মেইন ম্যেনু

হজে যাওয়ার আগে আপনাকে অবশ্যই যে বিষয়গুলো জানতে হবে

ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের মধ্যে হজ একটি। মহান আল্লাহ তায়ালা সামর্থবান মুসলমানের উপর অন্তত একবার হজ ফরয করেছেন। তাই তো প্রতিবছর পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে হজ পালনের উদ্দেশ্যে কোটি কোটি মুসলমান সৌদি আরবে জড়ো হন। কিন্তু অনেক মুসলমান হজ পালনের উদ্দেশ্যে সৌদি আরবে যাওয়ার পথে বিভিন্ন বিভ্রান্তির মধ্যে পড়ে যান। তাই হজ পালন করতে গেলে কখন কি করতে হয় তা এখনই জেনে নিন-

প্রথম পর্ব
হজ করার জন্য প্রথম যে কাজটি আপনাকে করতে হবে সেটি হলো মানসিক প্রস্তুতি। হজ হলো দৈহিক ও আর্থিক ইবাদত। শ্রমসাধ্য ব্যাপার। তাই যাত্রার শুরুতেই নিজেকে এমনভাবে তৈরি করে নিতে হবে, যেন দেহ-মনে বেশি কষ্ট না হয়। এজন্য মালপত্র যতোটা সম্ভব হালকা রাখতে হবে। কারণ নিজের মালপত্র নিজেকেই বহন করতে হবে। সঙ্গীদের সম্মান করতে হবে। তাদের ইচ্ছা-অনিচ্ছাকৃত ভুলগুলো ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখতে হবে। গ্রুপের দুর্বল বয়স্কদের প্রতি বিশেষ খেয়াল রাখা জরুরি। সৌদি আরবে পৌঁছে প্রতি ওয়াক্তের নামাজ পবিত্র কাবা শরিফে জামায়াতের সঙ্গে আদায় করার চেষ্টা করতে হবে। কাবা শরিফের খুব কাছেই ভাড়া করা বাড়িতে হাজিদের বাসস্থানের প্রতিশ্রুতি দিয়ে অনেক এজেন্সি বেশি টাকা আদায় করলেও বাংলাদেশের বেশির ভাগ এজেন্সিই অধিক মুনাফার আশায় হারাম শরীফ থেকে অনেক দূরে হাজিদের বাসস্থানের ব্যবস্থা করেন। সেক্ষেত্রে এজেন্সির সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে ভালো করে বোঝাপড়া করে নিতে, তারা যেন কাবা শরিফের কাছেই প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী বাসস্থানের ব্যবস্থা করে। কাবা শরিফের কাছে কিংবা দূরে, যেখানেই বাসা হোক, যেকোনো প্রয়োজনে বাসা থেকে বের হতে হলে অবশ্যই মুয়াল্লিমকে (হজ গাইড) বলে বের হতে হবে। চলাফেরায় একে অন্যের সহযোগিতা নিন। আপনি হজ পালনে সৌদি আরব যাচ্ছেন। দেশটির মানুষ আরবি ভাষায় কথা বলে। রাস্তাঘাটও অচেনা। তবে এতে চিন্তিত হওয়ার কিছু নেই। হজ যাত্রীদের সেবা করতে সৌদি আরব ও বাংলাদেশ সরকার নানা রকম ব্যবস্থা নিয়ে থাকে। আপনি হারিয়ে গেলেও হারিয়ে যেতে পারবেন না। সঙ্গে কাগজপত্র থাকলেই হলো।

ঢাকার আশকোনা হাজি ক্যাম্পে টিকা দেওয়া হয়। সেখানে হজের প্রশিক্ষণ, বৈদেশিক মুদ্রা কেনা-বেচাসহ হজ সংশ্লিষ্ট প্রয়োজনীয় সব কিছুই পাওয়া যায়। বিমানে ওঠার আগে হাজি ক্যাম্পে অবস্থানকালে মালপত্র খেয়াল রাখতে হবে। একদল সুযোগ সন্ধানী লোক মালপত্র চুরি করে থাকে। কোনো টিকা বা ভ্যাকসিন নেওয়া বাকি থাকলে অবশ্যই তা নিয়ে নিতে হবে।

