী বন্ধুরা আমার মেয়ের পোষাক আষাক নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন, আমার তরফ থেকে উৎসাহ না পেয়ে আবার চুপ করে গেছেন।

অল্পবয়সী ছেলেমেয়েরা কৌতুহলের বশে হোক, বা মিডিয়ার ইনফ্লুয়েন্সে হোক, অনেক কিছুই ট্রাই আউট করে। উল্কি, পিয়ার্সিং, চুলে লাল-নীল রং, ছোটখাটো পোষাক কিছুই বাদ যায় না। এবং আমরা এসব দেখেই সিদ্ধান্ত নিয়ে নেই এই প্রজন্মের নৈতিক অবক্ষয় ঘটেছে। আমরা খুব ভাল ছিলাম, আর আমাদের বাচ্চারা উচ্ছন্নে গেছে।

আসলেই কি তাই? নৈতিকতা মানে কি? তার অবক্ষয়ই বা কিভাবে ঘটে? নৈতিকতা মানেই কি চিরাচরিত ধ্যান-ধারণার রক্ষণাবেক্ষণ? আর তার বিন্দুমাত্র পরিবর্তনই কি অবক্ষয়? আমরা কি বুকে হাত রেখে বলতে পারবো, আমাদের নতুন প্রজন্ম শুধু খারাপ থেকে খারাপতর হচ্ছে, আর আমরাই সবসময় ভাল ছিলাম?

জীবন বেঁচেছি ছেচল্লিশ বছর। বেড়ে উঠেছি এক প্রজন্মের অভিভাবকত্বে, নিজের সাথে বেড়ে উঠে বুড়ো হতে দেখেছি আরো এক প্রজন্মকে, এবং ষোল বছর ধরে কাজ করছি দেশে বিদেশে নতুন প্রজন্মের সাথে। এই তিন প্রজন্মকে যতটুকু দেখেছি, তা থেকে হলফ করে বলতে পারি সার্বিক বিচারে নতুন প্রজন্ম অনেক বেশি মানবিক, অনেক বেশি নৈতিক।

হতে পারে তারা দেশীয় সংস্কৃতি থেকে দূরে সরে যাচ্ছে, ধর্মীয় অনুশাসন মানছেনা, সামাজিক সংস্কারকে বৃদ্ধাংগুষ্ঠি প্রদর্শন করছে। দেশ, জাতি, ধর্ম আর সংস্কারের উর্ধ্বে উঠে যাওয়া নতুন প্রজন্মের মধ্যে আমি দেখেছি মানুষের প্রতি নিঃশর্ত শ্রদ্ধা পোষণের মানবতা, কৃপা বা সহানুভূতির মানবতা নয়, ভিখারীর থালায় পয়সা ছুঁড়ে দিয়ে বেহেস্তে কামরা বুকিং এর মানবতা নয়।

মাঝে মধ্যে সংক্ষিপ্ত কাপড় পরা আমার মেয়েটি কি এই প্রজন্মের আর দশটা বাচ্চা থেকে অনেক বেশি খারাপ? সব মাবাবাই তাদের সন্তানদের ভালবাসেন, কিন্তু সব মাবাবা ই কি নিজের সন্তানকে পছন্দ করেন? ভালবাসা আর পছন্দের মধ্যে অনেক পার্থক্য। আমি কিন্তু আমার দুই সন্তানকেই ইনসাইড আউট পছন্দ করি।

আমার মেয়ে যখন ছোট ছিল তার মুখের মিষ্টি মিষ্টি কথা, তার নানা সাফল্যের গৌরব ফেইসবুকে শেয়ার করতাম, যখন সে একটু বড় হলো তখন দেখলাম এসব শেয়ারিং সে পছন্দ করে না। তার ব্যক্তিত্বের এই দিকটার প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই আমি তার কথা ফেইসবুকে শেয়ার করা ছেড়ে দিয়েছিলাম, কিন্তু আজ অনেকদিন পর আবেগাপ্লুত হয়ে লিখতে বসেছি।

আমার কাছে আমার প্রাক্তন স্বামীর কাছ থেকে পাওয়া মেসেজটি একজন বাবার কাছ থেকে পাওয়া মেসেজ নয়, বরং পুরুষ শাসিত সমাজের একজন প্রতিনিধির কাছ থেকে পাওয়া একটি অশোভন বার্তা। যে ব্যক্তি আমার মেয়েকে চেনে না, মেয়ের কীসে আনন্দ, কীসে কষ্ট, কীসে গৌরব তার খোঁজ কখনো রাখেনি, তার আত্মার মর্যাদা কীসে হয় জানে না, সেই ব্যক্তি যখন তার বন্ধুদের বরাত দিয়ে আমার মেয়ের কাপড় চোপড় নিয়ে কথা বলতে আসে, তখন আমার মনে একটা প্রশ্নই জাগে, এই তথাকথিত বন্ধুগুলি কতটুকু বিকৃত রুচির মানুষ যে একটা কম বয়েসী মেয়ের প্রোফাইল ঘেটে কোন ছবি আপত্তিকর তা বিচার করতে বসে?

