মেইন ম্যেনু

স্বাধীনতার স্থপতির প্রতি শ্রদ্ধায় এখনও ‘কার্পণ্য’

দেশের মুক্তির আন্দোলনের প্রধান নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কি সব পর্যায় থেকে প্রাপ্য সম্মান পাচ্ছেন? ইতিহাসবিদ আর রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, না। কারণ, বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলের একটি বড় অংশই মহান এই নেতার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রেখেছে।

ইতিহাসবেত্তারা বলছেন, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর ক্ষমতায় থাকা সরকারগুলো বঙ্গবন্ধুকে খাটো করার চেষ্টা করেছিল। তার বিচার আটকে রাখার পাশাপাশি তাকে ও পরিবারের সদস্যদেরকে নানা অপবাদ দেয়ার চেষ্টা হয়েছে। সময়ের ব্যবধানে এসব চেষ্টা থেমে গেলেও বঙ্গবন্ধুর অবদানকে স্বীকার করে নিয়ে তার প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর রীতি শুরু করতে পারেনি সবাই।

বঙ্গবন্ধুর শাহাদাৎ বার্ষিকীতে বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, পেশাজীবী সংগঠন ও সব শ্রেণিপেশার মানুষ মহান এই নেতার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছে। তবে এই মিছিলে ছিল না বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের বিরোধী বিএনপি ও সমমনা রাজনৈতিক দল, সামাজিক সংগঠন বা পেশাজীবীরা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক মেসবাহ কামাল বলেন, ‘জাতির জনকের প্রশ্নে বাংলাদেশে যে ভেদাভেদ তা অগ্রহণযোগ্য, অনাকাঙ্খিত।’ তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে রাজনৈতিক মতপাথর্ক্য থাকতেই পারে কিন্তু স্বাধীনতা এবং জাতির জনকের প্রশ্নে কোন বিতর্কের অবকাশ নেই। এই ঐতিহাসিক সত্যের বিষয়ে বিতর্ক করার চেষ্টা করে তাদের বাংলাদেশে রাজনীতি করার অধিকার নেই।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক গোবিন্দ চক্রবর্তী বলেন, ‘পৃথিবীর সব দেশেই তাদের জাতির জনকের জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকী এক সঙ্গেই পালন করে। কিন্তু বাংলাদেশে এটা রাজনৈতিক সংকীর্ণতার পরিচয় দিচ্ছে আমাদের কিছু রাজনৈতিক দলের নেতা ও সমর্থকরা। এ কারণেই বাংলাদেশে স্বাধীনতার সবচেয়ে বেশি অবদান বঙ্গবন্ধুর কিন্তু তার শাহাদাৎ বার্ষিকীর আমরা একসঙ্গে পালন করতে পারছি না এটা আমাদের রাজনীতির এক সংকীর্ণতা।’

রাষ্ট্রবিজ্ঞানের এই শিক্ষক বলেন, ‘বাংলাদেশে দুটি রাজনৈতিক ধারা প্রবাহমান একটি হল ডানপন্থি আরেকটা হল ধর্ম নিরপেক্ষ ধারা। যারা ধর্মকে প্রধান্য দিয়ে রাজনীতি করছে তারা বঙ্গবন্ধুর শাহাদাৎ বার্ষিকী পালন করছে না।’

জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক খালিদ মাহমুদ চৌধুরী বলেন, বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে যখন মুক্তিযুদ্ধ চলছিল তখনও কিছু রাজাকার-আলবদর স্বাধীনতা সংগ্রামের বিরোধিতা করেছিল। তাই বলে কি বাংলাদেশ স্বাধীন হয়নি? এখনও বঙ্গবন্ধুকে যারা শ্রদ্ধা না জানায়, তারা ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হবে।’

তবে বিএনপি ও সমমনারা শ্রদ্ধা না জানানোয় শোক দিবসের আয়োজনের ভাবগাম্ভীর্য কমেনি বলে মনে করেন আওয়ামী লীগের এই কেন্দ্রীয় নেতা। তিনি বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর যারা খুনিদের লালন পালন করেছে, তাদেরকে আশ্রয় প্রশয় দিয়েছে তারা এইদিনে শ্রদ্ধা জানাবে না এটাই তো স্বাভাবিক। তারা শ্রদ্ধা জানালে সেটা বরং তামাশা হয়ে যেতো।’