তবে যাত্রার আগেই কিছু বিষয়ের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে, তা না হলে শেষ মুহূর্তে হজযাত্রা অনিশ্চিত হয়ে পড়তে পারে।

পাসপোর্ট, বিমানের টিকেট সংগ্রহ ও হজ ফ্লাইটের তারিখ এজেন্সির সঙ্গে কথা বলে নিশ্চিতকরুন। প্রয়োজনীয় বৈদেশিক মুদ্রা সঙ্গে নিতে ভুলবেন না। সেই সঙ্গে নিয়ম মেনে ম্যানিনজাইটিস টিকা বা অন্যান্য ভ্যাকসিন দিয়ে নিন। অনেকে টিকা না নিয়ে স্বাস্থ্য সনদ সংগ্রহ করেন, এটা করবেন না।

হজের কোনো বিষয়ে বিভিন্ন রকম আমল দেখলে ঝগড়া করবেন না। আপনার মুয়াল্লিমের ওপর আস্থা রাখুন, তার নির্দেশনা মেনে আমল করবেন। এরপরও অস্থিরতা অনুভব করলে প্রয়োজনে পরিচিত অথবা এলাকার গ্রুপ লিডারের সঙ্গে পরামর্শ করতে পারেন।
হজে যাওয়ার সময় কি কি মালপত্র নিয়েছেন একটু মিলিয়ে নিন।
১. পাসপোর্ট, টিকেট, ডলার ও টাকা রাখার জন্য গলায় ঝুলানো ছোট ব্যাগ।
২. ইহরামের কাপড় কমপক্ষে দুই সেট। প্রতি সেট শরীরের নিচের অংশে পরার জন্য আড়াই হাত বহরের আড়াই গজ এক টুকরা কাপড় আর গায়ের চাদরের জন্য একই বহরের তিন গজ কাপড়। ইহরামের কাপড় হবে সাদা। সূতি হলে ভালো হয়।
৩. নরম ফিতাওয়ালা স্পঞ্জের স্যান্ডেল।
৪. ইহরাম বাঁধার কাজে ব্যবহারের জন্য প্রয়োজন হলে বেল্ট।
৫. গামছা ও তোয়ালে।
৬. নিজের পছন্দ অনুযায়ী আরামদায়ক পোশাক যেমন লুঙ্গি, গেঞ্জি, পায়জামা ও পাঞ্জাবি সঙ্গে নিতে পারেন। মেয়েরা নিজেদের পছন্দ অনুযায়ী আরামদায়ক পোশাক নিতে পারবেন।
৭. সাবান, টুথপেস্ট, ব্রাশ ও মিসওয়াক।
৮. সুই-সুতা ও নখ কাটার জন্য নেইল কাটার ।
৯. থালা, বাটি ও গ্লাস।
১০. কাগজ-কলম।
১১. শীতের কাপড়। কারণ মদিনায় ঠাণ্ডা পড়ে বেশি।
১২. প্রয়োজনীয় ওষুধপত্র। ওষুধ কিছু বেশিও সঙ্গে নিয়ে যেতে পারেন। চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র সঙ্গে রাখুন।
১৩. চশমা ব্যবহার করলে অতিরিক্ত একটি চশমা, কারণ ভিড় বা অন্য কোনো কারণে ভেঙে গেলে ব্যবহার করতে হবে।
১৪. বাংলাদেশি টাকা, কারণ দেশে ফেরার পর বিমানবন্দর থেকে বাড়ি ফেরার জন্য প্রয়োজন হয়।
১৫. নারীদের জন্য বোরকা বা পর্দা হয় এমন পোশাক।
১৬. মালপত্র নেওয়ার জন্য ব্যাগ অথবা সুটকেস, তালা-চাবিসহ। ব্যাগের ওপর ইংরেজিতে নিজের নাম-ঠিকানা, ফোন নম্বর লিখতে হবে। এর বাইরেও আরো কিছু প্রয়োজনীয় মনে হলে তা নিয়ম মেনে সঙ্গে নিন।
এছাড়াও সৌদি আরবের জেদ্দা, মক্কা ও মদীনায় বাংলাদেশ হজ মিশন কন্ট্রোল রুমের মাধ্যমে হাজিদের সার্বক্ষণিক সেবা দিয়ে থাকে। এই কন্ট্রোল রুমগুলো হাজিদের হারানো লাগেজ ফিরিয়ে দেওয়া, চিকিৎসা সেবা, টাকা পয়সা জমা রাখা, পথ ভুল করে হারিয়ে যাওয়া হাজিদের নির্দিষ্ট হোটেলে পৌঁছে দেওয়াসহ ২৪ ঘণ্টা হাজিদের সেবায় নিয়োজিত থাকেন।

