মেইন ম্যেনু

স্মৃতিকেন্দ্রের দায়িত্ব নিতে চায় রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়

যে মাটি আর গ্রামে জন্ম নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়ার, সেই মিঠাপুকুরের পায়রাবন্দেই তাকে নিয়ে চর্চা করার কোনো সুযোগ নেই। একটু আশা হয়ে ছিল যে রোকেয়া স্মৃতিকেন্দ্রটি, এখন সেটিও ধ্বংসের উপক্রম। ফলে রোকেয়া-চর্চা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন তার অনুরাগীরা।

অথচ এই স্মৃতিকেন্দ্রের যে অবকাঠামো, তাতে এটি হয়ে উঠতে পারে রোকেয়া-চর্চার কেন্দ্রবিন্দু। বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়সহ সারা দেশের শিক্ষার্থীরা এখানে রোকেয়ার ওপর পিএইচডিসহ উচ্চতর ডিগ্রি অর্জনের সুযোগ পেতে পারে।

এই সম্ভাবনা অবশ্য এখনো দেখছেন বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. এ কে এম নূর উন নবী। সরকারের সহযোগিতা পেলে এখনই তিনি এটি তার বিশ্ববিদ্যালয়ের তত্ত্বাবধানে নিতে প্রস্তুত।

এদিকে স্মৃতিকেন্দ্রটি রক্ষণাবেক্ষণের দেখভাল করেন যারা, এক যুগ ধরে বেতন-ভাতা পচ্ছেন না তারা।

স্মৃতিকেন্দ্রের অযত্ন-অবহেলায় ক্ষুব্ধ স্থানীয় অধিবাসীরা জানান, সমাজের এক কুসংস্কার দূর করে আলোয় উদ্ভাসিত করা বেগম রোকেয়া এখন ৯ ডিসেম্বরে বন্দি হয়ে আছেন। দিনটি ঘিরে তিন দিনের আয়োজনই সার। এরপর পুরো বছর অবহেলায় পড়ে থাকে স্মৃতিকেন্দ্র আর আঁতুরঘর।

ফলে অবহেলা-অযত্ন থেকে বেগম রোকেয়ার স্মৃতি রক্ষার যে পরিকল্পনা আর উদ্দেশ্য নিয়ে গড়ে তোলা হয়েছিল স্মৃতিকেন্দ্রটি, তা আর পূরণ হচ্ছে না।

জানা যায়, ১৯৯৭ সালে স্মৃতিকেন্দ্র প্রকল্পটি হাতে নিয়েছিল সরকার। রংপুরের মিঠাপুকুরের পায়রাবন্দে সোয়া তিন কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ‘বেগম রোকেয়া স্মৃতি কেন্দ্রটি’ ২০০১ সালের ১ জুলাই উদ্বোধন করেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ২৫টি সেলাই মেশিন-সংবলিত সেলাই প্রশিক্ষণ কক্ষ, ৯টি শোকেজ-সংলিত একটি সংগ্রহশালা, একটি কম্পিউটার ও একটি ফটোস্ট্যাট মেশিন-সংবলিত আধুনিক গবেষণা কক্ষ, তিন হাজার মূল্যবান বইসমৃদ্ধ দৃষ্টিনন্দন পাঠাগার, ১০০ আসনবিশিষ্ট সেমিনার কক্ষ ও ৩০০ আসনের অত্যাধুনিক সুবিধা-সংবলিত অডিটোরিয়াম নিয়ে গড়ে ওঠে এটি। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের পৃষ্ঠপোষকতায় বাংলা একাডেমির তত্ত্বাবধানে পরে এই স্মৃতিকেন্দ্র উন্মুক্ত করে দেয়া হলে এই অঞ্চলের মানুষের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনার সৃষ্টি হয়।

কিন্তু চালু হওয়ার মাত্র পাঁচ মাসের মাথায় বন্ধ হয়ে যায় স্মৃতিকেন্দ্রটি। এরপর থেকে তালাবদ্ধ পড়ে আছে সেটি।