বিএনপির অবস্থান

৯০ দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে ১৫ আগস্ট বিএনপি ও সমমনা সংগঠনগুলো তাদের নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার জন্মদিন হিসেবে পালন করে আসছে। এই দিনে কেক কাটা, আনন্দ মিছিল করে উল্লাস করে দলটির নেতা-কর্মী ও সমমনারা। আওয়ামী লীগের অভিযোগ, প্রকৃত জন্মদিন না হলেও কেবল বঙ্গবন্ধুর প্রতি অশ্রদ্ধা দেখাতেই এই দিন উৎসব করে বিএনপি।

১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার ছয় বছর পর রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপির আত্মপ্রকাশ হয়। তবে এর আগেই রাষ্ট্রক্ষমতায় আসেন সে সময়ের সেনাপ্রধান ও বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান। আর তার অনুসারীরা আশির দশকে দীর্ঘদিন ১৫ আগস্টকে ‘নাজাত দিবস’ হিসেবে পালন করতেন। পরে অবশ্য সে পথ থেকে সরে আসেন তারা।

সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে বঙ্গবন্ধুকে স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রধান নেতা হিসেবে প্রথমবারের মত স্বীকার করতে থাকেন বিএনপি নেতারা। তাকে সম্বোধনের ক্ষেত্রে এর আগ পর্যন্ত ‘মরহুম শেখ মুজিবুর রহমান’ বলা হলেও তখন থেকেই ‘বঙ্গবন্ধু’ বলতে থাকেন দলটির নেতারা। বেগম খালেদা জিয়াও একাধিক বক্তব্যে বঙ্গবন্ধুর অবদানের কথা স্বীকার করে তার কথা শুরু করেন। তবে জাতির জনকের প্রতি আনুষ্ঠানিকভাবে শ্রদ্ধা নিবেদন করেনি দলটি।

বিএনপি কেন জাতীয় শোক দিবসে বঙ্গবন্ধুকে শ্রদ্ধা জানানোর ক্ষেত্রে আগ্রহী নয়, জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিএনপিপন্থি এক শিক্ষক নেতা বলেন, ‘এই বিষয়টা নিয়ে কথা না বললেই নয়?’

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মাহবুবুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘এ বিষয়ে একটি জাতীয় দৈনিকে বক্তব্য প্রকাশ হয়েছে। ওটিই এক্ষেত্রে আমার অবস্থান ধরে নিন।’

ওই জাতীয় দৈনিককে মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মৃত্যু দিবস। তিনি জাতিসত্তার উন্মেষ ঘটিয়েছিলেন। অত্যন্ত নির্মমভাবে তাঁকে সপরিবারে হত্যা করা হয়েছিল। এদিন জাতীয় শোক দিবস। এই দিনের প্রতি সম্মান জানিয়ে বিএনপির চেয়ারপারসনের জন্মদিন পালন না করার সিদ্ধান্ত ইতিবাচক বার্তা বহন করে।’

তবে মাহবুবুর রহমান এ কথা জানালেও বিএনপির পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়েছে, উত্তরাঞ্চলে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের প্রতি সমমর্মিতা এবং গুলশানে জঙ্গি হামলায় নিহতদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতেই ১৫ আগস্ট জন্মদিনের কেক না কাটার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন খালেদা জিয়া।

জাতীয় শোক দিবসে বঙ্গবন্ধুর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু বলেছেন, ‘বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া যতদিন বঙ্গবন্ধুকে শ্রদ্ধা না জানাবেন, তাকে জাতির জনক হিসেবে স্বীকার না করবেন ততদিন তিনি জাতির শত্রু হিসেবে বিবেচিত হবেন।’

স্বাধীনতার স্থপতি হিসেবে স্বীকার করেছে জামায়াত

বিএনপির শরিক ও মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানের পক্ষে অস্ত্র ধরা জামায়াতে ইসলামীও সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে বিবৃতি দিয়ে বঙ্গবন্ধুকে ‘স্বাধীনতার স্থপতি’ হিসেবে মেনে নেয়ার কথা জানায়। এরপর থেকে বিভিন্ন আলোচনা সভায় বঙ্গবন্ধুর প্রশংসাও করতে থাকেন দলের নেতারা। ২০০৮ সালে এমনকি জামায়াতের ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবিরের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে প্রথমবারের মত জাতীয় সঙ্গীত গাওয়ার পর দলটির মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত নেতা মীর কাসেম আলী বলেছিলেন, ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, যার জন্ম না হলে এই বঙ্গীয় বঙ্গদ্বীপে আমরা স্বাধীন দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারতাম না।’

তবে ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর আবার বঙ্গবন্ধুর সমালোচনার পুরনো পথে ফিরে যায়।



« (পূর্বের সংবাদ)
(পরের সংবাদ) »