ইহরাম:
প্রথমেই জেনে নিন আপনার গন্তব্য ঢাকা থেকে মক্কা নাকি মদীনা। যদি মদীনা হয় তাহলে ঢাকা থেকে ইহরাম বাঁধার প্রয়োজন নেই। যখন মদীনা থেকে মক্কা যাবেন তখন ইহরাম বাঁধতে হবে।

বাংলাদেশের বেশির ভাগ হজযাত্রী আগে মক্কায় যান। এ ক্ষেত্রে ঢাকা থেকে বিমানে ওঠার আগে ইহরাম বাঁধা ভালো। কারণ, জেদ্দা পৌঁছার আগেই ‘‘ইয়ালামলাম’’ মিকাত বা ইহরাম বাঁধার নির্দিষ্ট স্থানটি পড়ে। যদিও বিমানে ইহরাম বাঁধার কথা বলা হয়, কিন্তু ওই সময় অনেকে ঘুমিয়ে থাকেন। আর বিমানে পোশাক পরিবর্তন করাটাও দৃষ্টিকটু।

মনে রাখবেন ইহরামের কাপড় পরিধান করলেই ইহরাম বাঁধা হয়ে যায় না। যতক্ষণ পর্যন্ত নিয়ত করে ‘‘তালবিয়া’’ তথা ‘‘লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক, লাব্বাইক, লা-শারিকা-লাকা লাব্বাইক, ইন্নাল হামদা ওয়ান্ নি’মাতা লাকা ওয়াল-মুল্ক, লা শারিকালাক।” অর্থ: আমি হাজির হে আল্লাহ! আমি উপস্থিত! আপনার ডাকে সাড়া দিতে আমি হাজির। আপনার কোনো অংশীদার নেই। নিঃসন্দেহে সমস্ত প্রশংসা ও সম্পদরাজি আপনার এবং একচ্ছত্র আধিপত্য আপনার। আপনার কোন অংশীদার নেই।

তাই ইহরামের কাপড় পরিধানের পর বিমান ছাড়ার পর নিয়ত করে তালবিয়া আরম্ভ করা ভালো। বিনা ইহরামে মিকাত পার হলে এজন্য দম বা কাফফারা দিতে হবে। তদুপরি গুনাহ হবে।

হজ বা উমরাহ পালনকারী ব্যক্তির জন্য বিনা ইহরামে যে নির্দিষ্ট স্থান অতিক্রম করা নিষিদ্ধ, তা-ই হলো মিকাত। বায়তুল্লাহ বা আল্লাহর ঘরের সম্মানার্থে প্রত্যেককে নিজ নিজ মিকাত থেকে ইহরাম বাঁধতে হয়।

ঢাকা বিমানবন্দর:
উড্ডয়নের সঠিক সময় অনুযায়ী বিমানবন্দরে পৌঁছান। নাম-ঠিকানা লেখা ব্যাগ বা সুটকেসে কোনো পচনশীল খাবার রাখা ঠিক না। বিমানবন্দরে লাগেজে যে মাল দেবেন, তা ঠিকমতো বাঁধা হয়েছে কি না, দেখে নেবেন। বিমানের কাউন্টারে মাল রেখে এর টোকেন দিলে তা যত্ন করে রাখবেন। কারণ, জেদ্দা বিমানবন্দরে ওই টোকেন দেখালে সেই ব্যাগ আপনাকে ফেরত দেবে। ইমিগ্রেশন, চেকিংয়ের পর নিজ মালপত্র সযত্নে রাখুন।