জানা গেছে, সেনাশাসিত সরকারের সময়ে ২০০৮ সালের ১৬ মার্চ স্মৃতিকেন্দ্রটির সেমিনার রুম, সেলাই প্রশিক্ষণ কেন্দ্রসহ বেশ কয়েকটি রুমের জিনিসপত্র সরিয়ে সেনাবাহিনীর বিকেএমইএ গার্মেন্টস প্রশিক্ষণ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা হয়।

সরেজমিনে দেখা যায়, কেন্দ্রের ভেতর এখন আর রোকেয়া-চর্চার কোনো সুযোগ নেই। গবেষণাগারটি তালাবদ্ধ। পাঠাগারে বই আছে; সারিবদ্ধভাবে টেবিল আছে; কিন্তু পড়ার কোনো সুযোগ নেই।

বেগম রোকেয়া স্মৃতি সংসদের সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলাম দুলাল বলেন, “রোকেয়া স্মৃতিকেন্দ্র প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য এবং বিকেএমইর উদ্দেশ্য আলাদা বিষয়। কিন্তু স্মৃতিকেন্দ্রে বিকেএমইকে ঢুকিয়ে স্মৃতিকেন্দ্রের আসল উদ্দেশ্যের প্রতি লাথি মারা হয়েছে। প্রশাসন সেটি কোনোভাবেই গ্রাহ্য করছে না।” তিনি বলেন, “আমরা চাই এখানে রোকেয়াকে নিয়ে গবেষণা করা হোক।” সে জন্য তিনি এই স্মৃতিকেন্দ্রটি বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে দেয়ার দাবি করেন।

পায়রাবন্দ বেগম রোকেয়া ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ একরামুল হক বলেন, “এখানে বেগম রোকেয়ার নামে স্মৃতিকেন্দ্র আছে, আছে সুসজ্জিত পাঠাগার, লাইব্রেরিসহ নানা উপকরণ। তাকে নিয়ে গবেষণা করার মতো উপযুক্ত একটি জায়গা এটি। বেগম রোকেয়াকে নিয়ে গবেষণার জন্য এই স্মৃতিকেন্দ্রটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে দেয়ার দাবি জানাই আমরা।”

স্মৃতিকেন্দ্রে বেড়াতে আসা বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সালমা সুলতানা হ্যাপি নামের এক শিক্ষার্থী বলেন, “আমরা এই স্মৃতিকেন্দ্রে রোকেয়া-চর্চা করতে চাই। সেই সুযোগ দেয়া হোক।” একই কথা বলেন সেখানে বেড়াতে আসা অন্য শিক্ষার্থী লায়লা, আমিনুল ইসলাম ও ফারজানা। তারা সবাই বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বর্ষের শিক্ষার্থী।

মিঠাপুকুর উপজেলা চেয়ারম্যান জাকির হোসেন সরকার জানান, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঘোষিত রোকেয়া-চর্চার উদ্দেশ্য একেবারেই দুমড়ে-মুচড়ে গেছে। আমরা জোর দাবি করছি, এ বছর রোকেয়া দিবসেই যেন এখানে রোকেয়া-চর্চার ব্যবস্থা করা হয়।

রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষক ড. তুহিন ওয়াদুদ বলেন, এই স্মৃতিকেন্দ্রটিকে রোকেয়া-চর্চার কেন্দ্রবিন্দু করা উচিত। তা হলে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়সহ সারা দেশের শিক্ষার্থীরা এখানে রোকেয়ার ওপর পিএইচডিসহ উচ্চতর ডিগ্রি নিতে পারবে।

বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. এ কে এম নূর উন নবী বলেন, “আমি রোকেয়া দিবসেই স্মৃতিকেন্দ্রটি আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে নিতে চাই।” সেদিনই আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা দেওয়ার কথা জানিয়ে এই শিক্ষাবিদ বলেন, সে জন্য সরকারের সহযোগিতা আমার বেশি প্রয়োজন।”

উপাচার্য়ের এই ইচ্ছা ও আগ্রহ বাস্তব রূপ পেলেই বেগম রোকেয়ার স্মৃতিকেন্দ্রটি যে উদ্দেশ্যে নির্মাণ করা হয়েছে তার সফলতার প্রতিফলন ঘটবে।