আমার মেয়ে অথবা অন্য কারো মেয়ের কাপড়ের সাইজ দেখে যারা তাদের চরিত্র বিচার করেন তাদেরকে কয়েকটি কথা বলতে চাই। জন্মের পরপর আমার মেয়েটাকে আমার কাছে অনেক কিউট লাগত, একটা সুনটু মনটু। তারপর তার বেড়ে উঠার সময়টাতে তার উপরে অনেক বিরক্তি, অনেক রাগ বোধ করতাম বিভিন্ন সময়।

আর এখন? এখন সোজা কথায় তাকে সমীহ করি আমি। এবছর তার বয়স একুশ হবে। এইটুকু জীবনের মধ্যে তার যে মানবিক অর্জন তার কাছে আমার নৈতিকতা বোধ হার মানে। তাকে আমি দেখেছি চ্যারিটির জন্য পয়সা তুলতে একশ’ ষাট ফুট উপর থেকে বাঞ্জি জাম্প দিতে, তাকে দেখেছি দিনের পর দিনে আলজাইমার রোগীর সাথে সময় কাটাতে, তাকে দেখেছি সিরিয়ার জন্য মানব বন্ধনে যেতে, তাকে দেখেছি চোখের সামনে প্রিয় খাবার হালিম রেখে শুকনা রুটি চিবাতে কারণ সে পশুদের কষ্টও সইতে পারে না বলে মাংস খায় না।

এরকম মেয়েদের নৈতিক অবক্ষয় নিয়ে যারা দুশ্চিন্তা করেন, তাদেরকে বলতে চাই, তাদের আপাদমস্তক ঢাকা গুডি গুডি বাচ্চাদের নিয়েও আমি দুশ্চিন্তা করি- তারা কি নিজের জীবন বাঁচার, নিজের স্বপ্ন দেখার সুযোগ পাচ্ছে? না’কি সমাজের আর সংস্কারের জীবন বাঁচতে গিয়ে, মা বাবার স্বপ্ন পূরণ করতে গিয়ে নিজের জীবনকে জলাঞ্জলি দিচ্ছে? কিন্তু আমি কি কখনো কাউকে কিছু বলেছি? সবার চরকায় দেবার মত অত তেল আমার বোতলে নেই।

আমি কখনোই অসাধারণ মা ছিলাম না। যখন মা হয়েছি তখন আমি নিজেই একটা বাচ্চা। তার উপর দুমড়ানো মোচড়ানো জীবন। এর মধ্যে কীভাবে কী ঘটেছে জানি না, কিন্তু আমার বাচ্চারা চমৎকার মানুষ হিসেবে গড়ে উঠেছে। মাবাবার কাছে, শিক্ষকদের কাছে, সমাজের কাছে আমি যা শিখেছি তার চেয়ে অনেক অনেক বেশি শিখেছি আমার ছেলেমেয়ের কাছে। তারা আমার সবচেয়ে শ্রেষ্ট শিক্ষক, তারা আমার আদর্শ।

বর্তমানে অল্পবয়সী ছেলেমেয়েদের নাশকতাবাদে জড়িয়ে পড়ার যে আতঙ্ক চারদিকে, সমাজের একজন মানুষ হিসেবে তা আমাকে স্পর্শ করলেও একজন মা হিসেবে এই আতঙ্কের লেশমাত্রও আমার মনে নেই। রাতের স্বপ্নের খুঁটিনাটি আমাকে না বললে যে মেয়ের দিন কাটে না, দিনের ঘটনার খুঁটিনাটি আমাকে না জানালে যে মেয়ের রাতে ঘুম হয় না, সেই মেয়েকে নিয়ে, তার চরিত্র নিয়ে অন্যরা ভাবুক, তার তথাকথিত বাবার তথাকথিত বন্ধুরা ভাবুক, আমি ভাবি না।