জেদ্দা বিমানবন্দর:
মোয়াল্লেমের গাড়ি আপনাকে জেদ্দা থেকে মক্কায় যে বাড়িতে থাকবেন, সেখানে নামিয়ে দেবে। মোয়াল্লেমের নম্বর (আরবিতে লেখা) কব্জি বেল্ট দেওয়া হবে, তা হাতে পরে নেবেন। পাশাপাশি বাংলাদেশ সরকারের দেওয়া পরিচয়পত্র (যাতে পিলগ্রিম পাস নম্বর, নাম, ট্রাভেল এজেন্টের নাম ইত্যাদি থাকবে) গলায় ঝোলাবেন।

জেদ্দা থেকে মক্কায় পৌঁছাতে আনুমানিক দুই ঘণ্টা সময় লাগবে। যানবাহনের উঠানামার সময় ও চলার পথে বেশি বেশি তালবিয়া পড়ুন (লাব্বাইকা আল্লাহুম্মা লাব্বাইক, লাব্বাইকা লা-শরিকা লাকা লাব্বাইক, ইন্নাল হামদা ওয়ান নি’মাতা লাকা ওয়ালমুলক লা-শরিকা লাক্।)

মক্কায় পৌঁছে:
মক্কায় পৌঁছে আপনার থাকার জায়গায় মালপত্র রেখে ক্লান্ত হলে বিশ্রাম করুন। আর যদি নামাজের ওয়াক্ত হয়, নামাজ আদায় করুন। বিশ্রাম শেষে উমরাহর নিয়ত করে থাকলে উমরাহ পালন করুন।

মসজিদুল হারামে (কা’বা শরিফ) অনেকগুলো প্রবেশপথ আছে; সব ক’টি দেখতে একই রকম। কিন্তু প্রতিটি প্রবেশপথে আরবি ও ইংরেজিতে ১, ২, ৩ নম্বর ও প্রবেশপথের নাম আছে, যেমন-বাদশা আবদুল আজিজ প্রবেশপথ। আপনি আগে থেকে ঠিক করবেন, কোন প্রবেশপথ দিয়ে ঢুকবেন বা বের হবেন। আপনার সফরসঙ্গীকেও স্থান চিনিয়ে দিন। তিনি যদি হারিয়ে যান, তাহলে নির্দিষ্ট নম্বরের গেটের সামনে থাকবেন। এতে ভেতরে ভিড়ে হারিয়ে গেলেও নির্দিষ্ট স্থানে এসে সঙ্গীকে খুঁজে পাবেন।

কা’বা শরিফে স্যান্ডেল রাখার ক্ষেত্রে খুব সতর্ক থাকবেন, নির্দিষ্ট স্থান তথা জুতা রাখার জায়গায় রাখুন। এখানে-সেখানে জুতা রাখলে পরে আর খুঁজে পাবেন না। প্রতিটি জুতা রাখার র্যাকেও নম্বর দেওয়া আছে। এই নম্বর মনে রাখুন।

উমরাহর নিয়মকানুন আগে জেনে নেবেন, যেমন-সাতবার তাওয়াফ করা, জমজমের পানি পান করা, নামাজ আদায় করা, সাঈ করা (সাফা-মারওয়া পাহাড়ে দৌড়ানো-যদিও মসৃণ পথ, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত) মাথা মুড়ানো অথবা চুল ছোট করা-এসব কাজ ধারাবাহিকভাবে করা। ওয়াক্তীয় নামাজের সময় হলে যতোটুকু হয়েছে ওই সময় নামাজ পড়ে আবার বাকিটুকু শেষ করা।

কা’বা শরিফ:
হারাম শরিফে প্রবেশ করার সময় বিসমিল্লাহ ও দরুদ শরিফ পড়ার পর “আল্লাহুম্ মাফ তাহলি আব-ওয়া-বা রাহমাতিকা” পড়বেন। কোনো দরজার সামনে নামাজ পড়া ঠিক নয়, এতে পথচারীর কষ্ট হয়।

হাজরে আসওয়াদে চুমু দেওয়া সুন্নাত। তবে ভিড়ের কারণে না পারলে দূর থেকে চুমুর ইশারা করলেই চলবে। ভিড়ে অন্যকে কষ্ট দেওয়া যাবে না।